
“কী রে, মান্না, তুই স্কুলে যাবু না, বাবা? স্কুল বেলা যে পুঁইয়ে যায়! সে খেয়াল কী আছে?” মা'র ডাকে স্পষ্ট করে সাড়া দিল না মান্না। সে এই যে একঘেয়েমি করে বসেছে—স্কুলে যাবে না, তো যাবেই না।
“তুই স্কুলে যাবু না, তো ভ্যান চলে খাবু।” — মা।
অনেক বকাবকির পর, জোর-জবরদস্তি করে তাকে স্কুলে পাঠানো হলে, সে স্কুলে না গিয়ে শিমুলদের কুশার ক্ষেতের পূর্ব পাশের আম গাছে উঠে সময় ক্ষেপণ করে। সবে মাত্র জৈষ্ঠ্য মাস, তাই আমগুলো পরিপক্ব হতে শুরু করেছে। একটা কাঁচা আম ছেঁড়ার পরে—“আমটি তো বেশ ভারী মিষ্টি লাগছে, মান্না। কাঁচা মিঠা আম বলে কাঁচাও খাওয়া যায়।” এই বলেই দ্বিতীয় কামড় বসাতেই উত্তর দিকে তাকিয়ে—“ওরে, এরা কোথ থেকে আসছে? রেডিওতে এদের কথা শুনলাম না!” — মান্না।
তখন পাকিস্তানি মিলিটারি দলটি মাঠের পূর্ব-দক্ষিণ দিয়ে রুকুনপুর গ্রামে প্রবেশের তোড়জোড় শুরু করে। “তাদের ঘাড়ে তো ভারী অস্ত্রশস্ত্রও নাই, তাহলে এরা আমাদের গ্রামে কেন যাচ্ছে?” — মান্না। মিলিটারি দলটি ইতিমধ্যে সরদারের ভিটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। “যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে।” — মান্না। এই বলে সে আস্তে আস্তে গাছ থেকে নামতে শুরু করছে।
“ইস্, অনেক জোরে কামড় দিল হ্যালা পিঁপড়েটা।” — মান্না।
ডান হাতে পিঁপড়ের কামড়ের যন্ত্রণায় বুড়ো আঙুলটা অবশ হয়ে গেল। তারপরেও সে দ্রুত নেমে এসে চুপিচুপি কুশারের ক্ষেতের মধ্যে মিনিট খানেক বুদ্ধি কষলো—কীভাবে মিলিটারি দলটিকে ফাঁকি দিয়ে রাস্তার পশ্চিম পাশে যাওয়া যায়। তারপর সে ভুট্টা ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে রাস্তা পেছনে ফেলে কোরীর বিলের দিকে এগিয়ে চলল। চলতে চলতে হঠাৎ একটা লাল পদ্ম ফুল দেখে থেমে গেল। অনেক দিন থেকে সে এরকম একটা ফুল খুঁজছিল, কিন্তু পায়নি। ফুলটা সে নিবে কিনা, চিন্তিত হয়ে গেল।
এদিক-ওদিক তাকাতাকি করে চৌধুরী সাহেবকে দেখতে না পেয়ে, সে গুঁড়ি গুঁড়ি পায়ে চৌধুরীর পুকুর পাড়ের ঝোপঝাড় অতিক্রম করে চৌধুরী সাহেবের দোতলা মাটির ঘরের পশ্চিম পাশের জানালায় গিয়ে আগে দুইবার সচেতনতার সাথে উঁকি দেয়। কিন্তু চৌধুরী সাহেবকে দেখতে না পেয়ে একটু বিস্মিত হলো। সে চিন্তা করল জানালায় আঙুলি দিয়ে শব্দ করবে। তৎক্ষণাৎ একজন কালো রঙের পাগড়ি, পাঞ্জাবি পরিহিত, উঁচু এবং হৃষ্টপুষ্ট অপরিচিত লোক এগিয়ে যাচ্ছে সরদারের ভিটের দিকে। ব্যাপারটা দেখে সে খানিকটা হোঁচট খেয়ে চৌধুরীকে না ডেকে ছাগললতার ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল।
