
সকালে পঞ্চগড়ের শীতল বাতাসে যাত্রা শুরু। জানালার বাইরে বদলে যেতে থাকবে উত্তরের জনপদ, কৃষিজমি, নদী আর নগর। পথ পেরিয়ে ট্রেন ছুটবে রাজধানী ঢাকা হয়ে চট্টগ্রামের দিকে। শেষ গন্তব্য কক্সবাজার—সামনে তখন শুধু সমুদ্র। পাহাড়ঘেঁষা দেশের উত্তর প্রান্ত থেকে বঙ্গোপসাগরের তীর পর্যন্ত এমন একটানা রেলযাত্রার পরিকল্পনা এখন বাস্তবায়নের পথে।
প্রায় ১ হাজার ৭৭ কিলোমিটারের পঞ্চগড়-কক্সবাজার রেল করিডর গড়ে তুলতে পাঁচটি বড় প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের দুই প্রান্ত সরাসরি রেল নেটওয়ার্কে যুক্ত হবে। রেলওয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই করিডরে ভবিষ্যতে ২০টি আন্তঃনগর ট্রেনসহ প্রায় ২৫০টি ট্রেন পরিচালনার সক্ষমতা তৈরি হতে পারে। ব্যয় হবে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা।
শুধু একটি নতুন ট্রেন রুট নয়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এটি দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে একক নেটওয়ার্কে আনার বড় পদক্ষেপ।
বদলে যাবে রেলের মানচিত্র:-
এখনও দেশের রেল যোগাযোগ মূলত দুই ধরনের গেজ ব্যবস্থায় বিভক্ত। কোথাও মিটারগেজ, কোথাও ব্রডগেজ, আবার কোথাও ডুয়েলগেজ। ফলে এক প্রান্তের রেল নেটওয়ার্ককে অন্য প্রান্তের সঙ্গে নির্বিঘ্নে যুক্ত করা সব সময় সহজ হয় না।
পঞ্চগড়-কক্সবাজার করিডর বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য টঙ্গী-আখাউড়া, লাকসাম-চট্টগ্রাম,চট্টগ্রাম-দোহাজারী, শান্তাহার-বগুড়া এবং বগুড়া-সিরাজগঞ্জ—এই পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে উন্নত করা হচ্ছে। এর মধ্যে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ অংশে নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিদ্যমান কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রুটকে ব্রডগেজ বা ডুয়েলগেজে রূপান্তরের কাজ চলছে।
রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, পঞ্চগড়সহ উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ সরাসরি ট্রেনে কক্সবাজার যেতে পারবেন। সংশ্লিষ্ট পাঁচটি প্রকল্প সাড়ে চার বছরের মধ্যে শেষ করে ট্রেন চালুর লক্ষ্য রয়েছে। এজন্য প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন ও কোচ সংগ্রহের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
‘রেলের দুই অঞ্চল এক হয়ে যাবে:-
প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রেলওয়ের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হবে। বর্তমানে যে দুটি অঞ্চল আলাদা ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়, এই করিডর তাদের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করবে।
রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিংস্টক) ফকির মো. মহিউদ্দিন বলেন, এটি রেলের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প। দুই প্রান্তে সরাসরি ট্রেন পরিচালনার জন্য ইঞ্জিন, কোচসহ প্রয়োজনীয় রোলিংস্টক সংগ্রহ করা হচ্ছে।
রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, পুরো রেলপথ উন্নত হলে ট্রেনের সংখ্যা বাড়বে। একই সঙ্গে যাত্রীসেবা, নিরাপত্তা এবং রেলের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
শুধু যাত্রী নয়, ছুটবে পণ্যও:-
এই করিডরের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার একটি হলো পণ্য পরিবহন। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিপণ্য দ্রুত পৌঁছাতে পারবে দেশের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে। আবার চট্টগ্রাম-
কক্সবাজার অঞ্চল থেকে লবণ, শুঁটকি ও অন্যান্য পণ্য সহজে পৌঁছে যাবে দেশের উত্তরাঞ্চলে।
রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মালবাহী ও কনটেইনার ট্রেনের চলাচল বাড়লে সড়ক পরিবহনের ওপর চাপও কমতে পারে। দীর্ঘ দূরত্বে পণ্য পরিবহনে রেল তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ কমানোর সুযোগ থাকবে।
প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে মালবাহী ও কনটেইনার ট্রেন চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এক যাত্রায় পাহাড়-সমুদ্র:-
পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার সরাসরি রেল যোগাযোগের আরেকটি বড় সম্ভাবনা পর্যটন। দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে পর্যটকরা সরাসরি ট্রেনে কক্সবাজার যেতে পারবেন। একইভাবে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল থেকে পর্যটকরাও সহজে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় যেতে পারবেন।
রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালু হলে এটি দেশের রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তন আনবে। আধুনিক রেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশের প্রান্তিক জনপদ থেকে সমুদ্রতট পর্যন্ত যাত্রীসেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পর্যটনকেন্দ্রগুলো রেল নেটওয়ার্কে যুক্ত হলে অভ্যন্তরীণ পর্যটন বাড়ার পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদের জন্যও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে দেখার সুযোগ তৈরি হবে।
পাঁচ প্রকল্পে ব্যয় প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা:-
রেলওয়ে সূত্র অনুযায়ী, পঞ্চগড়-কক্সবাজার করিডরের গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ প্রকল্পে সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেলপথ উন্নয়নে প্রায় ১০ হাজার কোটি, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণে প্রায় ১২ হাজার কোটি, লাকসাম-চট্টগ্রাম অংশে প্রায় ১৫ হাজার কোটি, আখাউড়া-টঙ্গী অংশে প্রায় ১৪ হাজার কোটি এবং শান্তাহার-বগুড়া অংশে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের তথ্য দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হলে শুধু একটি নতুন রুটই তৈরি হবে না; বরং দেশের রেল অবকাঠামোর একটি বড় অংশ একই মান ও প্রযুক্তির আওতায় আসবে।
মিটারগেজ থেকে ব্রডগেজে যাওয়ার প্রস্তুতি:-
রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, আগামী ১৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যে মিটারগেজ ট্রেন চলাচল অনেকটাই বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বিশ্বব্যাপী মিটারগেজের কোচ, ইঞ্জিন ও অন্যান্য রোলিংস্টক তৈরির প্রবণতা কমে আসায় ভবিষ্যতের জন্য ব্রডগেজভিত্তিক রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তার মতে, আগামী ৫ থেকে ৭ বছরের মধ্যে দেশের বড় অংশের রেলপথ ব্রডগেজ বা ডুয়েলগেজে রূপান্তরের সম্ভাবনা রয়েছে।
আঞ্চলিক বাণিজ্যের দরজাও খুলবে:-
পঞ্চগড়-কক্সবাজার রেল সংযোগ কেবল অভ্যন্তরীণ যোগাযোগেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—ভবিষ্যতে আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণেও ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও এতে তৈরি হবে।
রেলওয়ের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন বলেন, পঞ্চগড় থেকে ঢাকা হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন ও উচ্চগতির ট্রেন পরিচালনার জন্য কাজ চলছে। প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়িত হলে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দ্রুতগতির রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে পঞ্চগড়-কক্সবাজার রেল করিডর কেবল ১ হাজার ৭৭ কিলোমিটারের একটি রেলপথ নয়; এটি দেশের উত্তর-পশ্চিমের কৃষি, পূর্বের শিল্প, দক্ষিণ-পূর্বের বন্দর ও পর্যটন এবং রাজধানীকেন্দ্রিক অর্থনীতিকে একই পরিবহন ব্যবস্থায় যুক্ত করার একটি বড় পরিকল্পনা। বাস্তবায়ন হলে রেলের জানালায় দেখা যাবে দেশের এক ভিন্ন বাংলাদেশ—পাহাড় থেকে সমুদ্র, এক রেলপথে।