Template: 1
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
বিজয় বাংলা নিউজ
জাতীয় দৈনিক | bijoybangla.news
QR
ই-পেপার / অনলাইন সংস্করণ
Tuesday , ২৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:০৬ অপরাহ্ন

হাওরের দুর্গম গ্রামে পিরিয়ড নিয়ে ভাঙছে নীরবতা

অনলাইন ডেস্ক ২৫ আগস্ট ২০২৬

কিশোরগঞ্জের নিকলি ইউনিয়নের গোড়াদিঘা গ্রাম। দুর্গম এক গ্রাম। নৌকাই যেখানে যাওয়ার একমাত্র বাহন। কিছুদিন আগেও এখানে এলে মনে হতো যেন এটা আধুনিক সভ্যতার বাইরের কোনো জায়গা। এখানকার বেশিরভাগ নারীরা কোনোদিন স্যানিটারি ন্যাপকিনের নামই শোনেননি, ব্যবহার তো অনেক দূরের কথা।

এখানে গুটিকয়েক ফার্মেসি। ফার্মেসির কর্মীরাও অনেকে জানেন না স্যানিটারি ন্যাপকিন সম্পর্কে। বিষয়টি অবিশ্বাস্য হলেও এটাই সত্যি। পিরিয়ডে অনিরাপদ কাপড়-তুলা ব্যবহারের ফলে গোড়াদিঘার মেয়েরা নানা অসুখে ভোগে। তারা এটাকে অদৃষ্ট মনে করলেও, এটা মানবসৃষ্ট। এটা সচেতনতার অভাব। ইনফেকশন, জরায়ু ক্যান্সার, বন্ধ্যাত্বের মতো রোগে ভুগছে এখানকার অনেক নারী। তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

একরকম জনবিচ্ছিন্ন, সভ্যতার আলো থেকে বঞ্চিত এসব মেয়েদের জন্য শুরু হয় সান কমিউনিকেশনস লিমিটেডের পরিকল্পনায়, এনজেড সলিউশনস- এর সহযোগিতায় এবং স্টেসেফ স্যানিটারি ন্যাপকিন- এর উদ্যোগে ‘নিরাপদ পিরিয়ড, সবার অধিকার’ কর্মসূচি।

নৌকা যেহেতু হাওরে যাতায়াতের একমাত্র বাহন, তাই নৌকাকেই কাজে লাগানো হলো। এলো বিশেষ আনন্দ মেলার ঘোষণা। গোড়াদিঘায় এই আনন্দ মেলা আয়োজনের উদ্দেশ্যে ছিল, গ্রামের সব নারীকে এক জায়গায় একত্রিত করা। আর আনন্দ আয়োজনের মাধ্যমে সবাইকে নিরাপদ পিরিয়ড সম্পর্কে জানানো।

নারীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে মেলা সংলগ্ন নদীর ঘাটে রাখা হয় স্টেসেফ- এর তিনটি বিশেষ নৌকা। যেখানে নারীরা পায় পিরিয়ড নিয়ে প্রয়োজনীয় ডাক্তারি পরামর্শ। এছাড়াও নারীদের মাঝে বিতরণ করা হয় ৩ মাসের ফ্রি স্যানিটারি ন্যাপকিন। 

অল্প কয়েকটা ওষুধের দোকান আছে গোড়াদিঘায়। সেই দোকানগুলোর মালিক ও কর্মীদের পিরিয়ড ও প্যাড নিয়ে বিশেষ ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করে স্টেসেফ, যেন তারাও নিরাপদ পিরিয়ডের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানতে পারে। এছাড়া ফার্মেসিতে ওষুধ কিনতে আসা সবার মাঝে বিতরণ করা হয় বিশেষ সচেতনতামূলক ব্যাগ।

মা-বাবাকে সচেতন করতে সেখানে লেখা হয়- আপনার আদরের মেয়ে কেন ভুগবে ক্যান্সারে? মাসিকের সময় পুরোনো ও অস্বাস্থ্যকর কাপড় তুলা ব্যবহার করলে, হতে পারে জরায়ু ক্যান্সার। মেয়েকে দিন স্যানিটারি ন্যাপকিন। যেটা সাধ্যের মধ্যে, সেটাই নিন। 

=লুডু হাওড়ের পানিবন্দি নারীদের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। তাই তো মেয়েদের জন্য তৈরি করা হয় বিশেষ লুডু। সাপ লুডুতে সাপের মুখে লেখা হয় বন্ধ্যাত্ব, কোনোটায় জরায়ু ক্যান্সার, কোনোটায় ইনফেকশন। এছাড়া বিভিন্ন মেসেজের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর পিরিয়ড সম্পর্কে সচেতন করা হয় সবাইকে।  

গোড়াদিঘা গ্রামে একটিমাত্র স্কুল, সেখানেও মেয়েদের সচেতন করা হয় বিশেষ ক্লাসের মাধ্যমে। চলে উঠান বৈঠক আর পিরিয়ড নিয়ে মন খুলে আলোচনা। স্থায়ী সমাধানের জন্য গোড়াদিঘায় তৈরি করা হয় স্টেসেফ গার্ল, যাদের কাছ থেকে মেয়েরা সহজে ফ্রি স্যানিটারি ন্যাপকিন নিতে পারবে। আর ৩ মাস পর পাবে অর্ধেক দামে। এছাড়াও ফার্মসিতেও আছে স্বল্প মূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনার সুযোগ।  

