
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আড়ানী একসময় পরিচিত ছিল মানসম্মত গুড়ের জন্য। আখ ও খেজুরের গুড়ের ঐতিহ্য ঘিরে গড়ে উঠেছে এখানকার বড় বাজার ও ব্যবসা। কিন্তু সেই ঐতিহ্য এখন ভেজালের অভিযোগে প্রশ্নের মুখে। স্থানীয়দের অভিযোগ, আখ বা খেজুরের রসের পরিবর্তে নিম্নমানের চিনি, বিভিন্ন রাসায়নিক, রং ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে গুড়। এসব গুড় ছড়িয়ে পড়ছে স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায়।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও স্থানীয়দের অভিযোগে আড়ানীর কয়েকটি কথিত গুড় তৈরির কারখানায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গুড় তৈরির চিত্র উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে নিম্নমানের চিনি, কাপড়ে ব্যবহৃত টেক্সটাইল রং, হাইড্রোজ, ফিটকিরি, চুন ও আটার কাইসহ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও জ্বালানি হিসেবে পোড়ানো হচ্ছে গার্মেন্টসের ঝুট বা বিভিন্ন বর্জ্য।
বহু বছর ধরেই ভেজাল গুড়ের অভিযোগ:-
আড়ানীতে ভেজাল গুড় তৈরির অভিযোগ নতুন নয়। ২০১৯ সালে র্যাবের অভিযানে আড়ানী বাজার ও আশপাশের এলাকায় কয়েকটি ভেজাল গুড়ের কারখানা শনাক্ত করে বিপুল পরিমাণ গুড় জব্দ করা হয়েছিল। ওই অভিযানে প্রায় এক হাজার মণ গুড় জব্দ এবং চারজন প্রস্তুতকারীকে জরিমানা করা হয়।
পরবর্তী বছরগুলোতেও আড়ানী ও বাঘার বিভিন্ন এলাকায় ভেজাল গুড়ের বিরুদ্ধে অভিযান হয়েছে। ২০২২ সালে আড়ানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ভেজাল গুড় ও তৈরির উপকরণ জব্দের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
সর্বশেষ ২০২৫ সালের নভেম্বরে আড়ানী পৌরসভার শাহাপুর এলাকায় র্যাব-৫ ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের যৌথ অভিযানে পাঁচটি কারখানায় খেজুরের রস ছাড়াই চিনি, রং, চুন ও হাইড্রোজ ব্যবহার করে গুড় তৈরির অভিযোগ পাওয়া যায়। কারখানাগুলোকে জরিমানা করার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
এ ছাড়া আড়ানী দিয়াড়পাড়া এলাকায় অভিযানে ৬০০ কেজি ভেজাল খেজুরের গুড়, নিম্নমানের অপরিশোধিত ভারতীয় চিনি-গুড় ও রাসায়নিক দ্রব্য ধ্বংসের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
‘গো-খাদ্যের’ চিনি দিয়ে গুড় তৈরির অভিযোগ:-
রাজশাহী অঞ্চলে ভেজাল গুড় তৈরিতে নিম্নমানের চিনি ব্যবহারের অভিযোগ আগেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে গো-খাদ্যের নামে আসা নিম্নমানের চিনি ব্যবহার এবং গুড়ের রং আকর্ষণীয় করতে হাইড্রোজ ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্যমতে, খাদ্যে অননুমোদিতভাবে হাইড্রোজ ব্যবহার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এটি খাদ্যের রং পরিবর্তনে ব্যবহৃত হলেও খাদ্যে ব্যবহার অনুচিত এবং শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, সরকারি কৃষি তথ্যসেবার আরেকটি তথ্যে বলা হয়েছে, খাদ্যে ব্যবহৃত টেক্সটাইল রং মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে, বিশেষ করে লিভার ও কিডনির ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষও নন-ফুডগ্রেড রংযুক্ত খাবারকে স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে সতর্ক করেছে।
অভিযান হয়, আবার চালু হয়—অভিযোগ স্থানীয়দের:-
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রশাসন কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে জরিমানা, জব্দ বা কারখানা বন্ধ করলেও কিছুদিন পর আবার একই ধরনের কার্যক্রম শুরু হয়। এতে স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি একই এলাকায় বারবার ভেজাল গুড় তৈরির কারখানা শনাক্ত হয়, তাহলে কেবল জরিমানা করে বিষয়টি শেষ না করে এর নেপথ্যের সরবরাহব্যবস্থা ও ব্যবসায়িক চক্রকে কেন শনাক্ত করা হবে না?
ঐতিহ্য রক্ষায় কঠোর নজরদারির দাবি:-
আড়ানীর গুড়ের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে স্থানীয় সৎ গুড় প্রস্তুতকারক ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, ভেজালকারীদের কারণে শুধু ভোক্তার স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে না, প্রকৃত গুড় উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ীরাও বাজার হারাচ্ছেন।
স্থানীয়দের দাবি, অবৈধ কারখানা শনাক্ত করে শুধু তাৎক্ষণিক জরিমানা নয়, পুনরায় একই অপরাধ হলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। কারখানায় ব্যবহৃত কাঁচামাল, রাসায়নিক ও তৈরি গুড়ের নমুনা নিয়মিত পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি বাজারে গুড়ের সরবরাহ ও পাইকারি বিক্রির ক্ষেত্রেও নজরদারি বাড়াতে হবে।
হারিয়ে যেতে বসেছে আড়ানীর সুনাম:-
আড়ানীর গুড় শুধু একটি খাদ্যপণ্য নয়—এটি এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের ব্যবসা, কৃষি ও লোকঐতিহ্যের অংশ। অথচ ভেজালের অভিযোগ অব্যাহত থাকলে একদিকে যেমন ভোক্তার আস্থা নষ্ট হবে, অন্যদিকে প্রকৃত গুড় উৎপাদনকারীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
তাই আড়ানীর ঐতিহ্যবাহী গুড়কে ভেজালমুক্ত রাখতে নিয়মিত অভিযান, পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষা, উৎপাদনস্থলে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতকরণ এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা জরুরি।
একই সঙ্গে প্রশাসনের উচিত—অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং নির্দোষ ব্যবসায়ীদের হয়রানি থেকে রক্ষা করা।
আড়ানীর গুড়ের পরিচয় যেন ভেজালের কারণে মুছে না যায়—এখন সেটিই স্থানীয়দের বড় প্রত্যাশা।