
সমাজের সমসংখ্যক নারীদের এগিয়ে চলা বর্তমান সময়ের চমকপ্রদ আঙিনা। এক সময়ের কন্যা জায়া জননীর আদলে নারীদের মূল্যায়নও ছিল তেমন কালের অনন্য পালাক্রম। বিংশ শতাব্দীর পালাক্রমেই শুধু নয় অন্তিম সময়ের দুরন্ত অভিগমন দেশ থেকে বিশ্ব আঙিনা যেমন নজর কাড়া হয়েছে পাশাপাশি কন্যা, জায়া, জননীরাও গৃহে অভ্যন্তর আর পর্দার আড়াল থেকে অনেকটাই সম্মুখ সারির পথকে অবারিত করতে যা যা প্রয়োজন সবটাই করে যেতে পেছনের দিকে তাকায়নি পর্যন্ত।
তারই ধারাবাহিকতায় সমসংখ্যক নারীর সম্ভাবনাময় অগ্রযাত্রা একবিংশ শতাব্দীর সূচনা লগ্ন থেকেই দৃষ্টিনন্দন রূপে দৃশ্যমান হতে থাকে। সেখানে এক সময়ের খ্যাতিমান পেশা বিশেষ করে নারীর ক্ষেত্রে শিক্ষকতাকে মর্যাদা দেওয়াই ছিল প্রচলিত সমাজ সংস্কারের কাক্সিক্ষত বিষয়। সুযোগও সেভাবে অবারিত হয়নি বৈচিত্র্যিক পেশায় নিজেদের সম্পৃক্ত করতে সার্বিক জনগোষ্ঠীরও। আর অপেক্ষাকৃত পেছনে থাকা নারীদের ক্ষেত্রে তো অনেকখানিই। তবে তেমন দুঃসময় কেটে নতুন আলোর নবউদ্দীপনায় নানা মাত্রিক পেশায় অভিজ্ঞ হয়ে ওঠা আজ আর গল্প কথা নয়।
স্বামী-সংসারের জন্য করা রান্নার বৈচিত্র্যিক সম্ভার নিয়ে আজ তারা দাঁড়িয়েছে বৃহত্তর সামাজিক আঙিনায়। তেমন নজির এখন দেশের নগরে, শহরে, বন্দরে এমনকি মফস্বলেও। সানিয়া সোমা তেমন একজন পাকা রন্ধন শিল্পী যিনি সীমাবদ্ধ পারিবারিক আঙিনা থেকে বৃহত্তর সামাজিক বলয়ে নিজের ক্ষমতা আর দক্ষতায় হরেক মুখরোচক খাবার নিয়ে আগ্রহী ক্রেতার সামনে হাজির হচ্ছেন। একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করাই শুধু নয় বরং পছন্দসই এবং দেশজ খাবার তৈরি করে মুগ্ধ করছেন তার গ্রাহকদের।
তেমন আধুনিক রন্ধন শিল্পীর পারিবারিক ইতিবৃত্তও সাধারণ জীবনযাত্রার অনন্য পটভূমি। নিজের তৈরি হওয়ার গল্প শুনিয়েছেন এই প্রতিবেদককে। সানিয়া জিতু সোমা। বাবা হাজী জিতু মিয়া সরকার বেঁচে নেই। মা খোরশেদা বেগম। তিনিও পরকালের বাসিন্দা। পাঁচ বোন-এক ভাইয়ের সংসারে বড় হয়েছেন। ২০০১ সালে পিতৃহীন হন। মাধ্যমিক বোর্ড পরীক্ষার শেষ দিন- আজও স্মরণ চেতনায় গেঁথে আছে। মায়ের সযত্ন পরিচর্যা আর অভিভাবকত্বে নিজেদের গড়ে তোলা যেন জীবন তৈরির এক অনন্য পালাক্রম। উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়।
কিন্তু বাল্যবিয়ে তো নয়ই, আর শিক্ষা কার্যক্রমও চালিয়ে যাওয়ার অবধারিত সুযোগ হয় বলতে দ্বিধা করলেন না। চাঁদপুরের কন্যা বড় হয়েছেন মহানগরী ঢাকার কোলাহলপূর্ণ চৌহদ্দিতে। আর চাঁদপুর মানেই বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের এক সমৃদ্ধ পীঠস্থান। সুস্বাদু ইলিশের মুখরোচক রান্নায় পারদর্শী ছিলেন ¯েœহময়ী মা। শুধু কি ইলিশ? রান্নার হরেক রকম উপাদেয় খাবার মায়ের হাতের ছোঁয়া আজও জীবনকে চমৎকারভাবে নাড়িয়ে দেয়।
সেখান থেকেই নিজ হাতে খাবার তৈরির সহজাত বোধ অন্তরের নিভৃতে জিইয়ে থাকল। শুধু কি থাকা? নিজেকে শিক্ষাগত কার্যক্রমের অনন্য ভাবনায়ও যেন আদর্শের নিশানা হতে সময় নিল না। আদর্শ বলি কেন? কখন যে জীবনের সুচিন্তিত লক্ষ্যে অবধারিত পথযাত্রা স্নাতকে বিষয় নির্বাচনেও সুদূরপ্রসারী অবদান রেখেই গেল। তেমন লক্ষ্যে যাপিত জীবনের প্রতিদিনের কর্মযোগেও সম্পৃক্ত হয়ে গেল সরকারি ইডেন মহিলা কলেজ থেকে ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপনায় স্নাতক-স্নাতকোত্তর করে নিজের আজন্ম লালিত স্বপ্নকে বাস্তবের মাটিতে প্রয়োগ করতে কখনো পিছু হটতে হয়নি।
তবে মাঝখানে বিবাহিত জীবন কোনো বিপত্তি তৈরি তো করেইনি বরং শিক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন করতে সব সুবিধা অবারিত করাও ছিল এক চমৎকার প্রতিবেশ। আরও মজার ব্যাপার শাশুড়ি নিজেও খুব ভালো রাঁধেন। বউমা সেখানেও নিজেকে সমর্পণ করতে মা-শাশুড়ির তারতম্য তৈরিই করলেন না বরং স্বাচ্ছন্দ্যে নিজের অভিমত প্রকাশ করা হলো এভাবেÑ শৈশব থেকে বিয়ে পর্যন্ত মায়ের হাতের রান্না, পরবর্তীতে শাশুড়ি মায়ের সুস্বাদু খাবার ও পেশা নির্বাচনে অনন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়।
ধরে নেওয়া যায় পারিবারিক চমৎকার ভিত্তি এবং নির্মল আবহে সোমার রন্ধন শিল্পীর আদলে তৈরি হওয়া যেন প্রচলিত সংসার আর সংস্কারের অনন্য বোধ তো বটেই। বর্তমানে রীতিমতো একজন পাকা রাঁধুনী। অসংখ্য আগ্রহী গ্রাহকের নৈমিত্তিক চাহিদা মিটিয়ে নিজেকে সফল উদ্যোক্তার কাতারে নিয়ে আশা আশৈশব চেতনালব্ধ অভিব্যক্তির প্রতিফলন তো বটেই।