Template: 1
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
বিজয় বাংলা নিউজ
জাতীয় দৈনিক | bijoybangla.news
QR
ই-পেপার / অনলাইন সংস্করণ
Saturday , ২৫ জুলাই ২০২৬ | ১০:৫৯ অপরাহ্ন

রেলবঞ্চিত ১৬জেলাকে জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ

আবুল কালাম আজাদ(বিশেষ প্রতিনিধি) :- ২৫ জুলাই ২০২৬

দেশের যোগাযোগব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করছে বর্তমান সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় রেল সেবাকে দেশের প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে দিতে পর্যায়ক্রমে ৬৪টি জেলাকেই রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’

দেশের সব জেলাকে জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে বর্তমান সরকার। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পর্যায়ক্রমে নতুন রেলপথ নির্মাণ, বিদ্যমান লাইনের সম্প্রসারণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে। যদিও এখনো দেশের সব জেলায় রেল যোগাযোগ পৌঁছায়নি, তবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে রেলবঞ্চিত জেলাগুলোকে জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাস্তবায়নাধীন ও প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো শেষ হলে দেশের ৬৪টি জেলাই ধীরে ধীরে রেল যোগাযোগের আওতায় চলে আসবে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে বলছে, বর্তমানে ৪৮টি জেলা জাতীয় রেল নেটওয়ার্কে আওতায় এসেছে। তবে এখনো দেশের ১৬টি জেলা রেল নেটওয়ার্কের বাইরে। এরমধ্যে শুরুতে বরিশাল বিভাগের পাঁচ জেলাসহ ১০টি জেলা রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার জোর প্রক্রিয়া চলছে। পরবর্তী সময়ে তিন পার্বত্য জেলাসহ অন্য ছয়টি জেলার রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হবে।

যদিও বঞ্চিত জেলাগুলো রেল নেটওয়ার্কে আওতায় আনার কাজ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। রেলওয়ের দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী কাজ চলছে। ফলে কবে নাগাদ রেলপথ নির্মাণে ট্রেন চলবে তা বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। 

“দেশের সামগ্রিক রেল যোগাযোগ, চলমান প্রকল্প, সেবার মানোন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা পর্যালোচনা করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য দেশের ৬৪ জেলাকে রেলসেবার আওতায় আনা।”

জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান বলেন, যে জেলাগুলো রেল নেটওয়ার্কের আওতার বাইরে সেগুলো নিয়ে আমরা কাজ চালাচ্ছি। তবে এখনই এসব জেলায় ট্রেন চলবে, তা বলা যাবে না। এগুলো এখনো স্টাডি লেভেলে (প্রাথমিক পর্যায়ে) আছে। স্টাডিটা হলে আস্তে আস্তে প্রকল্প নেওয়া হবে এবং সেগুলো বাস্তবায়ন করা হবে।’

রেলওয়ের তথ্য বলছে, বর্তমানে প্রতিদিন চার শতাধিক যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন চলাচল করে। এতে বছরে ১০ কোটি যাত্রী ভ্রমণ করেন এবং প্রায় কোটি টন পণ্য পরিবহন করা হয়। এখন সব জেলা রেল নেটওয়ার্কে যুক্ত হলে সক্ষমতা আরও বাড়বে।

সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, সকল জেলা রেল নেটওয়ার্কের আওতায় এলে দেশের যোগাযোগের মানচিত্র বদলে যাবে। পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থায় আঞ্চলিক বৈষম্য ও পরিবহন খরচও কমবে। একই সঙ্গে কৃষি, শিল্প, পর্যটন ও বাণিজ্য খাত নতুন গতি পাবে। যার ফলে জাতীয় অর্থনীতিও ত্বরান্বিত হবে।


অগ্রাধিকার পাচ্ছে যে সব জেলাঃ

রেল যোগাযোগ সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত বরিশাল বিভাগ। বিভাগটির ছয় জেলা তথা বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর এখনো রেল সংযোগ পায়নি। এই তালিকায় তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি রয়েছে। পাশাপাশি রেল সেবা থেকে বঞ্চিত মেহেরপুর, শেরপুর, মাগুরা, সাতক্ষীরা, লক্ষ্মীপুর, নেত্রকোনা ও মানিকগঞ্জ জেলাও।

রেলওয়ে বলছে, সব জেলা রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার প্রথম ধাপে শেরপুর, মেহেরপুর, মাগুরা, সাতক্ষীরা, বরিশাল, বরগুনা, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, পিরোজপুর ও লক্ষ্মীপুর অগ্রাধিকার পাচ্ছে। এসব জেলার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের (ফিজিবিলিটি স্টাডি) প্রক্রিয়া চলমান। তবে এলাকার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজও ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।

রেলওয়ের সূত্র বলছে, যশোরের শার্শার নাভারন থেকে সাতক্ষীরা পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ হওয়ায় এটির কাজ আগে শুরু হবে। ইতোমধ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে নাভারন থেকে সাতক্ষীরা রেলপথ নির্মাণে একটি প্রকল্পও প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রকল্পটি এখন অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন হলেই আনুষ্ঠানিকভাবে সাতক্ষীরা জেলা রেল নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার কাজ শুরু হয়ে যাবে।

