Template: 1
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
বিজয় বাংলা নিউজ
জাতীয় দৈনিক | bijoybangla.news
QR
ই-পেপার / অনলাইন সংস্করণ
Tuesday , ২৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৫:৫৮ অপরাহ্ন

মাটির ওপর বিটুমিন! ২.২২ কোটি টাকার স্টেডিয়াম সংস্কারে অনিয়ম

রাজশাহী ব্যুরো:- ২৫ আগস্ট ২০২৬

সামান্য বৃষ্টিতেই উঠে যাচ্ছে নতুন কার্পেটিং। কোথাও বেরিয়ে পড়ছে ইটের খোয়া, আবার কোথাও কার্পেটিংয়ের নিচে মিলছে না খোয়া বা পাথরের স্তর। মাটির ওপর বালুর সঙ্গে বিটুমিন মিশিয়ে রাস্তার কাজ করার অভিযোগও উঠেছে। 

একই প্রকল্পে নির্ধারিত ব্র্যান্ডের পরিবর্তে অন্য কোম্পানির রং ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। প্রায় ২ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে রাজশাহী বিভাগীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সংস্কারকাজে এমন নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

নগরের তেরোখাদিয়া এলাকায় অবস্থিত স্টেডিয়ামটির সংস্কারকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে কাজ শেষ হওয়ার আগেই। সরকারি অর্থে নির্মাণ ও সংস্কার করা স্থাপনায় নির্ধারিত মান বজায় রাখা হয়েছে কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যেই তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

কার্পেটিংয়ের নিচে নেই খোয়া-পাথর:-

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকালে স্টেডিয়ামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সামনের প্রবেশপথের সদ্য সংস্কার করা রাস্তার বিভিন্ন স্থানে কার্পেটিং উঠে গেছে। কোথাও কোথাও ওপরের স্তর উঠে ইটের খোয়া বেরিয়ে পড়েছে।

বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সদস্যসচিব ও বিসিবির কাউন্সিলর মোজাদ্দেদ জামানী চাবি দিয়ে রাস্তার কার্পেটিং আঁচড়ালে কয়েকটি স্থানে নিচে খোয়া বা পাথরের স্তর পাওয়া যায়নি। কিছু অংশে মাটির ওপর বালুর সঙ্গে বিটুমিনজাতীয় উপকরণ মিশিয়ে কার্পেটিং করার চিত্র দেখা যায়।

কাজের এমন চিত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে রাস্তা নির্মাণের নির্ধারিত কারিগরি পদ্ধতি ও উপকরণের মান নিয়ে।

আগেই অভিযোগ, ব্যবস্থা হয়নি:-

স্টেডিয়ামের ভেন্যু ব্যবস্থাপক সাইফুল্লাহ খান জেম বলেন, রাস্তার কাজের মান নিয়ে আপত্তির বিষয়টি আগেই জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী মোখলেসুর রহমানকে জানানো হয়েছিল। কাজের ছবিও পাঠানো হয়েছিল। তবে সে সময় কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তিনি জানান।

ক্রীড়া পরিষদ সূত্রে জানা যায়, স্টেডিয়ামের ভেতরে নতুন আরসিসি রাস্তা নির্মাণ এবং সামনের পুরোনো রাস্তা সংস্কারের কাজ ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে পেয়েছে সুবর্ণা এন্টারপ্রাইজ।

রংয়ের কাজেও অনিয়মের অভিযোগ:-

রাস্তার পাশাপাশি স্টেডিয়ামের গ্যালারি ও সীমানাপ্রাচীরের রংয়ের কাজ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, গ্যালারির কিছু অংশে রং করা হয়েছে, আবার কিছু অংশ রং ছাড়াই রয়েছে। কোথাও কোথাও করা রং ইতোমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। সীমানাপ্রাচীরে রং করতে আসা শ্রমিকদের কাছে শিডিউলে উল্লেখ থাকা ব্র্যান্ডের পরিবর্তে অন্য একটি কোম্পানির রং পাওয়া যায়।

বিষয়টি নজরে আসার পর তাঁদের কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

রংমিস্ত্রি ফিরোজ ইসলাম বলেন, শিডিউলে বার্জার ব্র্যান্ডের রং উল্লেখ থাকলেও তাঁদের অন্য কোম্পানির রং সরবরাহ করা হয়েছিল। সরবরাহ করা রংই তাঁরা ব্যবহার করছিলেন।

রং করা ও গ্যালারিতে শৌচাগার নির্মাণের কাজ পেয়েছে দেশবন্ধু এন্টারপ্রাইজ বলে ক্রীড়া পরিষদ সূত্রে জানা গেছে।

তদন্ত দাবি

কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সদস্যসচিব মোজাদ্দেদ জামানী বলেন, “আমি এ অনিয়মের তদন্ত চাই।”তাঁর মতে, সরকারি অর্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রীড়া স্থাপনার সংস্কারকাজে কোনো ধরনের অনিয়ম বা নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের সুযোগ থাকা উচিত নয়।

নিম্নমানের কাজের কথা স্বীকার প্রকৌশলীর:-

অভিযোগের বিষয়ে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী মোখলেসুর রহমান নিম্নমানের কাজের বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, ঠিকাদারদের এখনো কোনো বিল দেওয়া হয়নি। সঠিকভাবে কাজ সম্পন্ন করে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য তাঁদের চাপ দেওয়া হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ত্রুটিপূর্ণ কাজগুলো ঠিক হয়ে যাবে বলে তিনি আশা করছেন।

জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) এ বি এম এহছানুল মামুন বলেন, নিম্নমানের কাজের অংশগুলো ঠিক করে প্রতিবেদন দিতে প্রকৌশলীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরকারি অর্থ, জবাবদিহি কোথায়?:-

প্রায় ২ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে সংস্কারাধীন একটি ক্রীড়া স্থাপনার কাজে শুরুতেই যদি কার্পেটিং উঠে যায়, উপকরণের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং নির্ধারিত ব্র্যান্ডের পরিবর্তে অন্য ব্র্যান্ডের রং ব্যবহারের অভিযোগ আসে, তাহলে প্রকল্পের মান নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

বিশেষ করে কাজ শেষ হওয়ার আগেই ত্রুটি ধরা পড়ায় এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—কাজের নকশা, প্রাক্কলন, স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী উপকরণ ব্যবহার, নির্মাণের প্রতিটি ধাপের তদারকি এবং ঠিকাদারকে বিল দেওয়ার আগে কারিগরি যাচাই কতটা যথাযথভাবে করা হয়েছে।

কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নিম্নমানের কাজ সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হলেও, শুধু ত্রুটি মেরামত করাই যথেষ্ট কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে অভিযোগগুলোর স্বচ্ছ কারিগরি তদন্ত, কাজের মান পরীক্ষা এবং দায় নির্ধারণ এখন জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কারণ, সংস্কারকাজ শেষ হওয়ার পর ত্রুটি ধরা পড়ার চেয়ে কাজ চলাকালেই অনিয়ম শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়াই সরকারি অর্থ ও স্থাপনার স্থায়িত্ব—দুই দিক থেকেই বেশি কার্যকর।

সংগৃহীত ছবি