আর্কাইভ কনভাটার ঢাকা, সোমবার, এপ্রিল ১১০, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ১ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

Rajshahi's score is very unhealthy

বাতাসে বৃদ্ধি পাচ্ছে ভাসমান ক্ষুদ্র ধূলিকণা॥ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বায়ুমান নির্দেশিকার চাইতে ১০ গুণ বেশি

Bijoy Bangla

শাহানুর রহমান রানা (রাজশাহী)

প্রকাশিত: ০৩ এপ্রিল, ২০২৪, ০৪:১০ পিএম

বাতাসে বৃদ্ধি পাচ্ছে ভাসমান ক্ষুদ্র ধূলিকণা॥ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বায়ুমান নির্দেশিকার চাইতে ১০ গুণ বেশি
বাতাসে বৃদ্ধি পাচ্ছে ভাসমান ক্ষুদ্র ধূলিকণা॥ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বায়ুমান নির্দেশিকার চাইতে ১০ গুণ বেশি

বিগত কয়েক বছর ধরে রাজশাহী নগরীর বায়ুমানে বেশ পরিবর্তন এসেছে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের বাতাসের মানসূচকে গত সপ্তাহ দুয়েক ধরে রাজশাহীর স্কোর অনেকটাই অস্বাস্থ্যকর। বাতাসের মান নিয়ে তৈরি করা এই লাইভ বা তাৎক্ষণিক একিউআই সূচক একটি নির্দিষ্ট শহরের বাতাস কতটা নির্মল বা দূষিত, সে সম্পর্কে মানুষকে তথ্য দেয় এবং সতর্ক করে। বায়ুদূষণের প্রধান উৎস ২ দশমিক ৫ মাইক্রোমিটার ঘনত্বের অতিক্ষুদ্র বস্তুকণার পাশাপাশি ১০ মাইক্রোমিটার আকারের ক্ষুদ্র বস্তুকণার উপস্থিতি। নগরীর নির্মল বাতাসে বিগত কয়েক বছরে এর উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে অনাকাঙ্খিত হারে। 

এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) এর লাইভ রিয়াল টাইম ওয়েব সাইডের তথ্যানুযায়ী ৩১ মার্চ পর্যন্ত বায়ুমানের একিউআই স্কোর ১৫২ পর্যন্ত উঠানামা করেছে। আর চলতি সপ্তাহে সেই স্কোর কিছুটা কমে ১৪৪ পর্যন্ত ওঠানামা করবে। আইকিউএয়ারের মানদন্ড অনুযায়ী, স্কোর ৫১ থেকে ১০০ হলে তাকে ‘মাঝারি’ বা ‘গ্রহণযোগ্য’ মানের বায়ু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১০১ থেকে ১৫০ স্কোরকে ‘সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর’ ধরা হয়। স্কোর ১৫১ থেকে ২০০ হলে তা ‘অস্বাস্থ্যকর’ বায়ু। স্কোর ২০১ থেকে ৩০০ হলে তাকে ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ বায়ু ধরা হয়। ৩০১ থেকে তার ওপরের স্কোরকে ‘দুর্যোগপূর্ণ’ বা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ধরা হয়।


মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহের বায়ুমানসহ চলতি সপ্তাহের পূর্বাভাসের স্কোরে লক্ষ্য করা গেছে বাতাসের সাথে মিশে থাকা পিএম ২.৫ ঘনত্বের অতি ক্ষুদ্র ধুলিকণার উপস্থিতি গ্রহণযোগ্য মানের পর্যায়ের চাইতে অনেক বেশি। আইকিউএয়ারের প্রকাশ করা তালিকায় বলা হচ্ছে, রাজশাহীর বাতাসে অতিক্ষুদ্র বস্তুকণাই (পিএম ২.৫) বায়ুদূষণের প্রধান উৎস। গেল মাসের শেষ সপ্তাহে রাজশাহীর বাতাসে যতটা এই বস্তুকণা ছিল, তা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদন্ডের চেয়ে ১০.৫ গুণ বেশি। আর চলতি সপ্তাহের পূর্ভাবাসে সেটি থাকবে ৯.৯ গুণ বেশি। 

পরিবশে অধিদপ্তর রাজশাহী কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক কবির হোসেন জানান, রাজশাহীর বায়ুদূষণের প্রধান উৎস পিএম ২.৫ ঘনত্বের অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা। এছাড়াও রয়েছে ১০ মাইক্রোমিটার আকারের ক্ষুদ্র বস্তুকণার উপস্থিতিও। রাস্তার ধারে উন্মুক্তবস্থায় বালু, সুড়কি ও মাটি ফেলে রাখা ছাড়াও এইসকল নির্মাণ উপকরণ উন্মুক্তভাবে ট্রাকে বহন করার জন্য বাতাসের সাথে অতিসহসায় মিশে যাচ্ছে অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা। রাস্তার ধারে উন্মুক্তবস্থায় বালু-সুড়কি ফেলে রাখার কারণে চলতি বছরের জানুয়ারীতে ডন এন্টার প্রাইজ নামরে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করে পরিবেশ অধিদপ্তর বলেও জানান তিনি।  

