
রাজশাহীর পবা উপজেলার সোনালী আলো বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র উচ্ছেদ, পরবর্তী সময়ে পুলিশি তদন্ত, সাক্ষীদের হয়রানি, হত্যার হুমকি এবং পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা তুলে ধরে এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আক্তার।
সোমবার(৬ অক্টোবর) পবা নওহাটাস্থ নিজ বাসভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, তিনি কোনো ব্যক্তি, পুলিশ কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা বা অন্য কাউকে পূর্বনির্ধারিতভাবে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করছেন না। তাঁর অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানাচ্ছেন তিনি।
নাজনীন আক্তারের দাবি, গত ২৪ জুন ২০২৬ তাঁর পরিচালিত সোনালী আলো মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র মাত্র ২৪ ঘণ্টার নোটিশে উচ্ছেদ করা হয়। এ সময় তাঁকে লাঞ্ছিত ও অপহরণের চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন তিনি পবা থানায় গিয়ে বিষয়টি জানালেও তাৎক্ষণিক আইনি সহায়তা পাননি। পরদিন তাঁর স্বামীর সংবাদ সম্মেলনের পর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহায়তায় পবা ও এয়ারপোর্ট থানার পুলিশ সেখানে গিয়ে ২৩ জন রোগী ও কর্মীকে উদ্ধার করে। ঘটনার প্রথম দিন থানায় যাওয়ার পরও কেন প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দেওয়া হয়নি, তা তদন্তের দাবি জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে নাজনীন বলেন, পরবর্তীতে তিনি বিষয়টি জানিয়ে সরকারের কাছে স্মারকলিপি দেন। এরপর অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার, শাহমখদুম জোনের দপ্তরে শুনানি হয় এবং সাক্ষীদের তালিকা দেওয়া হয়।
তাঁর অভিযোগ, সাক্ষীদের শুনানিতে ডাকার পর নির্ধারিত সময়ের আগে তাঁদের ফোন করে আসতে নিষেধ করা হয়েছিল। এতে সাক্ষীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করেন বলেও দাবি করেন তিনি।
পবা থানায় প্রমাণপত্র দাখিলের বিষয়েও নানা অভিযোগ করেন নাজনীন। তাঁর দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পর প্রমাণপত্র জমা দিতে গেলেও তাঁকে গ্রহণপত্র দেওয়া হয়নি। পরে বিভিন্নভাবে ঘোরানো হয়েছে। একপর্যায়ে নওহাটা কলেজ মোড়ে তাঁর স্বামীর কার্যালয়ে প্রমাণপত্র নেওয়া হলেও সেখানেও গ্রহণপত্র দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নাজনীন আক্তার তাঁর স্বামী পরিচালিত সূর্যোদয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের ১৯ অক্টোবর ২০২৪ সালের একটি ঘটনার কথাও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, ওই ঘটনায় তাঁর স্বামী ও প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশিত হয়।
তাঁর অভিযোগ, ওই ঘটনার পর পুলিশ, প্রশাসনের কর্মকর্তা, আইনজীবী ও কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে তাঁদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ বা সমন্বয় ছিল কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানান তিনি।
তবে সংবাদ সম্মেলনে নাজনীন বারবার উল্লেখ করেন, তিনি কারও বিরুদ্ধে অপরাধের চূড়ান্ত অভিযোগ করছেন না; বরং তাঁর উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই চান।
সংবাদ সম্মেলনে নাজনীন বলেন, বিভিন্ন সময়ে তাঁর স্বামী ও তাঁর প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের পর ২০২৫ সালের ৩০ জুন সূর্যোদয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের লাইসেন্স বাতিল করা হয় বলে তাঁরা মনে করেন। বিষয়টি নিয়ে তাঁর স্বামী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আপিল করেন এবং পরবর্তীতে উচ্চ আদালতে আইনি পদক্ষেপ নেন বলে জানান তিনি।
লাইসেন্স বাতিলের পুরো প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট অভিযোগ এবং পরবর্তী আইনি কার্যক্রম নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনার দাবি জানান নাজনীন।