লোকটি চলে যেতেই আবার সে চৌধুরীর জানালায় সতর্কতার সাথে কয়েকটা টোকা দিল। কিছুক্ষণ পরে চৌধুরীর ছোট মেয়েটা জানালা খুলতেই মান্না একটু ইতস্তত বোধ করল। কিন্তু এখন ইতস্তত বোধ করার সময় নাই। সে মেয়েটিকে চৌধুরীর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে জানতে পারে চৌধুরী সাহেব একটা জমি ক্রয়ের জন্য ৮ মাইল দূরের একটি গ্রাম, নিসূতিপুরে, গিয়েছেন। ব্যাপারটা শুনে সে একটু চিন্তিত হলো, কিন্তু এখনো চারপাশে গভীরভাবে নজর রাখছে। সে এবার চৌধুরী সাহেবের ঘনিষ্ঠ দাশ লঘুর কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
চলতেই চৌধুরী সাহেবের বাড়ির দরজা অতিক্রম করতেই চৌধুরী সাহেব সশরীরে উপস্থিত হলেন। চৌধুরী সাহেব অত্যন্ত সৎ লোক, তিনি কোনো অহংকার করলেন না।
“নিয়তির মা, কাঠের চৌকিটা উদ্দীনের ছেলেটাকে বসতে দাও, আর দুই গ্লাস লেবুর শরবত নিয়ে এসো।” — চৌধুরী সাহেব।
“এখন বসার সময় নাই!” — মান্না।
“তুমি এক গ্লাস শরবত খাও, বাবা, দেখে তো মনে হচ্ছে প্রচণ্ড হাঁপিয়ে গেছো।” — চৌধুরী সাহেব।
“না না আঙ্কেল, এখন সময় নাই! বেঁচে থাকলে অন্য কোনো দিন খাবো।” — মান্না।
“কেন? তোমাকে কি কেউ মারতে আসছে?” — চৌধুরী সাহেব।
“না আঙ্কেল।” — মান্না।
“তাহলে তুমি হাঁপাচ্ছ কেন?” — চৌধুরী সাহেব।
“মিলিটারি, উত্তরের সরদারের ভিটের দিকে মিলিটারি!” — মান্না।
এই বলে চৌধুরী সাহেবের দোতলা বাড়ির পেছন দিয়ে ঝোপঝাড়ের মধ্যে দৌড় দিল মান্না। চৌধুরী সাহেব পরপর দুবার ডাকলেও একঘেয়ে যন্ত্রের মতো সে দৌড়ে পালালো। চৌধুরী সাহেব ইতস্তত হয়ে ঘটনাটা জানার চেষ্টা আগ্রহ করে, এমন সময় লঘু এসে হাজির।
“আসসালামুয়ালাইকুম হুজুর।”
“ওয়ালাইকুমুস সালাম। লঘু, তুমি কি গ্রামের সকল খবর রাখো?”
“জে হুজুর, আপনি তো জানেনই।”
“তুমি মনে হয় আজকের খবর জানতে পার নি।”
“কী খবর হুজুর?”
“গ্রামের উত্তরে সরদার ভিটের দিকে মিলিটারি।”
“ওওওও!”
“লঘু, তুমি একবার সরদার ভিটে থেকে খোঁজ নিয়ে এসো।”
“জে হুজুর।”
“আর সাবধানে যেও, বোঝই তো মিলিটারি মানুষ।”
“জে হুজুর, শুধু দেখেই টুপ করে চলে আসব।”
“তাড়াতাড়ি যাও লঘু।”
চৌধুরী সাহেব গম্ভীর হয়ে রইল, কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছে না। খানিকক্ষণ পরেই ভীত স্বরে ফিরে এলো লঘু।
“হুজুর, গ্রামের অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন, মনে হয় কালো মেঘ নেমে এসেছে!”
“কেন রে লঘু, কী দেখলি? দ্রুত বল!”
