
নারীর অধিকার ও লিঙ্গসমতার আন্দোলনের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা, মার্কিন লেখক, সাংবাদিক ও সমাজকর্মী গ্লোরিয়া স্টেইনেম মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। তাঁর ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, বুধবার তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
শুক্রবার ৪ সেপ্টেম্বর রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।১৯৬০-এর দশকের শেষ দিক থেকে পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে নারীর সমঅধিকার, নাগরিক অধিকার ও প্রজনন অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন গ্লোরিয়া স্টেইনেম। লেখালেখি, সাংবাদিকতা ও সংগঠন গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নারীবাদী আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। তাঁর কর্মকাণ্ড কয়েক প্রজন্মের নারীকে অনুপ্রাণিত করেছে।
নারীবাদী আন্দোলনের অন্যতম মুখ
গ্লোরিয়া স্টেইনেম ছিলেন Ms. Magazine-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও পরামর্শক সম্পাদক। ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত সাময়িকীটি সে সময় নারীদের জন্য প্রচলিত সৌন্দর্য, রান্নাবান্না কিংবা গৃহস্থালিকেন্দ্রিক লেখার বাইরে গিয়ে নারীর অধিকার, যৌন বৈষম্য, সমান বেতন, গর্ভপাতের অধিকার ও পারিবারিক সহিংসতার মতো বিষয় সামনে নিয়ে আসে।
১৯৭১ সালে বেলা আবজুগ, শার্লি চিশলম ও বেটি ফ্রিডানের সঙ্গে মিলে তিনি National Women’s Political Caucus প্রতিষ্ঠা করেন। পরে Women’s Media Center, Voters for Choice, Ms. Foundation for Women এবং Coalition of Labor Union Women-এর মতো সংগঠন প্রতিষ্ঠা বা গঠনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
২০১৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা Presidential Medal of Freedom প্রদান করেন।
সাংবাদিকতা দিয়ে শুরু
১৯৩৪ সালের ২৫ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের টলেডোতে জন্মগ্রহণ করেন গ্লোরিয়া স্টেইনেম। পড়াশোনা শেষে সাংবাদিকতা শুরু করেন তিনি।১৯৬৩ সালে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য তিনি ১১ দিন Playboy Bunny হিসেবে কাজ করেন। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তাঁর আলোচিত প্রতিবেদন ‘A Bunny’s Tale’ প্রকাশিত হয়। এতে প্লেবয় বানিদের কম বেতন ও বৈষম্যমূলক আচরণের বিষয় তুলে ধরা হয়।
১৯৬৮ সালে New York magazine প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন স্টেইনেম। সেখানে প্রকাশিত তাঁর ‘After Black Power, Women’s Liberation’ প্রবন্ধ তাঁকে নারীবাদী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।পরের বছর নিউইয়র্কের একটি গির্জায় গর্ভপাতবিষয়ক আলোচনায় অংশ নেওয়ার পর তিনি নারীবাদী আন্দোলনে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এর আগে ২২ বছর বয়সে লন্ডনে থাকাকালে তিনি অবৈধভাবে গর্ভপাত করিয়েছিলেন বলে নিজেই জানিয়েছিলেন।
‘পছন্দের স্বাধীনতা’কে গুরুত্ব দিতেন
বিয়ে ও পরিবারে নারী-পুরুষের ভূমিকা নিয়েও স্টেইনেম ছিলেন সোচ্চার। তাঁর বহুল উদ্ধৃত বক্তব্য, “পুরুষেরা ঘরের ভেতরে সমান না হওয়া পর্যন্ত নারীরা ঘরের বাইরে সমান হতে পারবেন না।”
তাঁর নিজের কোনো সন্তান ছিল না। ৬৬ বছর বয়সে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যবসায়ী ও পরিবেশকর্মী ডেভিড বেলকে বিয়ে করেন। ডেভিড বেল ছিলেন অভিনেতা ক্রিশ্চিয়ান বেলের বাবা। ২০০৩ সালে মস্তিষ্কের ক্যানসারে তাঁর মৃত্যু হয়।
বিয়ের সময় স্টেইনেম বলেছিলেন, নারীবাদ মানে জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে নিজের জন্য যা সঠিক মনে হয়, তা বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা।
৮০ বছর বয়সের পরও সক্রিয়
বয়স বাড়লেও সামাজিক কর্মকাণ্ড ও লেখালেখি থেকে দূরে সরে যাননি স্টেইনেম। তিনি মেরিলিন মনরোকে নিয়ে ‘Marilyn: Norma Jean’ আত্মমর্যাদা ও ব্যক্তিগত উন্নয়ন নিয়ে ‘Revolution from Within: A Book of Self-Esteem’-সহ বেশ কয়েকটি বই লেখেন।শিশু নির্যাতন ও নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা নিয়েও তিনি তথ্যচিত্র নির্মাণ, প্রযোজনা ও উপস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
নারীর অধিকার নিয়ে তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য ছিল, “আমরা নারীদের কথা না শুনে তাদের ক্ষমতায়িত করতে পারি না।নারীবাদী আন্দোলনে দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময়ের সক্রিয় ভূমিকার মধ্য দিয়ে গ্লোরিয়া স্টেইনেম বিশ্বজুড়ে নারীর অধিকার আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে পরিণত হন।লেখক ক্যারোলিন হেইলব্রুন একসময় তাঁকে “নারীসৌন্দর্যের প্রতিমূর্তি এবং নারী বিপ্লবের সারসত্তা” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।