
ঘড়ির কাঁটা তখন ঠিক ১২টা ছুঁয়েছে। অন্য দিনের মতোই গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত ছিলেন জান্নাত। উঠানে খেলছিল তার আদরের দুই বছরের সন্তান আয়ান। কাছেই ছিলেন তার দাদি।
কিন্তু সংসারের টুকটাক কাজে দাদি একটু ব্যস্ত হয়ে পড়তেই অজান্তেই ঘটে যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা! চঞ্চল আয়ান টলমল পায়ে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির পাশের পুকুরের দিকে এগিয়ে যায়। পা পিছলে মুহূর্তেই পানিতে তলিয়ে যায় তার ছোট্ট শরীরটা।
কিছুক্ষণ পর কাজ শেষ করে জান্নাত যখন তার ছেলেকে খুঁজতে শুরু করেন, তখন আর তাকে কোথাও পাওয়া যায় না। আশঙ্কা ধীরে ধীরে ভয়াবহ সত্যে রূপ নেয়।
চারপাশে খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে পুকুর থেকেই উদ্ধার করা হয় আয়ানের নিথর দেহ। মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো পরিবার।
এরপর থেকে যেন পৃথিবীটাই থেমে গেছে জান্নাতের জন্য। ছেলেকে হারানোর শোকে তিনি প্রায় পাগলপ্রায়। বাবা কিবরিয়াও ভেঙে পড়েছেন। দাদি, যার চোখের সামনে নাতি খেলছিল, তিনি বুক চাপড়ে কাঁদতে কাঁদতে বারবার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে জান্নাত বলেন, ‘কেন যে ছেলেকে রেখে কাজে গেলাম! এক মুহূর্তেই হারিয়ে ফেললাম আমার সন্তানকে। আমার বুকের ধনটা চিরদিনের জন্য চলে গেল!’
আয়ানের চাচাতো বোন রুহাছা বাংলানিউজকে বলেন, ‘এই শোক কোনোদিন শুকাবে না। শুধু তার বাবা-মা নয়, আমরা কেউই মানতে পারছি না। আয়ান যখন হাঁটা শিখল, তখন থেকেই দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরত। এখনো মনে হয়, এই বুঝি ছুটে আসবে… তার সেই মায়ামুখটা চোখের সামনে ভাসে সবসময়।’
একটি নয়, অসংখ্য আয়ানের গল্প
দুঃখজনকভাবে এটি শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়। আয়ানের মতোই তার ফুফাতো ভাই, চার বছরের জাবিরও ৮ বছর আগে পুকুরে ডুবে প্রাণ হারিয়েছে। কুমিল্লা সদরের দক্ষিণ পিপুলিয়া গ্রামের ছোট্ট জাবিরও ছিল হাসিখুশি, প্রাণচঞ্চল একটি শিশু।
চলতি বছর পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিতে মাত্র ১৪ দিনে (১৪ থেকে ২৮ মার্চ) আয়ানের মতো আরও ৫০টি শিশু পানিতে ডুবে মারা গেছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে চারটি করে শিশুর মৃত্যু, যা বিশেষজ্ঞদের মতে এক নীরব মহামারিতে রূপ নিয়েছে।
প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি করে পরিবার, একটি করে ভেঙে পড়া পৃথিবী। দেওয়ানগঞ্জে ঈদের আনন্দ মুহূর্তেই শোকে পরিণত হয়, যখন একটি সাঁকো দুর্ঘটনায় একসঙ্গে পাঁচটি শিশু পানিতে তলিয়ে যায়।
এ ছাড়া অন্তত আটটি ঘটনায় একসঙ্গে দুই বা ততোধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এদের অনেকেই ছিল আপন বা নিকট-সম্পর্কের ভাইবোন, যারা একে অন্যকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেরাও ডুবে যায়।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে পাঁচ বছরের নিচের শিশুরা
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মৃত ৫০ শিশুর মধ্যে ২০ জনের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। এ বয়সে শিশুরা সাঁতার জানে না, পানির গভীরতা বোঝে না, ঝুঁকি সম্পর্কেও সচেতন নয়।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা ছোট্ট আবরাহামের। প্রথম জন্মদিনও উদযাপন করা হয়নি তার। নানাবাড়ির বাথরুমে একটি বালতির পানিতে ডুবে মৃত্যু হয় তার!
