আর্কাইভ কনভাটার ঢাকা, সোমবার, এপ্রিল ১১০, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ১ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

Ataur Rahman

গণ মানুষের নেতা আতাউর রহমান

Bijoy Bangla

ওয়ালিউর রহমান বাবু

প্রকাশিত: ১২ জানুয়ারী, ২০২৪, ১২:২০ এএম

গণ মানুষের নেতা আতাউর রহমান
ভাষা সৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক জননেতা এম আতাউর রহমান।

নানা আন্দোলন সংগ্রামের পুরোধা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতার সংগ্রাম-মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং গণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় একনিষ্ঠ ভাবে যে মানুষটি অগ্রণী ভুমিকা রেখেছেন। তিনি হলেন ভাষা সৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক জননেতা এম আতাউর রহমান। নানা গুণের ব্যতিক্রমী অসাম্প্রদায়িক মানবতাকামী ব্যাক্তিত্ব এম আতাউর রহমান কে কোন অপশক্তি থামিয়ে রাখতে পারেনি। তার জন্ম রাজশাহী জেলার চারঘাট থানার বাঘা তে। ছিলেন মেধাবী শিক্ষার্থী ও কৃতি খেলোয়াড়। রাজশাহী হাই মাদ্রাসা স্কুলে পড়ার সময় রাজশাহী জেলা সদরে আসা ব্রিটিশ সরকারের ছোট লাট কে কালো পতাকা দেখালে তাকে নয় দিন কারাবরণ করতে হয়। এঘটনা তখন আলোড়ন সৃষ্টি করে। রাজনৈতিক ব্যক্তৃত্ব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশে তিনি মুক্তি পান। রাজশাহী হাই মাদ্রাসা স্কুল থেকে বৃত্তি পেয়ে রাজশাহী কলেজ এ ভর্তি হন। সে সময় মুসলিম লীগ রাজশাহী জেলা সভাপতি জনদরদী জননেতা মাদারবখশ তাকে কাছে টেনে নিয়ে তার কাছে রেখে প্রেরণা ও শক্তি জোগান। দুইজনে দুই ধারার হলেও সম্পর্ক ছিল নিবিড়। এম আতাউর রহমান ২৩ বার কারাবরণ করেন। রাজবন্দীদের মুক্তির দাবীতে ঢাকা কারাগারে ২৯দিন অনশন করেন। রাজশাহীতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা রোধে ভুমিকা রাখেন। তিনি ছিলেন প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক মনোভাবের ব্যক্তিত্ব। তার নেতৃত্বে উত্তরাঞ্চলে বাম রাজনীতির যাত্রা শুরু। তিনি কমরেড মোজাফফর আহমেদের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠন করে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির নেতৃত্ব দেন।

কলকাতায় দক্ষিণ পুর্ব এশিয়া যুব প্রতিনিধি সম্মেলন সফল করার পর রাজশাহীতে তা করার দায়িত্ব তাকে দেয়া হয়। রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলনে তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ছিল। তার উপর হুলিয়া থাকায় আত্নগোপন অবস্থায় পাবনা জেলার ইস্বরদিতে বিভাগীয় যুব সম্মেলন সফল করতে নেতৃত্ব দেন। তিনি রাজশাহী কারাগারে রাজবন্দী ও বন্দীদের উপর গুলি বর্ষন, আদিবাসী নেত্রী ইলা মিত্রের উপর নির্যাতনের প্রতিবাদ এবং তার মুক্তির ব্যপারে বিশেষ ভুমিকা রাখেন। সাহিত্য চর্চায় “দিশারী সাহিত্য মজলিশ গঠন করে দায়িত্ব দেন ভাষা সৈনিক সাঈদউদ্দিন আহমেদ কে। এই সংগঠনটি ভাষা আন্দোলনে ভুমিকা রাখে। এম আতাউর রহমান সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলনকে তীব্র করেন।