“উত্তরে কমলার মাকে এবং আরো মহিলাদের পাকিস্তানি মিলিটারি বন্দি করে নিয়ে যাইতাছে।”
চৌধুরী সাহেব কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে গেল, কী করবেন বুঝতে পারলেন না। ওদিকে গাঁয়ে আর্তনাদ শুরু হয়ে গেছে। সময়টা খুবই ভয়ংকর। “লঘু, তুমি রায়চন্দ্র উকিলকে আমার কাছে ডেকে পাঠাও।”
“জে হুজুর।”
কিছুক্ষণ পরে রায়চন্দ্র উপস্থিত হলো চৌধুরী সাহেবের বাড়িতে। বিস্তর পরামর্শ হলো কী করা যায়।
“গ্রামের মা বোনদের হায়েনাদের হাত থেকে বাঁচাতে হবে উকিল!”
“চৌধুরী সাহেব, কিছু একটা করতে হবে, আর তাতে আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন।”
“অবশ্যই, তা তুমি কিছু কী ভেবেছো?”
“চৌধুরী সাহেব, তার জন্য আপনার দোতলা ঘরটা প্রয়োজন।”
“অবশ্যই উকিল।”
চৌধুরী সাহেব লঘুকে ডেকে পাঠালেন। চৌধুরী সাহেব লঘুকে বললেন, “লঘু, তুমি গ্রামের উত্তর পাড়া, দক্ষিণ পাড়া, সরদারদের পাড়া, পশ্চিম পাড়া এবং চৌধুরী পাড়ায় সকল লোকদের খবর দাও।”
“কী খবর হুজুর?” — লঘু।
“তাঁরা অবিলম্বে গ্রামের সকল মহিলাদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য যেন আমাদের চৌধুরী বাসায় পাঠিয়ে দেয়। লঘু, তুমি দ্রুত যাও যত দ্রুত পারো! আর হাঁকার জন্য চোঙাটা নিয়ে যাও।”
“চৌধুরী সাহেব, গ্রামের সকল মহিলাদের ১০ দিনের খাবারের ব্যবস্থা আমি দিতে রাজি।”
“আচ্ছা উকিল, আমি ২০ দিনের খাবারের ব্যবস্থা করব।”
“ঠিক আছে চৌধুরী সাহেব, তাহলেই যথেষ্ট, আর গ্রামের মানুষ কে দেখে রাইখেন।”
“আচ্ছা উকিল।”
“আমি চললাম চৌধুরী সাহেব।”
ভারাক্রান্ত চোখে চৌধুরী সাহেব শুধু তাকিয়ে রইলেন উকিলের দিকে। উকিল চলতে থাকল নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে। উকিলের বুদ্ধিতে গ্রামের সকল মহিলাদের পাকিস্তানি মিলিটারিদের অত্যাচার থেকে মুক্তির জন্য চৌধুরী সাহেবের বাড়িতে আশ্রয় দেওয়া হলো।
কিন্তু পথিমধ্যে হৃষ্টপুষ্ট ব্যক্তিটি এবং তার কিছু সহপাঠী উকিলকে ধরে চোখ বেঁধে টেনেহিঁচড়ে কোনো এক অজানা উদ্দেশ্য নিয়ে যাচ্ছে। সম্ভবত ঘণ্টা দুয়েক পর উকিল নিজেকে আবিষ্কার করল এক অচেনা গুহায়। উকিলকে একজন অচেনা ব্যক্তি বলল, “উকিল, তুমি চৌধুরী সাহেবের বাড়িতে কেন গিয়েছিলে?”
“প্রয়োজনে গিয়েছিলাম।”
“এই বাঙালির বাচ্চা! কার সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় জানিস না?” — বলে চড় বসিয়ে দিল।
এমতাবস্থায় একজন পাকিস্তানি মিলিটারি বাহিনী এসে উকিলকে হত্যার হুমকি দিয়ে বলল, “বাঁচতে হলে বল, চৌধুরী বাড়িতে কী হচ্ছে?”
