
একটি আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা থেকেই কুমিল্লার শিশু শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীমকে (১৩) নির্জন পাহাড়ি জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সেখানে মোবাইল নিতে বাধা দেওয়ায় ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে বাঁশের শক্ত লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়। পরে মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে ধরে নিয়ে আইফোনটি নিয়ে ঘটনাস্থল ছাড়ে অভিযুক্তরা। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এমন দাবি পুলিশের।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান এসব তথ্য জানান।
সিসিটিভিতে তদন্তের প্রথম সূত্র:-
পুলিশ জানায়, গত ১৮ সেপ্টেম্বর অপ্রতীমকে তুহিনের সঙ্গে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকায় যেতে দেখা যায়। ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে তুহিনের গতিবিধি শনাক্ত করে পুলিশ। অপ্রতীমের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার আগেই তুহিনকে হেফাজতে নেওয়া হয়।
পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তুহিন অপ্রতীমকে ওই নির্জন এলাকায় নেওয়ার কথা স্বীকার করে এবং আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানায়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফাহাদকে হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে ফাহাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কামরুলকেও আটক করা হয়।
পাহাড়ঘেরা বনে কী ঘটেছিল:-
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, ঘটনার দিন বিকেল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে সানন্দা এলাকার পাহাড়ঘেরা নির্জন বনে অপ্রতীমের আইফোন নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে বাধা দিলে তার সঙ্গে অভিযুক্তদের ধস্তাধস্তি শুরু হয়।
পুলিশের ভাষ্য, প্রথমে তুহিন এবং পরে ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের শক্ত লাঠি দিয়ে অপ্রতীমের মাথায় একাধিকবার আঘাত করেন। একপর্যায়ে তার মৃত্যু হলে আইফোন নিয়ে তিনজন ঘটনাস্থল থেকে চলে যান।তবে এসব তথ্য আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে পাওয়া প্রাথমিক তথ্য বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বাসা থেকে আইফোন উদ্ধার:-
হত্যাকাণ্ডের পর অপ্রতীমের সঙ্গে থাকা আইফোনটি উদ্ধারে অভিযান চালায় পুলিশ। তুহিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রথমে তিনটি সম্ভাব্য স্থানে অভিযান চালানো হলেও সেখানে ফোনটির সন্ধান মেলেনি।
পরে তুহিনের দেওয়া তথ্য ও দেখানো জায়গা অনুযায়ী তার বাসায় অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে অপ্রতীমের আইফোনটি উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
আইফোন উদ্ধারের বিষয়টি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচনা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর মাধ্যমে ঘটনার উদ্দেশ্য ও অভিযুক্তদের গতিবিধি সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়ার চেষ্টা চলছে।
আরও কেউ জড়িত কি না, চলছে তদন্ত:-
পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় তুহিন, ফাহাদ ও কামরুলকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সিয়াম নামে আরও একজনকে আটক করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে তার ভূমিকা কী ছিল, তা যাচাই-বাছাই করছে পুলিশ।
এ ছাড়া ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, অভিযুক্তদের বক্তব্যের সঙ্গে ঘটনাস্থলের আলামত ও অন্যান্য তথ্যের মিল রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও তদন্ত করা হচ্ছে।
পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, তদন্ত শেষ করে দ্রুত আদালতে পুলিশ প্রতিবেদন বা অভিযোগপত্র দাখিলের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অপ্রতীমের মৃত্যুতে শোক:-
অপ্রতীম কোটবাড়ি বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। সে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান।
একটি শিশুর মৃত্যু ঘিরে শুরু হওয়া তদন্তে এখন পর্যন্ত পুলিশের হাতে এসেছে সিসিটিভি ফুটেজ, আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য এবং উদ্ধার হওয়া আইফোন। এসব তথ্য ও আলামত যাচাই করেই মামলার পূর্ণাঙ্গ চিত্র নির্ধারণ করা হবে। শেষ পর্যন্ত আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণের ভিত্তিতেই হত্যাকাণ্ডের দায় ও সংশ্লিষ্টতা নির্ধারিত হবে বলে জানান পুলিশ সুপার।