১৯৫২ সালের ২১ফেব্রুয়ারী দিবাগত রাতে রাজশাহী কলেজ মুসলিম হোস্টেলে শহিদদের স্মরণে দেশের প্রথম শহিদ মিনার (শহিদ স্মৃতি স্তম্ভ) তৈরিতে তারও ভুমিকা ছিল। রাজশাহী জেলা সদরের ভুবনমোহন পার্কে… শহিদ মিনার তৈরির পরিকল্পনাটি ছিল তারই। ১৯৫৪ সালে তিনি রাজশাহী প্রেস ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন। আইন পেশার পাশাপাশি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল বাম ধারার সমর্থকদের নিয়ে ঢাকায় “গণতন্ত্রী দল” গঠন করে রাজশাহী জেলার সভাপতি নির্বাচিত হন। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে রাজশাহী জেলার চারঘাট,লালপুর অঞ্চল থেকে সতন্ত্র প্রার্থী পদে জয় লাভ করে পুর্ব বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। মাওলানা ভাসানি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন করলে তিনি রাজশাহী জেলা সভাপতির দায়িত্ব পান। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান রাজশাহী সফরে এলে রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীরা তার সামনে বিক্ষোভ করলে তাদের অনেকের নামে মামলা হুলিয়া হলে তিনি শিক্ষার্থীদের পক্ষে আইনজীবী হন। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বিভক্ত হলে তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (মোজাফফর) রাজশাহী জেলা সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এবং ৬দফা-১১দফা আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে এর সাথে সম্পৃক্ত হন।

১৯৬৯ এর গণ আন্দোলনে তার অবস্থান ছিল প্রথম সারিতে। স্বাধীনতা আন্দোলন-মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় পাকিস্তানী সৈন্যরা তাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জোহা হলের ক্যাম্পে বন্দী করে রাখে। তারা আত্নসমর্পনের পুর্বমুহুর্তে তাকে ছেড়ে দিলে স্বাধীনতাকামীরা রাজশাহী জেলা সদরের সিপাইপাড়ায় তার বাড়িতে তার নেতৃত্বে কন্ট্রোল রুম করে রাজশাহী জেলা সদরকে নিয়ন্ত্রণ, মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীকে স্বাগত জানানো, শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার প্রস্তাব গ্রহণ করে। ১৮ ডিসেম্বর রাজশাহী জেলা সদরের মাদ্রাসা হাই স্কুল মাঠে স্বাধীন বাংলার পতাকা তুলে রাজশাহীকে মুক্ত ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলে  এই দায়িত্বটি পালন করেন মুক্তিযুদ্ধকালীন ৭নং সেক্টরের লালগোলাপ সাব-সেক্টর কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা বীর বিক্রম মেজর গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী (অবসর প্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল)। এম আতাউর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশেও গণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহনে পিছ পা হননি। প্রকাশ করেন “নতুন কাল” সংবাদ পত্র। আওয়ামী লীগ না করলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে বাকশাল সরকারের রাজশাহী জেলা গভর্নর করেন। বঙ্গবন্ধু জানতেন তাকে এই দায়িত্ব দিলে রাজশাহী অঞ্চলের গণমানুষের মঙ্গল হবে।  ১৯৮০ সালের ১২ জানুয়ারী চিকিৎসাধীন অবস্থায়  জননেতা এম আতাউর রহমান ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তার আদর্শ প্রকৃত দেশপ্রেমিকদের দেশ ও গণমানুষের স্বার্থে নতুন করে প্রেরণা যুগাবে ১২ জানুয়ারি তার মৃত্য বার্ষিকীতে এই প্রত্যাশা।


[সংক্ষিপ্ত] তথ্যসুত্রঃ ভাষা সৈনিক অধ্যাপক একরামুল হক। গবেষক, শিক্ষাবিদ ড. তসিকুল ইসলাম রাজা। ভাষা সৈনিক মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক জননেতা এম আতাউর রহমানের স্বজন। গ্রন্থনায়- সমাজ ও সাংস্কৃতিক কর্মী, রাজশাহী। ০১৯১১৮৯৪২৬০ 


google.com, pub-6631631227104834, DIRECT, f08c47fec0942fa0