Template: 1
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
বিজয় বাংলা নিউজ
জাতীয় দৈনিক | bijoybangla.news
QR
ই-পেপার / অনলাইন সংস্করণ
Tuesday , ১৮ মার্চ ২০২৫ | ১২:৫২ অপরাহ্ন

সম্বন্ধি আর বন্ধু-বান্ধব ছাড়া কাউকেই চেনেন না

নিজস্ব প্রতিবেদক: ১৮ মার্চ ২০২৫

নিজের সম্বন্ধি আর বন্ধু-বান্ধব ছাড়া কাউকেই চিনছেন না রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম। দরপত্র প্রক্রিয়ার গোপন দর ফাঁস করে তিনি তাদের লাখ লাখ টাকার কাজ পাইয়ে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে অন্য কোনো ঠিকাদার কাজ পাচ্ছেন না। এখন বঞ্চিত ঠিকাদারদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।

প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলামের বাড়ি নোয়াখালী, আর শ্বশুরবাড়ি রাজশাহী। বাবার চাকরিসূত্রে রাশেদুল ছোটবেলায় রাজশাহী আসেন। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন রাজশাহীতেই। তিনি রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) ছাত্র ছিলেন। পড়াশোনা শেষ করে তিনি সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন গণপূর্ত বিভাগে।

এরপর ছিলেন রাজশাহী কার্যালয়েই। এখানেই পদোন্নতি পেয়ে হন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী। তারপর অল্প কিছু দিনের জন্য রাজশাহী থেকে বদলি হয়েছিলেন। সম্প্রতি পদোন্নতি পেয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী হয়েই রাজশাহী ফিরেছেন রাশেদুল ইসলাম। চাকরিজীবনের প্রায় ১৬ বছরই তিনি রাজশাহীতে কাটিয়েছেন। এবার এসেই জড়িয়েছেন অনিয়মে। এখন তার অফিস পরিচিত পুরনো ঠিকাদার আর আত্মীয়-স্বজনের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে।

গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এবার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের জরুরি সংস্কারের জন্য বার্ষিক ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ-১। নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম আগেই সম্বন্ধি, বন্ধু-বান্ধব আর পরিচিত ঠিকাদারদের কাজ বণ্টন করে দিচ্ছেন। পরে শেষ হচ্ছে টেন্ডার প্রক্রিয়া। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় গোপন দর ফাঁস করে কাজ দেওয়া হচ্ছে প্রকৌশলীর সম্বন্ধি আর বন্ধু-বান্ধবদের। অন্য সাধারণ ঠিকাদাররা পুরোপুরি বঞ্চিত হচ্ছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজশাহী গণপূর্তের এক ঠিকাদার বলেন, ‘নতুন নির্বাহী প্রকৌশলী আসার পরে যেসব ঠিকাদার কাজ পাচ্ছেন, গত কয়েক বছর ধরে রাজশাহী গণপূর্তের তারা কোনো কাজ করেননি। অথচ তাদেরই যোগ্য বলে কাজ দেওয়া হচ্ছে। সংস্কার কাজ আগে শুরু হয়ে যাচ্ছে, পরে টেন্ডার হচ্ছে। তার মানে অবশ্যই দরপত্রের গোপন দর অবশ্যই ফাঁস করা হচ্ছে। এতে অযোগ্যরা কাজ পাচ্ছে, আর যোগ্য ঠিকাদাররা হাত গুটিয়ে বসে আছে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্প্রতি ৬ লাখ ৬০ হাজার টাকায় রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ভবনের সংস্কার কাজ করা হয়। কাজটি করেছেন মো. রফিক নামের এক ঠিকাদার। এই রফিক নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলামের স্ত্রীর আপন চাচাতো ভাই। রফিক রাজশাহী গণপূর্ত অফিসের জোন কার্যালয়ের ছাদ সংস্কার এবং টাইলস বসানোর আরও দুটি কাজ করছেন। কাজ দুটি বর্তমানে চলমান।

গত ১০ মার্চ রাজশাহী গণপূর্তের জোন কার্যালয়ের টাইলসের কাজ দেখতে গিয়ে সেখানে বিদ্যুৎ নামের এক ব্যক্তিকে পাওয়া যায়। তিনি জানান, এই কাজ করছেন ঠিকাদার রফিক। তিনি শুধু কাজ দেখাশোনা করছেন। ঠিকাদার রফিকের বাড়ি নগরের হেতেমখাঁ এলাকায়।

গত শনিবার হেতেমখাঁ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, হেতেমখাঁ ছোটমসজিদের সামনে একটি গলির মুখে ঠিকাদার রফিকের বাড়ি। আর গলির ভেতরে ডান পাশে প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলামের শ্বশুরবাড়ি। স্থানীয়রা জানান, প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলামের শ্বশুরের নাম মো. বাবলু। সাহেববাজারের বাবলু ক্লথ স্টোরের মালিক তিনি। বাবলুর আপন ভাই ধীরুর ছেলে ঠিকাদার রফিক। রফিকের চাচাতো বোন তাজরিয়ান লোপাকে বিয়ে করেছেন রাশেদুল।

