
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অস্বচ্ছ চুক্তি, অতিরিক্ত ব্যয় ও অদক্ষতার চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়ছে। ‘কস্ট প্লাস মুনাফা’ ভিত্তিক ব্যবস্থায় ব্যয় কমানোর চাপ না থাকায় ব্যয় যত বাড়ে, মুনাফার সুযোগও তত বাড়ে। গত দেড় দশকে প্রতিযোগিতাবিহীন চুক্তি, দায়মুক্তির আইনি ব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতার কারণে এ খাতে অনিয়ম ও অদক্ষতা বেড়েছে বলে দাবি করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, জ্বালানি সুবিচার নিশ্চিত করতে ব্যয় কমানো, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর পাশাপাশি জনস্বার্থকে বিদ্যুৎ-জ্বালানি নীতির কেন্দ্রে রাখতে হবে। রোববার (১৬ সেপ্টেম্বর) দিনব্যাপী রাজশাহীর হোটেল ওয়ারিশানের সভাকক্ষে ‘ক্যাব প্রস্তাবিত ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর নীতি ও জ্বালানি সুবিচার’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) রাজশাহী জেলা এ সংলাপের আয়োজন করে।
সংলাপে বক্তারা বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকট এখন শুধু সরবরাহের নয়, আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটেও রূপ নিয়েছে। এখন বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদনের জ্বালানি নেই। এতে উৎপাদন না করেও বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। এর আর্থিক দায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও ভোক্তাকেই বহন করতে হয়। সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় ব্যয় কমানো ও ভোক্তার ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমাতে ১২ দফা প্রস্তাব দিয়েছে ক্যাব। এর মধ্যে সরকারি বিদ্যুৎ-জ্বালানি সেবা মুনাফামুক্ত করে বছরে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়, অতিরিক্ত এলএনজি আমদানি বন্ধ, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ দ্রুত গ্রিডে যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, জ্বালানি দক্ষতা বাড়িয়ে বিদ্যুতের চাহিদা ১৫ শতাংশ কমানো এবং তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পর্যায়ক্রমে বন্ধের প্রস্তাব দিয়েছে ক্যাব। সংগঠনটির হিসাবে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বছরে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে।
সংলাপে সভাপতিত্ব করেন ক্যাব রাজশাহী জেলা সভাপতি কাজি গিয়াস। সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা মামুন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ক্যাবের সমন্বয়কারী (গবেষণা) ইঞ্জি. এমএএম গোলাম কিবরিয়া। আরও বক্তব্য রাখেন- ক্যাবের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা প্রকৌশলী একেএম খাদেমুল ইসলাম ফিকসন, ক্যাবের প্রকল্প ব্যবস্থাপক মারুফা কলি। মুক্ত আলোচনায় বক্তব্য দেন- ক্যাব রাজশাহীর উপদেষ্টা লিয়াকত আলী, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রাজশাহী জেলা কমিটির সফিউদ্দিন আহমেদ, ক্যাব রাজশাহীর সহসভাপতি মিজানুর রহমান, রাজশাহী সার্থ সংরক্ষণ কমিটির সদস্য সচিব মাহফুজ হাসনাইন হিকল, ক্যাব নাটোরের সভাপতি সামিমা লাইজু ও সাধারণ সম্পাদক রইস উদ্দিন সরকার, ক্যাব সিরাজগঞ্জ জেলা সভাপতি শওকত আলী এবং ক্যাব নওগাঁ জেলা সভাপতি আজিজুল ইসলাম আজাদ, ক্যাব পবা উপজেলার সভাপতি কাজী নাজমুল ইসলাম।
পাওয়ার পেজেন্টেশন করেন সহ-সভাপতি ক্যাব যুব সংসদ, রাবি এস আর বি ত্বমিন, অর্থনীতি বিভাগ ঢাবি ও ক্যাব সংসদ অরিত্র রোদ্দুর ধর।
বক্তারা জ্বালানি খাতে অপচয় ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বন্ধ, দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, জ্বালানি অপরাধ নির্মূল এবং জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁদের মতে, আমদানি-নির্ভরতা কমিয়ে জনস্বার্থ, জ্বালানি সুবিচার ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত পরিচালনা করা প্রয়োজন।