রেলওয়ের সূত্রগুলো বলছে, ফরিদপুর মধুখালী থেকে মাগুরা পর্যন্ত একটি রেল প্রকল্প চলছে। এখন মাগুরা থেকে ঝিনাইদহ হয়ে পোড়াদহ ও দর্শনাসহ একটি রেল নেটওয়ার্ক তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যেটির ফিজিবিলিটি স্টাডির কার্যক্রমও গ্রহণ করা হয়েছে। এই পরিকল্পনার আওতায় মাগুরা ও মেহেরপুর জেলা রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আসবে।

এছাড়াও নোয়াখালী চৌমুহনী থেকে লক্ষ্মীপুর রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা হয়েছে, একটি স্টাডি প্রজেক্ট প্রণয়ন গ্রহণ করেছে রেলওয়ে। একই সঙ্গে ময়মনসিংহ রোডের যেকোনো জায়গা থেকে শেরপুর হয়ে নাকুগাঁও স্থলবন্দর পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে। রাজধানীকেন্দ্রিক কমিউটার ট্রেনব্যবস্থা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ঢাকা-মানিকগঞ্জ রেল সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।এদিকে বরিশাল, বরগুনা, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর জেলাকেও রেল যোগাযোগের আওতায় আনার প্রাথমিক কাজ চলমান রয়েছে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, ২০২২ সালের জুলাইয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে বরিশাল, পটুয়াখালী ও পায়রা বন্দর হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত রেল সংযোগ প্রকল্পের ২০৫কিলোমিটারের সম্ভাব্যতা যাচাই ও নকশা প্রণয়ন করা হয়। দীর্ঘ এ রেলপথ নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা। নতুন এই রেললাইন নির্মাণে ৫ হাজার ৬৩৮ একর ভূমি অধিগ্রহণ করতে হবে।

নতুন জেলায় ট্রেন চলবে কবে?

বঞ্চিত জেলাগুলো রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চললেও তা বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ। কারণ শুরুতে সম্ভাব্যতা যাচাই এবং নকশা প্রণয়ন করা হবে। এতে দুই বছর পর্যন্ত লাগতে পারে। এরপর অর্থায়ন প্রাপ্তি ও প্রকল্প গ্রহণে সময় লাগবে। তবে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন শেষে কবে নাগাদ ট্রেন চলবে তা এখনই বলতে পারছেন না রেলওয়ের কর্মকর্তারা।

রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘এগুলো যে এখনই হয়ে যাবে তা না। আগে তো যেনতেন প্রকল্প নেওয়া হতো, এখন সময় লাগবে। আমরা শুরুতে ফিজিবিলিটি স্টাডি করছি। এরপর ফান্ড কালেকশনের বিষয় আছে। ডিপিপি তৈরি দাতা সংস্থাগুলো থেকে টাকা সংগ্রহ করতে হবে। সবশেষে মূল কাজ শুরু হতেই কয়েক বছর লাগবে।’

ফিজিবিলিটি স্টাডি করতেই দেড় থেকে দুই বছর লাগে যাওয়ার বিষয়টি ব্যাখ্যা করে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘ধরুন- স্টাডি প্রোপ্রোজাল তৈরি করতে হয়, তা পাসও করতে হয়। স্টাডি শুরু করতে কনসালটেন্ট নিয়োগ করতে হয়, এটা নিয়োগ করতেই ৬/৭ মাস লেগে যায়। এরপর মিনিমাম এক বছর স্টাডি করতে হয়। অর্থাৎ, দুই বছর তো লেগেই প্রাথমিক কাজ শেষ করতেই। তারপর জমি অধিগ্রহণসহ নানা কাজ থাকে একটি প্রকল্প সম্পন্ন করতে। এগুলো সময়ের ব্যাপার।’

রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সব জেলা রেল নেটওয়ার্কের আনার প্রক্রিয়া চলছে মূলত রেলওয়ের দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানের আওতায়। রেলওয়ের বর্তমান মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন হচ্ছে ২০১৬ সাল থেকে ২০৪৫ সাল পর্যন্ত। অর্থাৎ, এই সময়ের মধ্য সব জেলা রেল নেটওয়ার্কে আনার কথা রয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিদ্যমান মাস্টারপ্ল্যানটি রিভিউ করছে বর্তমান সরকার। রিভিউয়ের মাধ্যমে নতুন মাস্টারপ্ল্যানে রূপ দেওয়া হচ্ছে। সেক্ষেত্রে মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের সময়সীমা ২০৬০ সাল পর্যন্ত বর্ধিতও করা হচ্ছে। ফলে মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী কবে নাগাদ সব জেলা রেল সংযোগ পাবে তা বলা যাচ্ছে না।

রেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে সমন্বিত পরিকল্পনা

অতীতে রেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে নতুন নতুন রেললাইন নির্মিত হলেও পর্যাপ্ত লোকোমোটিভ ও কোচের অভাবে যাত্রীদের প্রত্যাশিত সেবা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে এবার নতুন রেলপথ নির্মাণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় লোকোমোটিভ ও ক্যারেজ সংগ্রহের সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার।

রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, রেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পাশাপাশি অন্যান্য কাজও একই সঙ্গে হবে। যেন রেললাইন নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গেই ট্রেন চালানো যায়, সেভাবেই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। যাতে কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে অতীতের মধ্য অপেক্ষা করতে না হয়।

রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা রেললাইন নির্মাণের পরই দ্রুততম সময়ে ট্রেন চালানো যায়। এজন্য রেললাইন নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য কার্যক্রমও এগিয়ে রাখা হবে।’

রেল সেবাকে দেশের প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে দিতে পর্যায়ক্রমে ৬৪টি জেলাকেই রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’