Template: 1
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
বিজয় বাংলা নিউজ
জাতীয় দৈনিক | bijoybangla.news
QR
ই-পেপার / অনলাইন সংস্করণ
Friday , ২২ মে ২০২৬ | ০৭:২৭ অপরাহ্ন

ফ্রান্সে অবৈধ বিদেশিদের সঙ্গে বিয়ে নিষিদ্ধের পক্ষে জোরালো জনমত

অনলাইন ডেস্ক ২২ মে ২০২৬

ফ্রান্সে অনিয়মিত বা অবৈধ অবস্থানে থাকা বিদেশিদের সঙ্গে বিয়ে নিষিদ্ধ করার প্রশ্নে জনমত আবারও তীব্রভাবে সামনে এসেছে।  ফ্রান্সের শীর্ষস্থানীয় গবেষণা ও জনমত জরিপকারী প্রতিষ্ঠান ইনস্তিতু সিএসএ পরিচালিত এক সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, দেশটির ৭৩ শতাংশ মানুষ মনে করেন—যদি বিয়ের দুই পক্ষের একজন অবৈধ অবস্থানে থাকা বিদেশি হন, তাহলে সেই বিয়ে আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করা উচিত। জরিপটি প্রকাশ করেছে সি-নিউজ, ইউরোপ আঁ এবং ল্য ঝুরনাল দু দিমঁশ।

জরিপের ফলাফল বলছে, ফরাসিদের একটি বড় অংশ এখন অভিবাসন ও নাগরিকত্বসংক্রান্ত বিষয়গুলোতে আরও কঠোর অবস্থানের পক্ষে ঝুঁকছে। বিশেষ করে “ম্যারিয়াজ ব্লঁ” (কাগুজে বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিয়ে) নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের মধ্যে এই প্রশ্ন আবারও রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্ব পেয়েছে। ফ্রান্সে বহু বছর ধরেই অভিযোগ রয়েছে যে, কিছু বিদেশি নাগরিক বৈধ কাগজপত্র বা বসবাসের অনুমতি পাওয়ার উদ্দেশ্যে ফরাসি নাগরিককে বিয়ে করেন। যদিও সব ক্ষেত্রে এমন নয়, তবুও এই আশঙ্কাকে কেন্দ্র করেই কঠোর আইন প্রণয়নের দাবি উঠছে।

এই বিতর্ক নতুন করে তীব্র হয় রোবের মেনারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। দক্ষিণ ফ্রান্সের বেজিয়ে শহরের এই মেয়র ২০২৩ সালের জুলাই মাসে এক ফরাসি নারী ও এক আলজেরীয় নাগরিকের বিয়ে সম্পন্ন করতে অস্বীকৃতি জানান। ওই আলজেরীয় নাগরিকের বিরুদ্ধে ওকিউটিএফ, অর্থাৎ ফরাসি ভূখণ্ড ত্যাগের নির্দেশ জারি ছিল। অর্থাৎ প্রশাসন তাকে ফ্রান্স ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল।

রোবের মেনার দাবি করেন, একজন ব্যক্তি যিনি আইনগতভাবে ফ্রান্সে থাকার অধিকার হারিয়েছেন, তার সঙ্গে বিয়ে সম্পন্ন করা “রাষ্ট্রের আইনি ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক”। তবে ফরাসি আইনে বর্তমানে শুধু অনিয়মিত অবস্থানকে বিয়ে বাতিলের কারণ হিসেবে ধরা হয় না। ফলে তার এই সিদ্ধান্তকে আইনের সীমা অতিক্রম হিসেবে দেখা হয় এবং তিনি বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হন। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর মঁপেলিয়ে আদালতে এ মামলার শুনানি আবার অনুষ্ঠিত হবে।

