Template: 1
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
বিজয় বাংলা নিউজ
জাতীয় দৈনিক | bijoybangla.news
QR
ই-পেপার / অনলাইন সংস্করণ
Sunday , ০৩ মে ২০২৬ | ০৪:১৯ অপরাহ্ন

রাবিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগে ব্যাপক অনিয়মের রেকর্ড

রাজশাহী ব্যুরো:- ০৩ মে ২০২৬

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দলীয় প্রভাবের অভিযোগ উঠেছে। সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ্‌ হাসান নকীবের দায়িত্বকালীন সময়ে এসব নিয়োগ নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা বিতর্ক ও প্রশ্ন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের একটি শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে। নিয়োগ পরীক্ষায় মেধাতালিকায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেও বাদ পড়েন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ সালাম। অথচ তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং দুটি স্বর্ণপদক লাভ করেন। কিন্তু তাকে বাদ দিয়ে প্রথম, তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানধারীদের নিয়োগ দেওয়া হয়।

এ ঘটনায় নিয়োগ বোর্ডের বিশেষজ্ঞ সদস্য অধ্যাপক মো. ইস্রাফিল চূড়ান্ত ফলাফলে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান। তবুও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়োগ অনুমোদন দেয়। এ সালাম অভিযোগ করে বলেন, অধিক যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দিয়ে কম যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা স্পষ্ট অন্যায় ও বৈষম্য।

অভিযোগ রয়েছে, অধ্যাপক নকীবের ৫৫৭ দিনের দায়িত্বকালে ১৫টি সিন্ডিকেট সভার মাধ্যমে অন্তত ৪৭৮ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন ১৫৪ জন শিক্ষক, ছয়জন চিকিৎসক, তিনজন কর্মকর্তা এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ৩১৫ জন কর্মচারী। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এত বিপুল নিয়োগের নজির খুব কমই রয়েছে।

তার মেয়াদকালের অন্যতম বিতর্কিত ঘটনা হলো- এইচএসসি পাস দুই ব্যক্তিকে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দেওয়া। অভিযোগ রয়েছে, পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়ে নিয়োগ বোর্ড গঠন করে এ নিয়োগ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে নিজের শ্বশুরকে ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়াও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিভাগে একটি শূন্য পদের বিপরীতে ১০ জন শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়, যা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নীতিমালার পরিপন্থি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। পরে বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।

চারুকলা অনুষদের মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের শর্ত পরিবর্তন নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। দুই বছর মেয়াদি মাস্টার্স ডিগ্রির শর্ত সংযোজন করা হয়, যা রাবির শিক্ষার্থীদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অভিযোগ রয়েছে, ডিনের এক আত্মীয়কে সুযোগ দিতে এ শর্ত আরোপ করা হয়েছিল। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর ওই নিয়োগ কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ দিতে উপাচার্যের পক্ষ থেকে একাধিকবার চিঠি দিয়ে তাগাদা দেওয়ার ঘটনাও নজিরবিহীন বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা। একজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক বলেন, দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে এমন উদ্যোগ আগে দেখেননি।

এছাড়া কর্মকর্তা নিয়োগেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। জনসংযোগ দপ্তরে বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই একজনকে অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। আবার স্নাতক শেষ হওয়ার আগেই একজনকে সহকারী প্রোগ্রামার পদে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা প্রচলিত নিয়মের পরিপন্থি। একই পদে নিয়োগ পাওয়া আরেকজন পরে সনদপত্র দেখাতে না পারায় তার চাকরি বাতিল করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারেও বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই একাধিক চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব নিয়োগে যোগ্যতার চেয়ে দলীয় বিবেচনাই প্রাধান্য পেয়েছে।

নাট্যকলা বিভাগে শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও সামনে আসে। একটি ফোনালাপের রেকর্ড সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা ফরেনসিক পরীক্ষায় সত্য বলে প্রমাণিত হয়। তবে বিতর্কের মধ্যেও নিয়োগ কার্যক্রম বাতিল করা হয়নি।

এদিকে, দৈনিক মজুরিভিত্তিক ৩১৫ জন কর্মচারী নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক আনুগত্য ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে এসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যদিও প্রশাসন বিষয়টি অস্বীকার করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একটি অংশের দাবি, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও মেধার পরিবর্তে দলীয় প্রভাব ও আত্মীয়করণ গুরুত্ব পেয়েছে। তাদের মতে, বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি।

এ বিষয়ে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ্‌ হাসান নকীব বলেন, তার সময়ে কোনো অনিয়ম হয়নি এবং অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন।

অন্যদিকে বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, কিছু নিয়োগে নিয়মনীতি অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় মেধাবীরা বঞ্চিত হবে এবং প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দলীয় প্রভাবের অভিযোগ উঠেছে।