Template: 1
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
বিজয় বাংলা নিউজ
জাতীয় দৈনিক | bijoybangla.news
QR
ই-পেপার / অনলাইন সংস্করণ
Tuesday , ০৫ মে ২০২৬ | ০৮:৩১ অপরাহ্ন

সেই শিশুর বর্ণনায় উঠে এলো ভয়াবহ তথ্য

বিজয়বাংলা নিউজডেক্স : ০৫ মে ২০২৬

‘মসজিদের বারান্দায় দুইজনকে ডেকে কোলে নিয়ে বলতো- এটা আমার আম্মু, ওটা আমার বউ। হুজুর মাঝখানে বসতো আর আমাদের দুইপাশে বসাইতো। আর বলতো- এটা আমার আম্মু, ওটা আমার বউ। কাকে বউ বলছে ওটা ঠিক মনে নেই। আগে শুধু টাকা দিত, আদর করত, আম্মু আম্মু বলে ডাকত। গায়ে হাত দিয়ে বলতো এগুলো আদর। নিজের কোলে বসাইতো তারপর বলতো এগুলো আদর। ওই মসজিদের বারান্দায় কোলে বসিয়ে রাখতো। টাকা দিয়ে বলতো- এগুলো দিয়ে মজা খেতে। আমি বলতাম লাগবে না, জোর করে দিত। কখনো ১০০ টাকা, ৫০ টাকা বা ২০ টাকা দিত। আর মাঝে মাঝে বলতো- কিছু লাগলে ওনার কাছে বলতে।’

এভাবেই বিকৃত যৌনাচারের বলি হওয়া ১২ বছরের শিশুটি তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানায় গণমাধ্যমকে। ধর্ষণের শিকার শিশুটি এখন ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। শারীরিক জটিলতায় বর্তমানে তার জীবন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সন্ধ্যায় মদন থানায় মেয়েটির মা আমান উল্লাহ সাগরকে অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করেন। অভিযুক্ত শিক্ষক উপজেলার কাইটাইল ইউনিয়নের পাঁচহার বড়বাড়ি গ্রামের মৃত শামসুদ্দিন মিয়ার ছেলে। মামলা দায়ের করার ১১ দিন হলেও এখনো আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তবে মামলার দ্বিতীয় আসামি মাইমুন ওরফে মামুন মিয়া আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। তিনি সম্পর্কে আসামির আপন ভাই।

ভুক্তভোগীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কখনো মসজিদের বারান্দায় কোলে বসিয়ে, কখনো মাদরাসার রুমে আটকে রেখে চলেছে এই নিষ্ঠুরতা। শিশুটি যখন চিৎকার করার চেষ্টা করেছে, তখন অভিযুক্ত ওই শিক্ষক তার মুখ চেপে ধরেছে। এমনকি মামার কাছে বিচার দেওয়ার কথা বলে ভয় দেখিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে এই নির্যাতন আড়াল করে রাখা হয়েছে। তবে এ ঘটনার শিকার শুধু এই একটি শিশুই নয়, তার সহপাঠী তানিয়াও (ছদ্মনাম) একইভাবে এই লালসার শিকার হয়েছে বলে শিশুটি জানায়। শিক্ষক যখন এমন ভক্ষক হয়ে দাঁড়ায়, তখন আমাদের শিশুদের নিরাপত্তা আজ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে? সেই প্রশ্নই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

সোমবার (৪ মে) সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, মদন উপজেলার কাইটাইল ইউনিয়নের বড়বাড়ী ভগবৎপুর এলাকায় ২০২২ সালে হযরত ফাতেমাতুজ জোহরা (র.) কওমি মহিলা মাদরাসাটি স্থাপিত হয়। অভিযুক্ত শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর তখন মাদরাসা পরিচালক ও শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পাশাপাশি তিনি গ্রামের মসজিদে ইমামতি করতেন। ওই মসজিদ ও মাদরাসার মাঝে শুধু ৫-৬ ফুট প্রস্থের একটি পায়ে হাঁটা পথ রয়েছে। এ পথটিই মসজিদ ও মাদরাসার মাঝের ব্যবধান। যা সাধারণত এলাকার মানুষের চোখে পড়ে না।