তিনি শুধু সম্বন্ধি রফিককে কাজ দিয়েই থেমে থাকেননি। খুশি করেছেন আরেক নিকটাত্মীয় ফয়সাল কবিরকেও। তাকে দিয়ে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরের একটি সংস্কার কাজ করিয়েছেন প্রকৌশলী রাশেদুল। অফিস দখল করেছেন রাশেদুলের বন্ধু ইয়াসির আরাফাতও। টেন্ডার হওয়ার আগেই সার্কিট হাউস ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সংস্কার কাজ তাকে দেওয়ার কথা হয়েছে। দ্রুতই এসব কাজের টেন্ডার হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অথচ আগে রাজশাহী গণপূর্তের কাজের তেমন অভিজ্ঞতাই নেই রফিক, ফয়সাল ও আরাফাতের।

গণপূর্ত্রের কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, গতবছর প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলীর সরকারি বাসভবনের সংস্কার কাজ করা হয়। কয়েকমাস আগে রাজশাহী এসে নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম আবারও এ বাড়ির সংস্কার করেন। এবারও খরচ দেখান প্রায় ২০ লাখ টাকা। ডলার নামের এক ঠিকাদারের নামে কাজটি করা হলেও বাস্তবে প্রকৌশলী নিজেই টুকটাক কাজ করে মোটা অংকের বিল জমা দিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতবছর প্রায় ২০ লাখ টাকা খরচের পর এবারও বিপুল টাকা ব্যয় দেখে অডিট ও হিসাব বিভাগ থেকে আসা অফিসের হিসাবরক্ষক আসিফ এই বিল ছাড় করেননি।

গণপূর্তের কর্মচারীরা জানান, চাকরিজীবনের প্রায় পুরোটা সময়ই রাশেদুল রাজশাহীতে থেকেছেন। সহকারী প্রকৌশলী থেকে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হওয়ার পর নির্বাহী প্রকৌশলী হয়েছেন। আগে থেকেই তার রাজশাহীর হাতেগোনা কিছু ঠিকাদারের সঙ্গে সম্পর্ক। নির্বাহী প্রকৌশলী হয়ে আসার পর ঠিকাদারদের সেই সিন্ডিকেট গণপূর্ত দখল করেছে। নির্বাহী প্রকৌশলীর অফিসে সারাক্ষণ ওই ঠিকাদার এবং আত্মীয়-স্বজনদের আড্ডা থাকে।

রোববার (১৬ মার্চ) বেলা সাড়ে ১১টায় নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলামের অফিসে গিয়েও ঠিকাদারদের আড্ডা দেখা গেল। প্রকৌশলীর সামনের চেয়ারেই বসে ছিলেন তার সম্বন্ধি ও ঠিকাদার মো. রফিক। এই প্রতিবেদক যখন রাশেদুলের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন রফিকই নানা প্রশ্নের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। সম্বন্ধি রফিক আর বন্ধু-বান্ধবকে সব কাজ দেওয়ার ব্যাপারে প্রকৌশলী রাশেদুলকে প্রশ্ন করা হলে রফিক অফিস থেকে বেরিয়ে যান।

প্রশ্ন শুনেই কিছুটা উত্তেজিত হয়ে প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম বলেন, তারা কি আমাকে দেখে ঠিকাদার হয়েছে না কি? আমি এখানে আসার আগে থেকেই তো তারা ঠিকাদার।’ টেন্ডার প্রক্রিয়ার গোপন দর ফাঁস করার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘ইজিপি প্রক্রিয়ায় ঠিকাদাররা অংশ নেন। কে কাজ পাবেন তা বলা যাবে না। যিনি যোগ্য তিনি কাজ পান।

রাশেদুলের সম্বন্ধি ও ঠিকাদার মো. রফিক বলেন, ‘আমি অনেক আগে গণপূর্তের ঠিকাদারীর লাইসেন্স করেছি। কিন্তু এতদিন ইঞ্জিনিয়ারকে টাকা দিয়ে কাজ নিতে যাইনি। এখন কাজ নিতে টাকা লাগে না, তাই কাজ করছি।’ গোপন দরপত্র ফাঁসের বিষয়ে তিনি বলেন, জরুরি মেরামত কাজগুলো সব দপ্তরে এ রকমই হয়। কাজ শুরু হয়ে যায়, পরে টেন্ডার হয়।

কাজ পাওয়ার বিষয়ে কথা বলতে নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলামের আত্মীয় ফয়সাল কবির ও বন্ধু ইয়াসির আরাফাতের মোবাইলে কয়েকদফা ফোন করা হলেও তারা ধরেননি।

রাজশাহী গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল গোফফার বলেন, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় যে কোনো ব্যক্তিই অংশ নিতে পারেন। আত্মীয় হলেও তিনি কাজ পেলে করতে পারেন। দেখার বিষয়, গোপন দর ফাঁস করে কাজ দেওয়া হচ্ছে কি না এবং কাজ পাওয়ার পর তার মান কেমন থাকছে। অভিযোগ যেহেতু উঠেছে, আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখব।

নিজের সম্বন্ধি আর বন্ধু-বান্ধব ছাড়া কাউকেই চিনছেন না রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম।....সংগৃহীত ছবি