উকিল বুক উঁচু করে: “চৌধুরী আমায় ডেকে ছিল।”
মাথা বরাবর গুলি ধরে মিলিটারি: “আমি জানি চৌধুরী তোকে ডেকেছিল, কিন্তু কেন ডেকেছিল? ভালোই ভালোই বলবি?”
উকিল: “আমার জীবন থাকতে বলবো না!”
মিলিটারি সাথে সাথে উকিলের পায়ে গুলি বসিয়ে দিল।
মিলিটারি: “কী রে উকিল?”
“জি স্যার, চৌধুরী বাসায় গেরামের মহিলাদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছে।” প্রাণভয়ে এই বলে লুটিয়ে পড়ল উকিল। তারপর হৃষ্টপুষ্ট ব্যক্তিটি উকিলকে কাঁধে করে উঠিয়ে নিয়ে গেল কোনো এক দিকে।
চৌধুরী সাহেব উকিলের সঙ্গে পরামর্শ অনুযায়ী মহিলাদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। এবং এখানেই চৌধুরী সাহেবের বাড়ির দোতলায় মহিলাদের সকল ব্যবস্থা করে চাবি দেওয়া আছে রুমটিতে। প্রথমদিন সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও দ্বিতীয় দিন সকালে আসে মহাবিপদ। চৌধুরী সাহেবের বাড়ির টিনের দরজায় শব্দ এবং আলগা কণ্ঠে—“চৌধুরী সাহেব, বাড়িতে আছেন?”
চৌধুরী সাহেব কণ্ঠটা ঠিক বুঝতে পারলেন না। তিনি চিন্তায় পড়লেন দরজা খুলবে কিনা। আবার চিন্তা করলেন উকিল সাহেব কিনা। কিন্তু তিনি দরজা খুলে বিস্মিত হয়ে গেলেন।
পাকিস্তানি মিলিটারি তাকে জোর গলায় বললেন, “এই শয়তানের বাচ্চা!”
চৌধুরী সাহেবের গলা শুকিয়ে গেল। তিনি মৃদুস্বরে বললেন, “জি স্যার।”
মিলিটারি: “অনলি পাঁচ মিনিট সময় দিব। তুই পরিবার নিয়ে বাড়ি ছাড়।”
চৌধুরী সাহেব: “কেন বাড়ি ছাড়ব?”
মিলিটারি: “এই যে আমার হাত ঘড়িতে টাইমার চালু করলাম, অনলি পাঁচ মিনিট।”
চৌধুরী সাহেব কিছুতেই বাড়ি ত্যাগ করতে রাজি হলেন না। “আমি বাড়ি ছাড়ব না! আমার বাড়িতে আমার বৃদ্ধ বাবা-মা এবং সন্তান আছেন, আমি তাদের রেখে কিছুতেই বাড়ি ত্যাগ করব না।”
এতেই ঘটে গেল বিপত্তি। পাকিস্তানি মিলিটারি বাহিনীর একটি গুলির শব্দে আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠল। পশুপাখি সেই বারুদের গন্ধে দিকবিদিক হয়ে ছোটাছুটি শুরু করল। মুহূর্তের মধ্যে নিস্তব্ধে চৌধুরী সাহেবের রক্তে ভিজে গেল মিলিটারিদের পা।
মিলিটারি: “বাড়িতে আগুন দে! সম্পূর্ণ বাড়ির চারপাশে আগুন দে!”
