
আমন মৌসুমে প্রয়োজনীয় সার সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং খুচরা বাজারে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগ তদন্তের দাবিতে রাজশাহীর পুঠিয়ায় ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন কৃষকেরা।
সোমবার (৭সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টার দিকে উপজেলার বানেশ্বর বাজার এলাকায় প্রায় তিন শতাধিক কৃষক মহাসড়কে অবস্থান নিলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে মহাসড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয় এবং ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা।
কৃষকদের অভিযোগ, আমন ধানের জমিতে সার প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সরকারি নির্ধারিত মূল্যে প্রয়োজনীয় সার পাওয়া যাচ্ছে না। স্থানীয় ডিলারদের কাছে সার না থাকার কথা বলা হলেও খুচরা বাজারে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি করা হচ্ছে। তাদের দাবি, একটি চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে।
সোমবার সকালে বানেশ্বর বাজারে সার ডিলারের দোকানের সামনে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও সার না পাওয়ার অভিযোগে কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
পরে তারা বিক্ষোভ মিছিল বের করে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কে অবস্থান নেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা অবরোধ চলায় মহাসড়কের উভয় পাশে বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন আটকা পড়ে।
পুঠিয়ার বিড়ালদহ গ্রামের কৃষক আব্দুর মান্নান বলেন, ‘আমন ধানের গাছে এখন সার দেওয়ার সময়। তিন দিন ধরে বানেশ্বর বাজারে ঘুরছি। ডিলার বলছে সার নেই। অথচ খুচরা দোকানে বেশি টাকা দিলে সার পাওয়া যাচ্ছে। সরকারি দামে সার না পেলে আমরা চাষাবাদ করে ক্ষতিগ্রস্ত হব।’
আরেক কৃষক আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘ভোর ৬টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সকাল ১০টার দিকে বলা হয় সার শেষ। আমরা সার না পেলে জমি রক্ষা করব কীভাবে? সিন্ডিকেট করে কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে।
আন্দোলনরত কৃষকেরা বলেন, ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপিসহ প্রয়োজনীয় সার ন্যায্যমূল্যে পর্যাপ্ত পরিমাণে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে কেউ কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
খবর পেয়ে বেলা ১১টার দিকে পুঠিয়া উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিয়াকত সালমানের সঙ্গে কৃষকদের আলোচনা হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অসাধু ডিলারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং নির্ধারিত মূল্যে দ্রুত সার সরবরাহ নিশ্চিত করার আশ্বাস দেওয়া হলে কৃষকেরা অবরোধ তুলে নেন। ফলে বেলা সাড়ে ১১টার পর মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
তবে কৃষকদের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্থানীয় সার ডিলার এবং রাজশাহী জেলা সার ও কীটনাশক কমিটির সভাপতি ওছমান আলী। তিনি বলেন, ‘কৃষকরা ভিত্তিহীন অভিযোগে মহাসড়ক অবরোধ করে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছেন। এখানে ইউরিয়ার কোনো সংকট নেই।’
ওছমান আলীর দাবি, তার কাছে বর্তমানে ১ হাজার ৪০ বস্তা, অর্থাৎ প্রায় ৫১ মেট্রিক টন ইউরিয়া মজুত রয়েছে। এ ছাড়া ডিএপি প্রায় দেড় টন, এমওপি প্রায় এক টন এবং টিএসপি ১ দশমিক ৬৫ মেট্রিক টন মজুত রয়েছে। তবে মাসের শেষ দিকে নন-ইউরিয়া সারের মজুত কমে গেছে বলে স্বীকার করেন তিনি।
এদিকে কৃষকদের অভিযোগ ও ডিলারের বক্তব্যে পরস্পরবিরোধী তথ্য উঠে এসেছে। একদিকে কৃষকেরা সরকারি দামে প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন, অন্যদিকে ডিলারের দাবি—ইউরিয়ার পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। ফলে প্রকৃতপক্ষে সরবরাহ ব্যবস্থার কোথায় ঘাটতি বা অনিয়ম হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
কৃষকদের দাবি, মাঠপর্যায়ে সরকারি বরাদ্দের সার কতটা এসেছে, কোন ডিলার কত পরিমাণ সার পেয়েছেন, কতটা বিতরণ করেছেন এবং কৃষকদের কাছে কী দামে বিক্রি করা হচ্ছে—এসব তথ্য প্রকাশ্যে এনে তদারকি জোরদার করা হলে সংকটের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।