কখন বাড়ে ঝুঁকি?
সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘ ছুটি মানেই গ্রামে যাওয়া, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়ানো, নতুন পরিবেশে অবাধ চলাফেরা। কিন্তু এই সময়েই সবচেয়ে বেশি ঘটে দুর্ঘটনা।
গবেষণা বলছে, সারা বছরে যত শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়, তার প্রায় ৩৫ শতাংশই ঘটে দীর্ঘ ছুটির সময়। কারণ, শিশুদের ওপর তদারকি কমে যায়, আর তারা নতুন পরিবেশে ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক শিশুর আগে থেকেই খিঁচুনি বা শ্বাসকষ্টের প্রবণতা ছিল, যা তাদের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
আগের বছরগুলোতেও একই চিত্র
এই প্রবণতা নতুন নয়। ২০২৫ সালের ঈদের ছুটিতে ১২ দিনে ৪৯ জন পানিতে ডুবে মারা যায়, দুজন বাদে সবাই শিশু। প্রতিদিন গড়ে চারটি মৃত্যু, একই ভয়াবহ বাস্তবতা।
২০২৪ সালেও ঈদুল ফিতরে ৫৮ জন এবং ঈদুল আজহায় ৬৫টি শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। ছেলেশিশুর মৃত্যুহার ছিল বেশি, যা তাদের বেশি চঞ্চলতা ও ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের দিকেই ইঙ্গিত করে।
নীরব সংকট, অপ্রতুল হিসাব
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যই প্রকৃত চিত্র নয়; বাস্তবে সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যু নিবন্ধন হয় না, হাসপাতালেও সঠিক তথ্য লিপিবদ্ধ থাকে না।
ফলে এই মৃত্যুগুলো রাষ্ট্রীয় নজরদারির বাইরে থেকে যায়, যেখানে জবাবদিহিরও ঘাটতি রয়ে যায়।
সমাধানে কার্যকর মডেল আইসিবিসি
দেশে দীর্ঘদিন ধরেই পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর হার উদ্বেগজনক পর্যায়ে থাকলেও কার্যকর নীতি বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০টি শিশুর মৃত্যু হলেও গত দুই দশকে এ হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি।
তবে এ পরিস্থিতিতে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে উঠে এসেছে সরকার বাস্তবায়িত ‘ইন্টিগ্রেটেড কমিউনিটি বেইজড চাইল্ড কেয়ার (আইসিবিসি)’ প্রকল্প। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির মাধ্যমে পরিচালিত এ প্রকল্পের প্রথম ধাপ সম্প্রতি শেষ হয়েছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, প্রথম ধাপে ১৬টি জেলায় প্রায় ৮ হাজার কমিউনিটি চাইল্ড কেয়ার সেন্টার স্থাপন করা হয়, যেখানে প্রায় আড়াই লাখ শিশু সেবা পায়। পাশাপাশি কয়েক লাখ শিশুকে সাঁতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব সেন্টারের আওতায় থাকা শিশুদের মধ্যে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ছিল শূন্য।
এ প্রকল্পে প্রায় ১৬ হাজার স্থানীয় নারী কেয়ারগিভার ও সহকারী নিয়োজিত ছিলেন, যারা নিজ নিজ এলাকায় শিশুদের দেখভাল করতেন। কমিউনিটি পর্যায়ে পরিচালিত হওয়ায় স্বল্প ব্যয়ে এই মডেল বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণও নিশ্চিত হয়েছে।
শুধু শিশু সুরক্ষা নয়, এ উদ্যোগের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও ইতিবাচক। সেন্টারে শিশু নিরাপদে থাকায় মায়েরা ঘরের কাজ বা অর্থনৈতিক কার্যক্রমে বেশি সময় দিতে পারছেন। ফলে তাদের উৎপাদনশীলতা বাড়ছে।
তবে প্রকল্পটির প্রথম ধাপ শেষ হওয়ার পর তা ধারাবাহিকভাবে চালু না থাকায় অনেক সেন্টার বন্ধ হয়ে গেছে বা সীমিত পরিসরে চালু রয়েছে। স্থানীয় উদ্যোগে কয়েকটি চালু থাকলেও এটি টেকসই সমাধান নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দ্বিতীয় ধাপের অপেক্ষা
পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে গৃহীত ‘ইন্টিগ্রেটেড কমিউনিটি বেইজড চাইল্ড কেয়ার (আইসিবিসি)’ প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের প্রস্তাব এখন অনুমোদন প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপে রয়েছে। প্রকল্পটির ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) ইতোমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনের ‘সবুজ পাতায়’ উঠেছে।
শিশু একাডেমি ও বিভিন্ন টেকনিক্যাল পার্টনারের সহায়তায় প্রস্তুত করা এই প্রস্তাবটি মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে এটি একাধিক প্রশাসনিক ধাপ অতিক্রম করছে।
পরিকল্পনা কমিশন প্রস্তাবটি যাচাই-বাছাই করছে। এর পাশাপাশি প্রকল্পের জনবল কাঠামো নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী হয়েছে কি না, তাও পরীক্ষা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রকল্পটির সম্ভাব্য আর্থ-সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা হবে। এই প্রক্রিয়া শেষে প্রস্তাবটি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) যাওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে, আগের সরকারের আমলে গৃহীত এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর যৌক্তিকতা ও অনিয়ম পর্যালোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের নেতৃত্বাধীন বিশেষ কমিটি প্রস্তাবটি যাচাই করবে। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতেই প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদনের দিকে অগ্রসর হবে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রকল্পটির বাজেট ধরা হয়েছে ৮০০ কোটির বেশি। এতে আগের ১৬টি জেলার সঙ্গে নতুন করে আরও ১৪টি জেলা যুক্ত করে মোট ৩০ জেলায় কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। মোট অর্থায়নের প্রায় ৯০ শতাংশই সরকারি (জিওবি) তহবিল থেকে আসার প্রস্তাব রয়েছে।
ইতোমধ্যে প্রকল্পটি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে এমআইএসে উপস্থাপনের প্রয়োজনীয় ধাপগুলোও সম্পন্ন করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনুমোদন পেলে এটি শুধু পূর্বের সফল মডেলকে সম্প্রসারণই করবে না, বরং পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু কমাতে জাতীয় পর্যায়ে একটি কার্যকর ও টেকসই উদ্যোগ হিসেবে ভূমিকা রাখবে।
দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি
বেসরকারি সংগঠন ‘সমষ্টি’র নির্বাহী পরিচালক মীর মাসরুর জামান (রনি) বাংলানিউজকে বলেন, আইসিবিসি নতুন কোনো প্রকল্প নয়; বরং বিদ্যমান কার্যকর মডেলটির সম্প্রসারণ। তাই দ্রুত অনুমোদন দিয়ে বাস্তবায়ন শুরু করা জরুরি। প্রয়োজনে বাজেট ও পরিসর সামঞ্জস্য করে হলেও প্রকল্পটি চালু রাখা উচিত।
তিনি বলেন, শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। তাই পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে আইসিবিসি মডেলকে দ্রুত পুনরায় চালু ও সম্প্রসারণের বিকল্প নেই।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু সুরক্ষায় শুধু সচেতনতা নয়, প্রয়োজন কাঠামোগত উদ্যোগ। কমিউনিটি পর্যায়ে নজরদারি, প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ এবং অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানো—এসব একসঙ্গে কাজ করলেই এই মৃত্যুহার কমানো সম্ভব।
__সূত্র: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর