Template: 1
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
বিজয় বাংলা নিউজ
জাতীয় দৈনিক | bijoybangla.news
QR
ই-পেপার / অনলাইন সংস্করণ
Monday , ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:৩৭ পূর্বাহ্ন

কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রে বকেয়া ৪৬৫১ কোটি টাকা

অনলাইন ডেস্ক ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে জনজীবন অতিষ্ঠ, অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ঘাড়ে চেপেছে বিশাল অঙ্কের আর্থিক দায়। মাতারবাড়ী ও পটুয়াখালীর দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ট্যারিফ ঘাটতি ও বকেয়া মেটাতে এখন বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি পরিশোধ করতে হবে সরকারকে। এর মধ্যে শুধু মাতারবাড়ী কেন্দ্রের বকেয়াই প্রায় ৪ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখা, ক্যাপাসিটি চার্জ মেটানো এবং বিদেশি ঋণের কিস্তির চাপ সামলাতে এই বকেয়া অর্থ দ্রুত ছাড় করার অনুরোধ জানিয়ে অর্থ সচিবকে চিঠি দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু বকেয়া ভর্তুকি পরিশোধ করেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বিদ্যুৎ উৎপাদন, ক্রয়, ক্যাপাসিটি চার্জ, জ্বালানি ব্যয় ও গ্রাহক পর্যায়ের ট্যারিফ-সবকিছুর মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। তা না হলে এক কেন্দ্রের বকেয়া পরিশোধের পর আরেক কেন্দ্রের ট্যারিফ ঘাটতি তৈরি হবে। এতে ভর্তুকির চাপ কমার বদলে প্রতিবছরই বাড়তে পারে। শুধু তাই নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়লেও সেই বিদ্যুৎ কিনতে গিয়ে সরকারের আর্থিক চাপ কমছে না; বরং নতুন করে ট্যারিফ ঘাটতির বোঝা তৈরি হয়েছে দুটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে।


বিদ্যুৎ বিভাগের নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেডের (আরএনপিএল) পটুয়াখালী কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের (১৩২০ মেগাওয়াট) প্রথম ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদনের তারিখ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ এবং দ্বিতীয় ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদন ২৮ মে ২০২৬ থেকে হিসাব করা হয়েছে। অন্যদিকে, কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিপিজিসিবিএল) মাতারবাড়ী আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের (১৩২০ মেগাওয়াট) ইউনিটগুলোর বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়ার পর থেকে ট্যারিফ ঘাটতির হিসাব করা হয়। ফলে কেন্দ্রগুলো উৎপাদনে এলেও বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) অনুযায়ী, প্রকৃত ক্রয়মূল্য এবং গ্রাহক পর্যায়ে বিক্রয়মূল্যের মধ্যে যে বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে, তা সরকারি ভর্তুকির মাধ্যমেই মেটাতে হচ্ছে।


বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) সরকারি-বেসরকারি কেন্দ্র থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে গ্রাহকের কাছে কম দামে বিক্রি করতে হয়। ফলে এই ক্রয়-বিক্রয় মূল্যের ব্যবধান পূরণে সরকারকে বিপুল ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের নথিতে আরএনপিএল ও সিপিজিসিবিএলের ইউনিটভিত্তিক বাণিজ্যিক উৎপাদন, প্রভিশনাল ট্যারিফ এবং ক্যাপাসিটি ও এনার্জি পেমেন্টের হিসাব করে দ্রুত প্রাপ্য বকেয়া পরিশোধের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।


বিদ্যুৎ বিভাগের চিঠিতে পটুয়াখালীর ১৩২০ মেগাওয়াট প্রকল্প নিয়ে আরও একটি বড় আর্থিক দায়ের বিষয় উঠে এসেছে। প্রকল্পটির অর্থায়নে চীনের এক্সিম ব্যাংকের নেতৃত্বাধীন ঋণ সিন্ডিকেট থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে, যার ৫০ শতাংশের জন্য বাংলাদেশ সরকার সার্বভৌম (সভরেন) গ্যারান্টি দিয়েছে। ইতোমধ্যে ঋণের প্রথম কিস্তির আসল ও সুদ পরিশোধ করা হলেও পরবর্তী কিস্তির ১৩৬.১৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধের দায় সামনে চলে এসেছে। অর্থাৎ, কেন্দ্র চালু রাখার খরচের পাশাপাশি বিদেশি ঋণের দায়ও সরকারের ওপর পরোক্ষ চাপ তৈরি করছে। বিল পরিশোধে বিলম্ব হলে কেন্দ্রটির পরিচালনা ও জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।


জানা গেছে, বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপ দীর্ঘদিনের সমস্যা। পিডিবির হিসাবে, চলতি বছর এই খাতে ভর্তুকির চাহিদা ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে পিডিবি জানিয়েছিল, গড়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে খরচ প্রায় ১২ টাকা ৯৭ পয়সা, অথচ বিক্রয়মূল্য প্রায় ৭ টাকা। এই আর্থিক চাপের অন্যতম বড় কারণ অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা ও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ প্রায় ৫২ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা দেওয়ার প্রক্ষেপণ রয়েছে।


এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়টি পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগের সরকারের রেখে যাওয়া বকেয়া পরিশোধের পাশাপাশি নতুন দায়ও সরকারকে বহন করতে হচ্ছে। তবে কোনোভাবেই উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ ক্রয়ের অতিরিক্ত ব্যয় সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপানো হবে না।


বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ জানান, বিশেষ আইন বাতিল হলেও ওই আইনের অধীনে আগে করা চুক্তিগুলো কার্যকর থাকবে এবং সেই চুক্তি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে।


সরকারি হিসাবে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হলেও বাস্তবে জ্বালানি ও গ্যাসের সংকট, কেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ, সঞ্চালন-বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে সব সক্ষমতা সব সময় কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন করুক বা না করুক, চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধের দায় সরকারের কাঁধেই থাকছে।


বিদ্যুৎ বিভাগের নথিতে আরও বলা হয়েছে, আরএনপিএলের বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে কোনো ধরনের বিলম্ব হলে কেন্দ্রটির পরিচালনা ও জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা তৈরি হতে পারে। সে কারণে বকেয়া ভর্তুকির অর্থ পরিশোধ করে বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। 

সূত্র: যুগান্তর


--সংগৃহীত ছবি