বাতাসে ভাসমান মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর কণা দ্রুত কমিয়ে আনার জন্য ২০১৬ সালে বিশ্বসেরা হয়েছিল রাজশাহী। ২০১৬ সালে শহরে প্রবহমান বাতাস ছিল নির্মল ও দূষণমুক্ত। কিন্তু তার পরবর্তী ৭ বছর কেমন ছিল রাজশাহীর বায়ুমন্ডল সেটি নিয়ে তেমন কোন মাতামাতি না হলেও ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর পরিচালিত বায়ুমান পরীক্ষায় বাতাসে ভাসমান ক্ষুদ্র ধূলিকণার (১০ মাইক্রোমিটার আকারের) উপস্থিতি প্রতি ঘনমিটার ছিল ২৩১ মাইক্রোগ্রাম। কোন কোন স্থানে ভাসমান ক্ষুদ্র ধূলিকণার উপস্থিতি ছিল ২৪৬ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত। রাজশাহীর বায়ুদূষণের স্থানীয় উৎসগুলোর মধ্যে আছে যানবাহন ও ছোট-মাঝারি ধরনের কলকারখানার ধোঁয়া, নির্মাণকাজের দূষণ, আশপাশের ইটভাটার ধোঁয়া ছাড়াও বাসাবাড়ী ও রাস্তার ধারে নিম্নমানের হোটেল ও চায়ের দোকানের চুলায় ব্যবহৃত জ¦ালানী উপকরণ থেকে নির্গত ধোঁয়া। এছাড়াও ক্রমাণ¦য়ে হ্রাস পাওয়া জলাশয়, পুকুর, নালাসহ অন্যান্য ধলাধার। বড় বড় বৃক্ষ নিধনও প্রধান একটি কারণ বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। 


প্রতি বছর দেশে দূষণের কারণে ২৭২,০০০ এরও বেশি মানুষ অকালে মারা যায়। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। গত ২৮-০৩-২০২৪ তারিখে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। ‘দ্য বাংলাদেশ কান্ট্রি এনভায়রনমেন্ট অ্যানালাইসিস’ নামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বায়ু দূষণ, অনিরাপদ পানি, দুর্বল স্যানিটেশন ও হাইজিন এবং সিসা দূষণই অকাল মৃত্যুর প্রধান কারণ।

যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০১৪ সালের দিকে রাজশাহীর বাতাসে ভাসমান ক্ষুদ্র ধূলিকণা (১০ মাইক্রোমিটার আকারের) প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ছিল ১৯৫ মাইক্রোগ্রাম। এর দুবছর পর অর্থ্যাৎ ২০১৬ সালে বাতাসে ভাসমান ক্ষতিকর কণার পরিমাণ দুই-তৃতীয়াংশ কমে দাঁড়ায় ৬৩ দশমিক ৯ মাইক্রোগ্রামে। অন্যদিকে, ২০১৪ সালে শহরে আরও ক্ষুদ্র ধূলিকণা (২ দশমিক ৫ মাইক্রোমিটার আকারের) প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ছিল ৭০ মাইক্রোগ্রাম। যেটা ২০১৬ সালে প্রায় অর্ধেক হয়ে দাঁড়ায় ৩৭ মাইক্রোগ্রামে। 

গেল বছরের শেষার্ধে (১১ নভেম্বর ২০২৩) রাজশাহীর বরেন্দ্র পরিবেশ উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা নগরীর পাঁচটি স্থানে বাতাসে ভাসমান মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর কণার পরিমাণ নির্ণয় করার জন্য পরীক্ষা ও সমীক্ষা চালায়। ওই পরীক্ষায় নগরীর বায়ু দূষণের বিষয়টি ধরা পড়ে। ২০১৬ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে বায়ুদূষণের মাত্রাটা বৃদ্ধি পেতে থাকে।  সংস্থাটির পরীক্ষার ফলাফলে বলা হয়েছিল, নগরীর তালাইমারী মোড়ে ১০ মাইক্রোমিটার আকারের ক্ষুদ্র বস্তুকণা প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পাওয়া গিয়েছিল ২৪৬ মাইক্রোগ্রাম। একই স্থানে ২ দশমিক ৫ মাইক্রোমিটার আকারের অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা প্রতি ঘনমিটার বাতাসে উপস্থিতি ছিল ৯৭ মাইক্রোগ্রাম। এ এইচ এম কামারুজ্জামান চত্বরে এর ছিল পরিমাণ যথাক্রমে ২৩১ ও ৯৩ মাইক্রোগ্রাম, সাহেববাজার জিরো পয়েন্টে ২২৫ ও ৮৮ মাইক্রোগ্রাম, লক্ষ্মীপুর মোড়ে ২২৯ ও ৯৪ মাইক্রোগ্রাম, বিসিক এলাকায় ২২২ ও ৭৬ মাইক্রোগ্রাম। 

২০১৬ সালের পর থেকে অনেকটাই উদ্বেগজনক মাত্রায় বায়ুদূষণ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মন্তব্য সচেতন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। আর এরজন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে দরিদ্র মানুষ, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, বয়স্ক পুরুষ ও মহিলারা। তাই বায়ুদূষণ রোধে সরকারি দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তাদের পাশাপাশি আবাসনখাতে বিনিয়োগকারীদের আরো বেশি সচেতন হবার পরামর্শ দেন পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক কবির হোসনে।  


বিবিএন/০৩ এপ্রিল/এসডি


google.com, pub-6631631227104834, DIRECT, f08c47fec0942fa0