
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) বদলের মতোই যেন ঘন ঘন বদল হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বারবার ভেঙেছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে—বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি জ্ঞাননির্ভর প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা কতটা সম্ভব?
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সাবেক উপাচার্যদের তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২১ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার বছরে তিনজন উপাচার্য দায়িত্ব পালন করেছেন। অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার ২০২১ সালের ২৯ আগস্ট দায়িত্ব নেন এবং ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট পদত্যাগ করেন। এরপর অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নেন; তাঁর মেয়াদ শেষ হয় ২০২৬ সালের ১৬ মার্চ। পরদিন ১৭ মার্চ দায়িত্ব নেন বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম।
অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট পদত্যাগ করেন। ওই সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পদত্যাগের জন্য ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছিল।
উপাচার্য নিজে পদত্যাগপত্রে ‘ব্যক্তিগত কারণ’ উল্লেখ করেছিলেন। একই সময়ে প্রশাসনের আরও বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা পদত্যাগ করেন।
এরপর প্রায় এক মাসের মধ্যে নতুন উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব। কিন্তু তাঁর দায়িত্বকালও দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই শেষ হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি তালিকা অনুযায়ী, তিনি ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ১৬ মার্চ পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন। এর পরদিন নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম।
আশির দশকে ছিল ভিন্ন চিত্র:-
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের দিকে তাকালে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে অন্য রকম একটি চিত্রও পাওয়া যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি তালিকা অনুযায়ী, অধ্যাপক মকবুলার রহমান সরকার ১৯৮১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৮২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত উপাচার্য ছিলেন।
তাঁর পর অধ্যাপক মোসলেম হুদা দায়িত্ব পালন করেন প্রায় সাত মাস। এরপর অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুর রকীব ১৯৮২ সালের ৪ অক্টোবর দায়িত্ব নিয়ে ১৯৮৮ সালের ১৯ মার্চ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর উপাচার্য ছিলেন।
তাঁর পর অধ্যাপক আমানুল্লাহ আহমদ ১৯৮৮ সালের ২০ মার্চ থেকে ১৯৯২ সালের ২২ জুলাই পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তবে,অধ্যাপক আবদুর রকীব ও অধ্যাপক আমানুল্লাহ আহমদের দায়িত্বকাল ছিল তুলনামূলক দীর্ঘ।
অতীত ইতিহাসই :-
অতীতে অনেক খ্যাতিমান শিক্ষক কেন উপাচার্যের পদকে আজকের মতো ক্ষমতা ও প্রভাবের কেন্দ্র হিসেবে দেখতেন না?
প্রবীণ শিক্ষকদের স্মৃতিতে, সে সময় দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে এমন অনেক শিক্ষক ছিলেন যাঁদের কাছে শিক্ষকতা, গবেষণা, জ্ঞানচর্চা ও ব্যক্তিগত মর্যাদা ছিল বড় বিষয়। তাঁদের রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতে পারে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পরিচয় কতটা প্রভাব ফেলত—এ নিয়ে বর্তমান সময়ের তুলনায় ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা বলেন প্রবীণ শিক্ষক ও সাবেক শিক্ষার্থীদের অনেকেই।
সামরিক শাসনের সময়ও দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন শিক্ষাবিদ ছিলেন, যাঁরা প্রশাসনিক চাপ বা নীতিগত দ্বন্দ্বে পদ ছাড়ার পথ বেছে নিয়েছিলেন—এমন ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে।
উপাচার্য প্রশাসক, নাকি একাডেমিক নেতা:-
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব অন্য যেকোনো প্রশাসনিক পদ থেকে আলাদা। তাঁকে একদিকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হয়, অন্যদিকে গবেষণা, শিক্ষক নিয়োগ, প্রশাসনিক সংস্কার, আবাসিক হল, অবকাঠামো এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনাসহ বিপুল দায়িত্ব সামলাতে হয়।
একজন উপাচার্য দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কয়েক বছর সময় প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু নেতৃত্ব দ্রুত বদলে গেলে আগের প্রশাসনের নেওয়া পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। নতুন প্রশাসন এসে অগ্রাধিকার পরিবর্তন করলে অনেক উদ্যোগও থেমে যেতে পারে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এ প্রশ্নটি আরও সামনে এনেছে। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়টি তিনজন উপাচার্য পেয়েছে। তাঁদের দায়িত্বকালও সমান ছিল না—কেউ প্রায় তিন বছর, কেউ দেড় বছরের কিছু বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেছেন।
পদ নয়, মর্যদা বড় :-
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ প্রজন্মের আলোচনায় প্রায়ই ফিরে আসে অতীতের সেই শিক্ষকদের কথা, যাঁরা উপাচার্যের পদকে জীবনের সর্বোচ্চ অর্জন মনে করতেন না। তাঁরা ছিলেন নিজ নিজ বিষয়ে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষক ও গবেষক। উপাচার্যের পদ তাঁদের একাডেমিক পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে ওঠেনি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসেও এমন বহু শিক্ষক ছিলেন, যাঁরা শিক্ষকতা ও গবেষণায় নিজেদের আলাদা অবস্থান তৈরি করেছিলেন। তাঁদের রাজনৈতিক মতাদর্শ ছিল—এটি অস্বাভাবিক নয়।
কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং একাডেমিক স্বাধীনতাকে কতটা অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, সেটিই ছিল মূল প্রশ্ন।আজকের বাস্তবতায় সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এসেছে।
উপাচার্য নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয়, প্রশাসনিক দক্ষতা কিংবা সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক—কোন বিষয় কতটা প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে নানা সময়ে বিতর্ক হয়েছে। এসব বিতর্কের অনেকটাই রাজনৈতিক ও মতামতনির্ভর।
প্রয়োজন স্থায়ী ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব:-
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে ঘন ঘন পরিবর্তন শুধু ব্যক্তির পরিবর্তন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। তাই উপাচার্য নিয়োগে একাডেমিক যোগ্যতা, গবেষণা-অবদান, প্রশাসনিক সক্ষমতা, নৈতিক অবস্থান ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার বিষয়গুলো কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে—সেটি নিয়ে আরও স্পষ্ট নীতিমালা ও জনসমক্ষে ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে।
একই সঙ্গে উপাচার্যের মেয়াদ ও দায়িত্বের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো উপাচার্য যদি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন, তাঁর বিরুদ্ধে আইন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। আবার কোনো উপাচার্যকে শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতিও বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—সেটিও আলোচনার বিষয়।
কারণ উপাচার্য কোনো থানার ওসি নন যে বদলি হলেই আরেকজন এসে একই দায়িত্ব বুঝে নেবেন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা একাডেমিক পরিকল্পনা, গবেষণা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি।
তাই উপাচার্যের পদকে যদি আবারও জ্ঞানচর্চা, নৈতিকতা, স্বাধীন চিন্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়, তাহলে প্রয়োজন শুধু নতুন মুখ নয়—প্রয়োজন স্থায়ী, যোগ্য, জবাবদিহিমূলক ও একাডেমিকভাবে স্বাধীন নেতৃত্বের কাঠামো।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ইতিহাসের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট—উপাচার্য পরিবর্তনের ইতিহাস, শুধু নাম ও তারিখের তালিকা নয়! এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক ও একাডেমিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের ইতিহাসও। সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের নেতৃত্বব্যবস্থা কতটা প্রাতিষ্ঠানিক করা যায়, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।