হৃষ্টপুষ্ট ব্যক্তি: “জি স্যার।”
“কেরোসিন, পেট্রোল বেশি করে দে। এদের পুড়িয়ে মারব।”
“জি স্যার।”
আগুনের লেলিহান শিখায় জ্বলে উঠল চৌধুরী সাহেবের শেষ স্মৃতি, দাউদাউ করে জ্বলতে লাগল বাড়ির চারপাশ। আর ভেতর থেকে ভেসে আসতে লাগল বিচিত্র মানুষের বুক ফাটানো আর্তনাদ। পুড়ে ছাই হয়ে গেলো পৃথিবীর কত স্বপ্ন, কত সন্তানের মা ডাক কত মানুষের শেষ আশ্রয়।
এই আর্তনাদ আর সহ্য করতে পারলো না রুকুনপুরের বাসিন্দা, মেনে নিতে পারলো না মান্না। এখন তার সব শ্রমই বৃথা, কিন্তু তার শেষ আশ্রয় তার মা ভাগ্যের জোরে এখনো বেঁচে আছে হয়তো মান্নার জন্যেই বেঁচে আছে। স্কুল থেকে না ফেরার গল্পই তার মাকে বাঁচিয়েছে, অথচ তার সন্তান স্কুলে যায়নি, তার সন্তান সংগ্ৰাম করেছে। কিন্তু ভাগ্যের ব্যাপারে এখনো মা'র সাথে সেও বেঁচে আছে। তবে মান্না বাড়িতে নেই, সেই যে বেড়িয়েছিল। তার খোঁজে তার মা'র দিন কয়েক বাড়িতে থাকার ভাগ্য হয়নি এবং সে ভাগ্যই তাদের রক্ষাকবচ।
মান্না এবং তার সহপাঠীরা এখন অস্ত্রচালনায় বেশ পটু, এই অল্প বয়সে তাদের মতো কিশোর এতো বড়ো সিদ্ধান্ত নিবে এটা তো অস্বাভাবিক বটেই। মান্না এখন মুক্তিযুদ্ধের কর্নেল আকবরের ১২ নম্বর সাব সেক্টরের একজন নিয়মিত সৈনিক।
আজে কয়েকদিন হলো দিনে একবার খাবার জোটে কিনা সন্দেহ। তাদের সেক্টরে যুদ্ধে প্রায় সবাই নাজেহাল শুধু ক্ষুধার জন্য তিনদিন পর্যন্ত একবেলা পেট ভরে ভাত জোটে না। আগামীকাল সহপাঠী রায়হানের বাড়িতে ভাত খাওয়ার রুটিন আছে, কাল ১০ টায় তার আগে পেটে কিছু পড়ার সম্ভাবনা নেই। সারাদিন-রাত যুদ্ধে যখন শরীর নাজেহাল তখন আর অভিযান সফল হচ্ছে না।
এভাবে পরদিন সকাল সাতটায় যখন ৬ কিলোমিটার পশ্চিমে রায়হানের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেন ১২ নম্বর সাব সেক্টের যোদ্ধরা। তখন সেখানে পৌঁছে গিয়ে হতভম্ব হয়ে গেল কর্ণেল আকবরের নেতৃত্বাধীন সকল যোদ্ধা। সেখানে অন্য একটা সেক্টরের সৈন্যরা এসে একবেলা খেয়ে চলে গেছে।
পরবর্তীতে কর্নেল আকবরের নির্দেশে হরিচকি নামের কোন একটা স্থানের খাবারের মেনু আসলে দুপুর বারোটায় রওনা হয় সেক্টরটি। কিন্তু সেখানেও জোটে নি পেট পুরে, ১০ জনের খাবার ৫০ জনের ভাগে যে পরিমাণ হয় আরকি।
১৩ ই জুন পাকিস্তানি মিলিটারিদের কদমতলী থানায় অভিযান হবে - কর্নেল আকবর
আমরা এই চ্যালেঞ্জ গ্ৰহণে প্রস্তুত স্যার - মান্না
আরো সবাই সম্মতি প্রকাশ করে।