এই কাজের সাথে সরাসরি জড়িত সান কমিউনিকেশনসের গ্রুপ কপি হেড রিয়াজুল আলম শাওন বলেন, এই আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে একটা গ্রামের নারীরা স্যানিটারি ন্যাপকিনের নামই শোনেনি, চিন্তা করা যায়? রোগশোককে তারা মেনে নিয়েই কষ্ট পাচ্ছিল বছরের পর বছর। গোড়াদিঘার অসহায় এই মেয়েদের কথা জেনে কিছু করার তাড়না অনুভব করি। সান কমিউনিকেশনসের পরিকল্পনায় এবং ওএনজেড সলিউশনসের সহযোগিতায় স্টেসেফকে সঙ্গে নিয়ে আমরা গোড়াদিঘার মেয়েদের জীবনে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছি। শুধু সাময়িক না, আমরা চেষ্টা করেছি স্থায়ী সমাধানের, যেন সকল মেয়ের পিরিয়ড হয় নিরাপদ। 

সান কমিউনিকেশনসের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর তানভীর সিকদার বলেন, যেখানে মেয়েরা এখন বিশ্বজয় করছে, সেখানে গোড়াদিঘার মেয়েরা কী অসহায় অবস্থায় আছে। আমরা খুবই সততার সাথে কাজটা করার চেষ্টা করেছি, যেন ওখানকার নারীরা ভালো থাকে। স্টেসেফকে ধন্যবাদ এমন একটা কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য।’  

স্টেসেফের উদ্যোগের কয়েক মাস পর যে পরিবর্তন দেখা গেল

গোড়াদিঘার পরিবর্তনটি শুধু স্যানিটারি প্যাড ব্যবহারের পরিবর্তন নয়, এটি একটি দুর্গম হাওর জনপদের নারীদের চিন্তা ও অভ্যাস বদলে যাওয়ার গল্প। যে জনপদে কয়েক মাস আগেও পিরিয়ডের সময় কাপড় ব্যবহার করতেন অনেকে, এখন সেখানে নারীরা প্যাড ব্যবহার করছেন। যে পণ্য একসময় সহজে পাওয়া যেত না, সেটি এখন স্থানীয় ফার্মেসিতে পাওয়া যাচ্ছে। যে বিষয় নিয়ে কথা বলতে সংকোচ ছিল, সেটি নিয়ে এখন স্কুলে, উঠানে, নৌকায় এমনকি খেলতে খেলতেও আলোচনা হচ্ছে।

স্কুল শিক্ষার্থী ইসমা বলে, আগে আমরা এসব বিষয়ে জানতাম না। স্টেসেফ মেলার মাধ্যমে আমাদেরকে এসব বিষয়ে সচেতন করেছে। আমরা সবাই এখন এসব বিষয়ে সচেতন।

তৃপ্তি আক্তার বলে, স্টেসেফের মাধ্যমে শুধু আমি একা নই, আমাদের এলাকার প্রত্যেকে স্যানিটারি প্যাড সম্পর্কে জানতে পেরেছে এবং এখানকার সব নারী এখন প্যাড ব্যবহার করে।

কাজেফা আক্তার নামে অপর এক ছাত্রী বলে, আগে আমরা কাপড় ব্যবহার করতাম। এখন স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে আমরা সচেতন। আমরা এখন কাপড় ব্যবহার করি না। পিরিয়ডে প্যাড ব্যবহার করি।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. আবদুল মোতালিব বলেন, এই জনপদের নারীরা আগে সচেতন ছিল না। এখন চিত্র পাল্টে গেছে। এখন সবাই সচেতন। এই পরিবর্তনের পেছনে স্টেসেফের ধারাবাহিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও প্যাড সহজলভ্য করার উদ্যোগ বড় ভূমিকা রেখেছে।

পল্লী চিকিৎসক আনোয়ার হোসেন বলেন, কয়েক মাস আগেও এখানকার নারীরা পিরিয়ড এবং প্যাড ব্যবহার সম্পর্কে তেমন একটা জানতো না। এখন অধিকাংশ নারীই সচেতন এবং তারা স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করেন।

বর্তমানে  প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ মেয়ে স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করছে। বাবা-মায়েরা হয়েছেন সচেতন, তারা নিজেরা অনেক সময় মেয়েদের প্যাড কিনে দিচ্ছেন। বিভিন্ন জটিল রোগের প্রকোপ কমে এসেছে গোড়াদিঘায়। 

যে নতুন আলোয় আলোকিত হয়েছে গোড়াদিঘার মেয়েরা, সেই সচেতনতার আলো ছড়িয়ে পড়ুক সারা বাংলাদেশে। কারণ নিরাপদ পিরিয়ড সবার অধিকার।

সংগৃহীত ছবি