
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার পাঁড়োরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক গণিত সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে মারধর করে আহত করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বাবা।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ১১ বছর বয়সী ওই শিক্ষার্থীকে গণিত বিষয়ের সহকারী শিক্ষক মো. রবিউল ইসলাম বিভিন্ন অজুহাতে কয়েকদিন ধরে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেন। ভয়ে শিক্ষার্থী বিষয়টি প্রথমে পরিবারের কাউকে জানায়নি। পরে অসুস্থ হয়ে পড়লে এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে কালচে আঘাতের চিহ্ন দেখতে পেয়ে পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ হয়। তখন শিক্ষার্থী জানায়, একটি অঙ্ক না পারলেই শিক্ষক তাকে একই স্থানে বারবার আঘাত করতেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বাবা মো. আব্দুর রউফ বলেন, আমার মেয়েকে এমনভাবে মারা হয়েছে যে তার শরীরে কালচে দাগ পড়ে গেছে। প্রথমে প্রধান শিক্ষকের কাছে বিচার চাইলেও তিনি বিষয়টি গুরুত্ব দেননি। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছি।
তিনি আরও বলেন, গত ২০ জুলাই সোমবার রাতে মেয়ের মা পায়ে তেল মালিশ করতে গিয়ে শরীরের আঘাতের চিহ্ন দেখতে পান। পরে বিদ্যালয়ে গিয়ে বিষয়টি জানালে বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য ও ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হেলাল হোসেন চিকিৎসার খরচ বহনের কথা বলেন। আমি বলেছি, চিকিৎসা যা করার করবেন, তবে আমার দাবি—ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলে, একটি অঙ্ক না পারলে স্যার দুইটি করে আঘাত করতেন। প্রায় প্রতিদিন একই জায়গায় মারতেন। পড়া পারলে কিছু বলতেন না।
শিক্ষার্থীর মা বলেন, মেয়েটি ভয়ে কিছু বলেনি। রাতে ব্যথায় ঘুমাতে না পেরে কাঁদতে থাকলে বিষয়টি জানতে পারি। পরে মারার স্থানে তেল মালিশ করার সময় সে পুরো ঘটনাটি খুলে বলে।
এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের কয়েকজন অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
আইনি দিক থেকে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদে নিষ্ঠুর, অমানবিক ও লাঞ্ছনাকর আচরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ২০১১ সালে হাইকোর্টের এক রায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ওপর সব ধরনের শারীরিক ও মানসিক শাস্তিকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়। এছাড়া শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী কোনো শিশুর ওপর শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন দণ্ডনীয় অপরাধ। অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে।
অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক মো. রবিউল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি তেমন কিছু নয়, এটি ভুল বোঝাবুঝি। আওয়ামী লীগের কিছু লোক বিষয়টি উসকে দিচ্ছে। বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য ও ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হেলাল হোসেন বিষয়টি মীমাংসা করেছেন। এরপরও কেন সাংবাদিক আসবে তা আমি বুঝতে পারছি না।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য ও ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হেলাল হোসেন বলেন, বিষয়টি মীমাংসা করা হয়েছে।
পাঁড়োরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুদর্শন কুমার বলেন, এ বিষয়ে ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা মীমাংসা করেছেন।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইশরাত জাহান ছনি বলেন, অভিযোগটি পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নওগাঁ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ছানাউল হাবিব বলেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।