ওদিকে অভিযানের পূর্বে একটি নতুন জায়গায় খাবারের ব্যবস্থা হয়। ব্যবস্থাটা হয় মূলত একটি রুগ্ন, জড়ানো চামড়ার, খিটখিটে বুড়োর দাওয়াতে। ১২ নম্বর সাব সেক্টরের সকল যোদ্ধাদের ভালোবেসে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করে বাঙালিটা। ১২ তারিখে দুপুরে তার বাড়িতে ১২ নম্বর সাব সেক্টরের সকল যোদ্ধাগণ যাত্রা শুরু করে। এবং সকলের সামনে গরুর মাংসের সাথে এক থালা ভাত রাখা হলো। এমতাবস্থায় কর্নেল আকবরের পরিচিত একজন ব্যক্তি এসে সতর্ক করলেন কিছুক্ষণের মধ্যেই সেক্টরটির উপর হামলা করবে পাকিস্তানি মিলিটারি। তখন কর্নেল আকবরের নেতৃত্বাধীন সেক্টরের সদস্য সবাই নিরাপদ স্থানে দৌড়ে পালিয়ে যায়। এই বৃদ্ধ মূলত হৃষ্টপুষ্ট ব্যাক্তিটির পিতা। এবং বাবা-ছেলে মূলত একটি চক্রের সদস্য হয়ে কাজ করছেন। পরদিন সকালে ১৩ তারিখে ১২ নম্বর সাব সেক্টর অভিযানে অংশগ্রহণের পূর্বে জানতে পারে শেষ মুহূর্তে খবর দাতা কর্নেল আকবরের পরিচিত ব্যাক্তিকে তার পরিবার সহ আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে পাকিস্তানি মিলিটারি। এই খবরে কর্নেল আকবরের নেতৃত্বে ১২ নম্বর সাব সেক্টরের সদস্যগুলো প্রাণপণভাবে গুছানো পরিকল্পনা নিয়ে ১০, ৮ এবং ১২ নম্বর সাব সেক্টরের সদস্যগুলোর সাথে কদমতলী থানায় আক্রমণের উদ্দেশ্য যাত্রা শুরু করে।
প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে যাত্রা শেষে ১২ নম্বর সাব সেক্টরটি কদমতলী আতর নদীর উপরে অবস্থিত ব্রিজের নিচে অবস্থান নেয়। নদীতে তখন পানি তলানীতে এবং ছোট ছোট গিমা ঘাস বালির উপর সবুজের স্তর ফেলেছে। শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে একসময় এলোপাথাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করলে কিছুক্ষণের মধ্যে অপর প্রান্তের শত্রু বাহিনীর মেশিন গানের গুলি আরম্ভ হয়। কিন্তু ১০, ৮ নম্বর সাব সেক্টরের কোন রেসপন্স পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁরা হয়তো অন্য কোন বিপদে পড়েছে নয়তো সঠিক সময়ে পৌঁছাতে পারেনি। এমতাবস্থায় কর্নেল আকবরের নেতৃত্বাধীন দলটি কঠিন অবস্থার মুখোমুখি হয়। কিছুক্ষণ গোলাগুলি হতেই হঠাৎ করে বালির উপর লুটিয়ে পড়ে রায়হান। তাকে ব্রিজের নিচে নিয়ে আসতে গিয়ে বা পায়ে এবং হাতে গুলিবিদ্ধ হয় মান্না। তাদের কে অন্যান্য সদস্যরা জীবন ঝুঁকি রেখে ব্রীজের নিচে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। তৎক্ষণাৎ রায়হান মৃত্যুবরণ করেন কিন্তু তখনো বেঁচে ছিল মান্না। মান্নার শরীর বেয়ে অঝোরে রক্ত ঝড়ছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আকবরের নেতৃত্বাধীন সদস্যদের উদ্বেগে মান্নাকে নাসিম নামের একজন স্থানীয় ব্যাক্তির বাসায় নেওয়া হয়। কাঠের চৌকিতে শুইয়ে তাকে সেবা দেওয়া হয় তখনো তার শরীর থেকে রক্ত নিঃসৃত হচ্ছে। তার শরীরের রক্তে চৌকির কাঠ লাল হয়ে গেছে।
"আমি মাকে দেখতে চাই, আমি বাঁচতে পারবো তো! দেশ স্বাধীন হবে তো!" - মান্না। হঠাৎ ডাক্তার আসলো তাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলো এবং বললো সে আর বেঁচে নেই।
লেখক পরিচিতি:
মোঃ সৌরভ হোসেন
দশম শ্রেণী, গোবরচাপাহাট উচ্চবিদ্যালয়
ফোন: ০১৩১০৮২৬৫৬১
ঠিকানা: থানা: বদলগাছি, জেলা: নওগাঁ।