মাদরাসা অঙ্গন

স্থানীয় মসজিদের বারান্দার উত্তর পার্শ্বে ছোট টিনের বেড়া দেওয়া একটি কামরা রয়েছে যেটি মসজিদের ইমামের বসবাসের স্থান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ওই রুমেই এই শিশুটিকে ধর্ষণ করা হয় বলে জানা গেছে। 

শিশুটি তার বর্ণনায় বলে, ‘এখান (বাড়ি) থাইকা গেলে তারপরে আমাদের মাদরাসায় সারাক্ষণ পড়ায়। তারপরে ১টা বাজে টিফিন খাওয়ার সময় দেয়। টিফিন খাই এরপর আমাদের ২টা বা ৩টার দিকে ছুটি দেয়। ছুটি হইলে তারপরে আমাকে সবার আগে বলে- মসজিদে মানুষ নামাজ পড়বে, মসজিদটা ঝাড়ু দিয়া যাইতে। তারপরে ঝাড়ু দিতে গেলে বলে- আমার বিছানাটাও একটু ঝাড়ু দিয়া দেও। তারপরে রুম ঝাড়ু দিতে গেলে দরজাটা লাগায় ফালায়। আমারে যে সময় ধরছে ওই সময় আমি চিৎকার চেঁচামেচি করছি। কিন্তু আমার মুখের মধ্যে ধরছিল। উনি একদিন ধরছে মাদরাসায় আর একদিন মসজিদের বারান্দায়।’

মাদরাসাটিতে গিয়ে দেখা যায়, একটি টিনের স্থাপনা। যা চতুর্দিক থেকে টিনের বেষ্টনী দিয়ে রাখা হয়েছে। বাইরে থেকে ভেতরের কিছুই দেখা যায় না। গেট দিয়ে ঢোকার পর ডান পাশে একটি ছোট কামরা। যেটি দিয়ে ঢুকে দুইটি দরজা পার হলেই হুজুরের বিশ্রামের জায়গাটি চোখে পড়ে। ছোট দুইটি রুম যেগুলোর আয়তন ১০ ফুট বাই ১৫ ফুট হতে পারে। বড় রুমটি ১৫ ফুট বাই ৩০ ফুট হতে পারে। তবে ক্লাসরুমের ভেতরে পাশের রুমে সঙ্গে সংযোগের জন্য আলাদা দরজা রয়েছে। 

মাদরাসায় অভিযুক্ত শিক্ষকের বিশ্রামাগার

শিশুটি আরও জানায়, প্রথম ধর্ষণের ২-৩ দিন পর তাকে পর্যায়ক্রমে ৩ থেকে ৪ বার ধর্ষণ করা হয়।

শিশুটির ভাষ্যমতে, ‘মসজিদের রুমের মধ্যেও আবার মাদরাসায়ও সে খারাপ কাজ করছে। আরও ভয় দেখাইছে, কাউরে বলিস না। আমার মামারে তো আমি ভয় পাই- উনি জানে। বাড়িতে মানে আমার মামার কাছে বললে তো আমারে মারবে। তারপরে আবার হুজুরও মারবে বলে ভয় দেখাইছে। তানিয়ার সঙ্গে এরকম কয়বার করছে, ওইটা ও বলত আমার কাছে। পরে ওরা ঢাকা গেছে গা।’

শিশুটির মা বলেছেন, ‘আমি তো বাড়িতে থাকি না। আমার মেয়ে থাকতো আমার মা-বাবার কাছে। মাদরাসায় দিছি ভালোর লাইগা, পড়ার জন্য। কিন্তু ওই হুজুরে এইরকম করল আমার মেয়ের সঙ্গে। ছোট মানুষ বুঝে না, হ্যার লগে এই কামডা করছে।’

শিশুটিকে নিয়ে তার পরিবার মদন ‍উপজেলার হাসপাতাল রোডে অবস্থিত স্বদেশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. সায়মা আক্তারের চেম্বারে যান। সেখানেই অন্তঃসত্ত্বা বিষয়টি তারা নিশ্চিত হন। তবে উন্নত স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর চিকিৎসক শিশুটির শারীরিক অবস্থা নিয়ে আরও উদ্বেগজনক তথ্য জানান।

