Template: 1
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
বিজয় বাংলা নিউজ
জাতীয় দৈনিক | bijoybangla.news
QR
ই-পেপার / অনলাইন সংস্করণ
Wednesday , ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:১০ অপরাহ্ন

শীতলতার অধিকার সবার, কিন্তু পৃথিবীকে উষ্ণ করে নয়

নিজস্ব প্রতিনিধি:- ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিশ্ব ওজোন দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরাম, গবেষণা উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান বারসিক ও গ্রিণ কোয়ালিশন এর যৌথ আয়োজনে শীতলতর গ্রহের জন্য বৈশ্বিক পদক্ষেপ: টেকসই শীতলীকরণ ও বরেন্দ্রের ভবিষ্যৎ এবং ওজোনস্তর রক্ষায় যুব অঙ্গীকার শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আজ বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬) বারসিক, রাজশাহী আঞ্চলিক রিসোর্স সেন্টারে এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিশ্ব ওজোন দিবস এর প্রেক্ষাপট, প্রয়োজনীয়তা এবং ওজোনস্তর রক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থান ও করনীয় বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি মো. আতিকুর রহমান।

বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক পলি রানীর সঞ্চালনায় বক্তারা বলেন, ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ, খরা ও জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে শীতলীকরণ এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি ও জলবায়ু অভিযোজনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। তবে বাড়তি তাপ মোকাবিলায় শুধু শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানো নয়, বরং কম শক্তি, কম পানি ও কম জলবায়ু ক্ষতির মাধ্যমে সবার জন্য নিরাপদ শীতলতা নিশ্চিত করতে হবে। ২০২৬ সালের বিশ্ব ওজোন দিবসের প্রতিপাদ্য “শীতলতর গ্রহের জন্য বৈশ্বিক পদক্ষেপ”। এ বছর কিগালি সংশোধনীর দশম বার্ষিকীও পালিত হচ্ছে। ১৯৮৭ সালের মন্ট্রিয়ল প্রটোকল ওজোন স্তর সুরক্ষায় বৈশ্বিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। পরবর্তীতে কিগালি সংশোধনী উচ্চ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন-ক্ষমতাসম্পন্ন এইচএফসি গ্যাসের ব্যবহার ধাপে ধাপে কমানোর মাধ্যমে ওজোন সুরক্ষার সঙ্গে জলবায়ু সুরক্ষার বিষয়কে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করেছে।


বাংলাদেশ ইতোমধ্যে মন্ট্রিয়ল প্রটোকল বাস্তবায়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে এবং ২০২০ সালে কিগালি সংশোধনী অনুমোদন করেছে। ওজোন স্তর ক্ষয়কারী দ্রব্য (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৪ (সংশোধনী) ২০১৪; এবং ২০২১ সালের সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনসহ একটি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো রয়েছে। দেশে ওজোন স্তর ক্ষয়কারী দ্রব্য নিয়ন্ত্রণের আইনগত কাঠামো, এইচএফসি নিয়ন্ত্রণ এবং হাইড্রোক্লোরোফ্লোরোকার্বন কমানোর কর্মসূচি রয়েছে। তবে এখন প্রয়োজন গ্যাস নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জ্বালানি দক্ষতা, পুরোনো যন্ত্রের গ্যাস পুনরুদ্ধার, দক্ষ কারিগরি জনবল এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিকে একটি সমন্বিত টেকসই শীতলীকরণ নীতির আওতায় আনা।

বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি মো. আতিকুর রহমান বলেন, “আমরা এমন একটি সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন একদিকে ওজোন স্তর সুরক্ষায় বিশ্ব উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহ ও অতিরিক্ত তাপের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। ফলে শীতলীকরণের প্রয়োজনও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে আমাদের এমন শীতলীকরণ ব্যবস্থা প্রয়োজন, যা মানুষের প্রয়োজন পূরণ করবে কিন্তু পরিবেশ ও জলবায়ুর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করবে না।”