তিনি দাবি করেন, তাঁর স্বামী নিজেও একসময় মাদকাসক্ত ছিলেন এবং পরবর্তীতে পুনরুদ্ধার হয়ে দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানে কাজ করছেন। তাঁদের দাবি অনুযায়ী, গত প্রায় ১৪ বছরে তাঁদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পাঁচ হাজারের বেশি ব্যক্তি চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে নাজনীন আক্তার কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, আইনজীবী, পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
তিনি দাবি করেন, তাঁর স্বামীকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। বিএনপি নেতা হিসেবে পরিচয় দেওয়া শাহিনের বিরুদ্ধে মাদকবিরোধী কার্যক্রমে বাধা এবং রোগীদের আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকির অভিযোগও করেন তিনি। পাশাপাশি তাঁর প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স না দেওয়ার ঘটনায় নওহাটা পৌরসভা ও উপজেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা তদন্তের দাবি জানান।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে তাঁদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ বা পারস্পরিক সম্পৃক্ততা ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে নিজের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন নাজনীন। তাঁর দাবি, গত ২৭ সেপ্টেম্বর তাঁর শ্বশুরকে পবা উপজেলার বাগসারা এলাকায় স্থানীয় লোকজন আহত ও অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করেন। কীভাবে তিনি আহত হয়েছেন, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্টভাবে কিছু বলতে পারছেন না বলে জানান নাজনীন।
এর আগে তাঁর শশুর ও শাশুড়িকে অজ্ঞাত অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রক্তাক্ত অবস্থায় পাওয়ার ঘটনাটিও তদন্তের দাবি করেন তিনি।
এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় তিনি, তাঁর স্বামী ও পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান।
নাজনীন আক্তার তাঁর লিখিত বক্তব্যে ৩০ দফা দাবি তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে—সোনালী আলো উচ্ছেদের ঘটনা, ২০২৪ সালের সূর্যোদয় কেন্দ্রের ঘটনা, লাইসেন্স বাতিল, পুলিশি তদন্তের ভূমিকা, সাক্ষীদের হয়রানির অভিযোগ, হত্যার হুমকি, ট্রেড লাইসেন্স না পাওয়া এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত।
তিনি পবা থানায় তাঁর দেওয়া স্মারকলিপির তদন্ত বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে সরিয়ে অন্য কোনো নিরপেক্ষ কর্মকর্তা বা সংস্থার মাধ্যমে করার দাবি জানান। তদন্ত চলাকালে অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তা বা ব্যক্তি যাতে তদন্তকে প্রভাবিত করতে না পারেন, সে বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
একই সঙ্গে নিজের, স্বামীর ও পরিবারের সদস্যদের সরকারি সহায়তায় নিরাপত্তা এবং সাক্ষীদের স্বাধীনভাবে বক্তব্য দেওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি করেন নাজনীন।প্রয়োজনে বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে তাঁদের বৈধভাবে দেশের বাইরে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার অনুরোধও জানান তিনি।
নাজনীন বলেন, তাঁরা প্রায় ১৪ বছর ধরে মাদকবিরোধী সামাজিক কার্যক্রম, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত। ভবিষ্যতে তাঁদের বা পরিবারের কারও সঙ্গে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে আজকের সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য ও লিখিত অভিযোগগুলো যথাযথ তদন্তের নথি হিসেবে বিবেচনার জন্য রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
তাঁর ভাষায়, ‘আমরা কাউকে অপরাধী ঘোষণা করতে চাই না। আমরা কারও বিরুদ্ধে প্রতিশোধ চাই না। আমরা শুধু চাই—তদন্ত হোক, সত্য প্রকাশ হোক এবং আমরা নিরাপদে বেঁচে থাকতে পারি।’