ডা. সায়মা বলেন, অন্তঃসত্ত্বা শিশুটির গর্ভে থাকা শিশুর বয়স প্রায় ২৭ সপ্তাহের বেশি (প্রায় ৭ থেকে সাড়ে ৭ মাস)। শিশুটির বয়স ১২ বছর, উচ্চতা সাড়ে চার ফুটের কম এবং ওজন মাত্র ২৯ কেজি। শিশুটির সরু কোমরের তুলনায় গর্ভস্থ বাচ্চার মাথার মাপ অনেক বেশি। এটি বড় ধরনের শারীরিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

শিশুটির মা আরও বলেন, ‘ওর পড়াশুনা চলার সময় আমার সঙ্গে কিছুদিন সিলেটে ছিল। তখন ওই হুজুর মাঝে মাঝে ফোন দিত। দিয়ে জানতে চাইতেন- আমার মেয়ে কেমন আছে। আমি কয়েকদিন পরে বাড়িতে আসি, তো আসার পরে ওর কাছে শুইলে আমি দেখলাম, ওর পেটটা একটু বড়। তারপরও আমি এসব ভাবি নাই। ভাবছি, ছোট মানুষের লগে আর কেউ করব এই কাম! তো আমি ডাক্তারের কাছে গেলাম, ডাক্তার কইল ছয় মাসের প্রেগন্যান্ট। পরে আমার মেয়েরে চাপ দিছি। বলি- এই ঘটনা কার লগে করছস? কয়- আমার লগে সাগর হুজুর এমন করছে। সাগর হুজুর কিন্তু ওই দিন থেকেই ভাগছে যেদিন আমি সিলেট থেকে এলাকায় আসছি। ওই দিন থেকেই সাগর হুজুর পলাতক। তো ওর ভাই মামুন মিয়ারে বললাম, ওর ভাই বলে আমরা এইডা সমাধান কইরা ফেলি। যেটা হইছে, হইছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি জানতে চাইলাম কীভাবে সমাধান করবেন? তিনি বললেন- টাকা পয়সা দিয়ে সমাধান করব? আমি বললাম- আমার লোকজনদের সঙ্গে বসে তারপর বুঝব। কিন্তু তারা লোকজন নিয়ে সমাধান করতে বসতে রাজি না। তারা গোপনে সমাধান করতে চায়। তখন আমি বললাম- আমি গোপন সমাধান করতে চাই না। তারপরে গিয়ে আমি মামলা করলাম।’

এ ঘটনায় স্থানীয়রা বলছেন, এতে আমাদের এলাকারও বদনাম হয়েছে। বিশেষ করে ওই হুজুর স্থানীয় মসজিদের ইমাম থাকায় বিষয়টি আরও আলোচনায় উঠেছে।

ঘটনার পর মামলা দায়ের এর আগে থেকেই পলাতক রয়েছেন মামলার আসামি আমান উল্লাহ সাগর। বাড়িতে গিয়ে তার মাকে পাওয়া যায়। এ বিষয়ে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমিও আপনাদের মতো মানুষের মুখে মুখে শুনছি। আমার সঙ্গে কোনো ধরনের কথা হয় নাই। আমি মা, যদি আমার পুত সত্য থাকে তাহলে আইবো। আর যদি অসত্য  থাকে, তাহলে আল্লাহ কোনো জায়গায় নিয়া বিচার করুক। মানুষ বিচার করুক। আমার আর এই পুতেরে নিয়া কোনো দাবি নাই।

