
ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা জোড়া ভূমিকম্পে ধসে পড়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপে আট দিন ধরে আটকে থাকার পর এক ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। দেশটির জরুরি উদ্ধারকর্মীরা এরনান গিল নামের ওই ব্যক্তির অবস্থান শনাক্ত করার ১০০ ঘণ্টার বেশি সময় পর চেষ্টা চালিয়ে তাকে উদ্ধার করেছেন। ভবনের ১৪০ টন ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তাকে উদ্ধার করার কথা জানিয়েছেন জরুরি সেবাকর্মীরা।
বৃহস্পতিবার ভেনেজুয়েলায় এই উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া উদ্ধারকর্মীদের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। এর আগে চিলির এক অগ্নিনির্বাপক কর্মী এই উদ্ধার অভিযানের বিষয়ে বলেছিলেন, ‘‘এটি আমার মোকাবিলা করা সবচেয়ে জটিল এবং প্রযুক্তিগতভাবে সবচেয়ে কঠিন উদ্ধার অভিযান। এটা নিয়ে আমার কোনও সন্দেহ নেই।
গত ২৪ জুনের ওই জোড়া ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৩০০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া স্মরণকালের ভয়াবহ এই ভূমিকম্পে আরও হাজার হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
শনিবার ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে গিলের সন্ধান পাওয়ার পর থেকে তাকে উদ্ধারে শত শত উদ্ধারকর্মী দিনরাত এক করে কাজ করছিলেন। তাকে উদ্ধারের এই অভিযানে ভেনেজুয়েলা, চিলি, কোস্টারিকা, এল সালভাদর, মেক্সিকো, পর্তুগাল এবং যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ধারকারী বিভিন্ন দল একসঙ্গে কাজ করেছে।
গিলের কাছে পৌঁছানোর জন্য উদ্ধারকারীদের তৈরি করা সুড়ঙ্গের কিছু অংশ কয়েকবার ধসে পড়েছিল; যা তার পাশাপাশি উদ্ধারকর্মীদের জন্যও কাজটিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া দলগুলোর সদস্যরা অবশেষে বুধবার রাতে গিলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হন।
গিল যেখানে আটকে ছিলেন, সেখানে প্রবেশ করানো একটি ছোট ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিওতে চিলির এক অগ্নিনির্বাপক কর্মীকে গিলের উদ্দেশ্যে বলতে শোনা যায়, তিনি যেন তার মাথা ক্যামেরার দিকে ঘোরান।
এ সময় তার একটি চোখ রক্তবর্ণ (লাল) এবং মুখে একটি মাস্ক পরা ছিল। উদ্ধারকাজে তৈরি হওয়া ধুলাবালি ও ধ্বংসাবশেষ থেকে রক্ষা করার জন্য উদ্ধারকর্মীরা এর আগে একটি ছোট ছিদ্র দিয়ে ওই মাস্ক তার কাছে পাঠিয়েছিলেন।
উদ্ধারকারীরা চারপাশের ধ্বংসস্তূপ সতর্কতার সঙ্গে সরিয়ে নেওয়ার সময় চোখের সুরক্ষার জন্য অগ্নিনির্বাপক কর্মীকে তাকে একটি চশমাও (গগলস) পরে নেওয়ার অনুরোধ করেন।
কোস্টারিকান রেড ক্রসের সদস্য রিকার্দো আরিয়াস স্থানীয় সাংবাদিক জোয়ান কামারগোকে বলেছেন, গিলের শারীরিক অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে। তারা গিলকে পানি দিতে পেরেছেন এবং একটি ইন্ট্রাভেনাস ড্রিপ লাগাতে সক্ষম হয়েছেন।
আরিয়াস বলেন, শপিং সেন্টারটি ধসে পড়ার সময় গিল অলৌকিকভাবে চাপা পড়া থেকে বেঁচে গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, গিল আমাদের বলেছেন, তার নখের ওপরও কোনও চাপ লাগেনি। তিনি ভালো আছেন।
মেক্সিকান রেড ক্রসের মার্কো আন্তোনিও ফ্রাঙ্কো গিলকে ‘‘হাসিখুশি প্রাণবন্ত মানুষ’’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। মেক্সিকান সংবাদমাধ্যম মিলেনিওকে তিনি বলেছেন, এই বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি এমনকি তার পছন্দের সুনির্দিষ্ট ফ্লেভারের স্যালাইন বা এনার্জি ড্রিংক খেতে চেয়েছিলেন। আর আমরা তার সেই আবদার পূরণ করেছি।
‘‘তিনি নিজেই আমাদের উৎসাহ দিচ্ছেন এবং কাজ চালিয়ে যেতে বলছেন। তিনি আমাদের দলের সদস্যদের চিনতে পারছেন এবং বলছেন, আপনারা যে ফিরে এসেছেন এবং আবার আমার পাশে আছেন, তা দেখে ভীষণ ভালো লাগছে।’’
জোড়া ভূমিকম্প আঘাত হানার সময় ভেনেজুয়েলার কাতিয়া লা মারের ‘গ্যালেরিয়াস প্লায়া গ্রান্দে মল’ সংলগ্ন পার্কিং লটের বেসমেন্টে একটি ছোট কংক্রিটের বুথে দায়িত্বরত ছিলেন গিল। ধারণা করা হচ্ছে, ওই ছোট বুথটি তার চারপাশে একটি সুরক্ষাকবচ তৈরি করেছিল; যা তাকে চারপাশ থেকে ধসে পড়া ১৪০ টন ওজনের ধ্বংসস্তূপের হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
সূত্র: বিবিসি