জরিপে বয়সভেদে স্পষ্ট পার্থক্যও উঠে এসেছে। তরুণদের তুলনায় বয়স্কদের মধ্যে এই নিষেধাজ্ঞার প্রতি সমর্থন অনেক বেশি। ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ এই প্রস্তাবের পক্ষে মত দিয়েছেন। ৩৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সীদের মধ্যে সমর্থন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ শতাংশে। আর ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে সমর্থনের হার ৮২ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, বয়স্কদের মধ্যে অভিবাসন নিয়ে নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক উদ্বেগ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এমন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণেও কিছু পার্থক্য দেখা গেছে। জরিপে অংশ নেওয়া পুরুষদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ এই নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করেছেন, যেখানে নারীদের মধ্যে সমর্থনের হার ৭২ শতাংশ। পার্থক্য খুব বড় না হলেও পুরুষদের অবস্থান কিছুটা বেশি কঠোর বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানও মতামতে প্রভাব ফেলেছে। কম আয়ের বা অপেক্ষাকৃত সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির মানুষের মধ্যে এই নিষেধাজ্ঞার সমর্থন বেশি। নিষ্ক্রিয় বা কর্মহীন শ্রেণির ৭৬ শতাংশ এই প্রস্তাবের পক্ষে মত দিয়েছেন। সিএসপি-মোয়াঁ, অর্থাৎ নিম্ন পেশাগত শ্রেণিগোষ্ঠীর মধ্যে সমর্থন ৭৩ শতাংশ এবং সিএসপি-প্লুস, অর্থাৎ উচ্চ পেশাগত শ্রেণির মধ্যে ৭১ শতাংশ।

রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে বিভাজন সবচেয়ে স্পষ্ট। বামপন্থী দলগুলোর সমর্থকদের মধ্যে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা তুলনামূলক বেশি। ইউরোপ একোলোজি লে ভের সমর্থকদের মধ্যে মাত্র ৩৫ শতাংশ এই প্রস্তাব সমর্থন করেছেন। পার্তি সোশিয়ালিস্ত বা সোশ্যালিস্ট পার্টির সমর্থকদের মধ্যে সমর্থনের হার ৫০ শতাংশ। লা ফ্রঁস আঁসুমিজ-এর সমর্থকদের মধ্যে ৪৭ শতাংশ নিষেধাজ্ঞার পক্ষে মত দিয়েছেন।

অন্যদিকে ডানপন্থী ও জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শিবিরে সমর্থন অত্যন্ত প্রবল। রাসঁব্লমঁ নাসিওনাল বা জাতীয় ঐক্য আন্দোলন এবং রেকঁকেত বা পুনরুদ্ধারপন্থীদের মধ্যে ৯০ শতাংশই এই নিষেধাজ্ঞার পক্ষে। লে রেপুবলিক্যাঁ-এর সমর্থকদের মধ্যে ৮২ শতাংশ এই প্রস্তাবকে সমর্থন করেছেন। একইভাবে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর দল রেনেসাঁর সমর্থকদের মধ্যেও ৮২ শতাংশ ইতিবাচক মতামত দিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই জরিপ ফ্রান্সে অভিবাসন প্রশ্নে জনমতের পরিবর্তিত চিত্র তুলে ধরছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিরাপত্তা, পরিচয়, সামাজিক সংহতি ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। ফলে অভিবাসন ইস্যু এখন ফরাসি রাজনীতির কেন্দ্রীয় আলোচনাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ইউরোপজুড়ে ডানপন্থী ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থানের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের জনমত ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও আইন প্রণয়নে প্রভাব ফেলতে পারে বলেও মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

১৯ ও ২০ মে অনলাইনে ১ হাজার ১১ জন প্রাপ্তবয়স্ক ফরাসি নাগরিকের ওপর এই জরিপ পরিচালনা করা হয়। কোটা পদ্ধতির মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের নির্বাচন করা হয়েছে, যাতে জরিপটি জাতীয় জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করতে পারে।

সংগৃহীত ছবি