এদিকে ঘটনা জানাজানির পর অভিযুক্ত শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর পলাতক থাকা অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছেন। যেখানে তিনি এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি এসবের সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পর্কিত না। এর আগে সে ঢাকায় তার বাবা-মায়ের সঙ্গে ছিল। তার বর্তমান বাবা কিন্তু তার সৎ বাবা। এই মেয়ের চলাফেরা সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। সে হিজাব পরত না, বোরকা পরত না। আমরা যখন জানতে চাইলাম তুমি এভাবে চলাফেরা কেন কর জানতে পারি- মেয়েটা তার নানার সঙ্গে রাতে ঘুমায়। সে কিন্তু মাদরাসায় আসতে চায়নি। মেয়েটি জানিয়েছিল, তার নানা তাকে জোর করে মাদরাসায় দিয়েছে। মেয়েটার মাকেও আমরা বলেছি যে, আপনার মেয়েকে আমরা কন্ট্রোল করতে পারছি না। তার মা মেয়েকে ঠিক না করে বলল, মেয়েকে অন্যখানে নিয়ে যাব। তারপর মেয়েকে নিয়ে সিলেটে চলে যায়। সেখান থেকে এসে বলে এই অবস্থা। আমি শোনার পর থেকে সহ্য করতে পারছি না। আমারও পরিবার আছে। আমি দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধশীল। আপনারা তদন্ত করে দেখেন। অপরাধীকে শাস্তি দেন। আমি আপনাদের কাছে শুধু এই কথাগুলো বলব যে, আল্লাহ তাআলার বিচারের ওপরে যদি শ্রদ্ধাশীল থাকেন, এই বিশ্বাস করেন, তাহলে আমাকে নিয়ে আর এরকম কাজ করবেন না। আপনারা সঠিক তদন্ত করে সঠিক অপরাধী খুঁজে বের করুন। আমি আপনাদের সামনে আর কথা বলতে পারতেছি না। আপনারা সবাই ভালো থাকবেন।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একটি মাদরাসার শিক্ষক বলেন, এমন ঘটনায় আমরা যারা হাফেজ এবং মাওলানা রয়েছি তারা এখন বাইরে গেলে, অনেকে বিভিন্ন রকম মন্তব্য করছে। যেগুলো শুনতে অবশ্যই আমাদের ভালো লাগে না। একজনের কারণে এভাবে সবাইকে দোষারোপ করা উচিত নয়। যে দোষী তার শাস্তি হওয়া উচিত। আমরা কখনো এ ধরনের কাজকে সমর্থন করি না।

স্থানীয় সুতিয়ারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকা বলেন, ১৫ বছর ধরে এই স্কুলের শিক্ষকতা করছি। আমার স্কুলেই পাক-প্রাথমিকে ছাত্রী ছিল এই শিশুটি। এমন ঘটনা শুনে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি। একটি শিশুর সঙ্গে এমন ঘটনা হয়েছে এটি মেনে নিতে পারছি না।

কাইটাইল ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. সোহেল রানা গণমাধ্যমকে বলেন, মেয়েটি শুরু থেকে একজনের নামেই অভিযোগ করে আসছে। এখন পর্যন্ত সে অন্য কারোর নাম মুখে আনেনি। যদি ওই হুজুর এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকেন তাহলে এলাকাবাসীর মতো আমিও চাই আইনের মাধ্যমে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। একটি ভিডিওতে দেখলাম সাগর শিশুটির নানার দিকে অভিযোগের আঙ্গুল তুলেছে। যেটি আসলে গ্রহণযোগ্য না। কারণ তার সম্পর্কে এখন পর্যন্ত আমরা এ ধরনের কোনো অভিযোগ পাইনি।

মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম বলেন, ভুক্তোভোগী শিশুর মা থানায় যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা মামলা রুজু করেছি। তাৎক্ষণিকভাবে আসামি ধরার জন্য আমরা মাঠে নেমেছি। এখনো আসামি ধরতে পারিনি। কারণ ২৩ এপ্রিল মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। মামলা হওয়ার আগে থেকেই আসামি পলাতক। আমরা কাউকে ছাড় দেব না। এই মামলার সংক্রান্ত বিষয়ে ভুক্তভোগীকে কেউ যদি হুমকি দেয় আমরা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।

প্রসঙ্গত, শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর মদন উপজেলার পাঁচহার গ্রামে ২০২২ সালে হযরত ফাতেমাতুজ জোহরা (রা.) মহিলা কওমি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। একই মাদরাসায় তার স্ত্রীও প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত আছেন। ভুক্তভোগী শিশুটি একই এলাকার বাসিন্দা। শিশুটির বাবা দীর্ঘদিন তাদের ছেড়ে নিরুদ্দেশ রয়েছেন। মা জীবিকার তাগিদে সিলেটে গৃহ পরিচারিকার কাজ করেন। শিশুটি তার নানা-নানির কাছে থেকে ওই মাদরাসায় লেখাপড়া করতো।

সেই শিশুর বর্ণনায় উঠে এলো ভয়াবহ তথ্য__সংগৃহীত ছবি