তিনি আরো বলেন, “বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য বিষয়টি আরও জরুরি। উচ্চ তাপমাত্রা, তাপপ্রবাহ, খরা, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ এবং কৃষিনির্ভর জীবিকার ঝুঁকি এখানে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। তাই বরেন্দ্রের শীতলীকরণ নীতি শুধু ঘরের তাপমাত্রা কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। পুকুর, জলাশয়, বৃক্ষ, ছায়া, সবুজ এলাকা, প্রাকৃতিক বায়ু চলাচল ও তাপ-সহনশীল ভবনকে প্রাকৃতিক শীতলীকরণ অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।”

আদিবাসী যুব পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সাবিত্রী হেমব্রম বলেন, “ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ ও শীতলীকরণের চাহিদার প্রেক্ষাপটে শুধু শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানো কোনো টেকসই সমাধান নয়। ওজোন স্তর সুরক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, জ্বালানি সাশ্রয় এবং সবার জন্য নিরাপদ শীতলতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি টৈকসই শীতলীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।”

এসময় আলোচনায় অংশ নেন, আমার বাংলা তরণ সংঘের সাধারণ সম্পাদক, তাহমিদ জাকি; বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক পলি রানী, প্রচার সম্পাদক হাসিবুল হাসনাত রিজভি, নবজাগরণ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী সদস্য মো. মোস্তাকিম সরদারসহ প্রমূখ।

বিশ্ব ওজোন দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আলোচনা সভায় নিম্নোক্ত দাবি ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়-

১. বাংলাদেশে ওজোন স্তর সুরক্ষা ও শীতলীকরণ ব্যবস্থার রূপান্তরকে জলবায়ু অভিযোজনের সঙ্গে সমন্বিত করে একটি কার্যকর জাতীয় নীতি ও কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

২. উচ্চ উষ্ণায়নক্ষমতাসম্পন্ন শীতলীকরণ গ্যাসের পরিবর্তে কম উষ্ণায়নক্ষম ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প প্রযুক্তি ব্যবহারে দ্রুত রূপান্তর ঘটাতে হবে।

৩. নতুন শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ও হিমায়ন যন্ত্রের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের দক্ষতাকে বাধ্যতামূলক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

৪. পুরোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ও হিমায়ন যন্ত্র থেকে শীতলীকরণ গ্যাস পুনরুদ্ধার, পুনর্ব্যবহার ও নিরাপদ নিষ্পত্তির জন্য জাতীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

৫. শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ও হিমায়ন খাতের কারিগরদের পরিবেশবান্ধব বিকল্প প্রযুক্তি, গ্যাস ব্যবস্থাপনা, গ্যাসের নিঃসরণ রোধ এবং নিরাপদ রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও সনদ প্রদানের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

৬. সরকারি অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও অন্যান্য সরকারি স্থাপনায় পরিবেশবান্ধব ও শক্তি-সাশ্রয়ী শীতলীকরণ প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য সবুজ ক্রয়নীতি চালু করতে হবে।

৭. বরেন্দ্র অঞ্চলে “জলবায়ু-স্মার্ট বরেন্দ্র শীতলীকরণ” নামে একটি পরীক্ষামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে, যেখানে বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কৃষিপণ্য সংরক্ষণাগার ও কমিউনিটি ভবনে প্রাকৃতিক শীতলীকরণ, সবুজায়ন, ছাদ ব্যবস্থাপনা এবং শক্তি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তির সমন্বিত প্রয়োগ করা হবে।

৮. বরেন্দ্রের পুকুর, জলাশয়, খাল, বৃক্ষ ও সবুজ এলাকা সংরক্ষণ করতে হবে। কারণ এগুলো শুধু প্রাণবৈচিত্র্য বা পানির উৎস নয়; এগুলো স্থানীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও জলবায়ু অভিযোজনের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক অবকাঠামো।

৯. তাপপ্রবাহের সময় শিশু, প্রবীণ, শ্রমজীবী মানুষ, কৃষক ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী শীতলীকরণ ব্যবস্থা এবং তাপজনিত দুর্যোগ মোকাবিলা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

১০. টেকসই শীতলীকরণ প্রযুক্তি ও জলবায়ু অভিযোজন বিষয়ে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং যুব নেতৃত্বকে উৎসাহিত করতে হবে। স্থানীয় জ্ঞান ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে বরেন্দ্রের উপযোগী শীতলীকরণ মডেল তৈরি করতে হবে।

শীতলতার অধিকার সবার, কিন্তু পৃথিবীকে উষ্ণ করে নয়