Template: 1
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
বিজয় বাংলা নিউজ
জাতীয় দৈনিক | bijoybangla.news
QR
ই-পেপার / অনলাইন সংস্করণ
Friday , ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৬:৩৬ অপরাহ্ন

ডাকপিয়নের ঘণ্টার শব্দ, চিঠি আসার অপেক্ষা ফুরিয়েছে

অনলাইন ডেস্ক ০৯ অক্টোবর ২০২৬

‘চিঠি এসেছে চিঠি’- এক সময় ডাকপিয়নের এমন ডাকাডাকি শুনলেই বাড়ির উঠানে ছুটে আসতেন অনেকেই। কারো অপেক্ষা ছেলের চিঠির, কারো প্রবাসে থাকা স্বামীর, আবার কারো প্রিয় মানুষের। ডাকপিয়নের হাতে থাকা খামটি কেবল কয়েকটি কাগজ নয়, এর ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকত ভালোবাসা, অভিমান, আনন্দ আর দীর্ঘ অপেক্ষার অনুভুতি। সেই চিঠি যত্ন করে রেখে দেওয়া হতো পুরোনো ট্রাঙ্কে, কাঠের আলমারিতে কিংবা বইয়ের পাতার ভাঁজে।


তবে সময় বদলেছে। বিজ্ঞানের অগ্রগতি আর প্রযুক্তির বিস্তারে মানুষের যোগাযোগের ধরনেও এসেছে পরিবর্তন। এখন দূরে থাকা প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলতে ডাকপিয়নের অপেক্ষায় থাকতে হয় না। ফোনের একটি কল, ছোট্ট খুদে বার্তা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাঠানো কয়েকটি শব্দেই মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে যায় মনের কথা। ফলে ব্যক্তিগত যোগাযোগে চিঠির ব্যবহারও কমেছে।


একসময় দেশের মানুষের জীবনে চিঠির গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। গ্রাম থেকে শহরে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থী, জীবিকার তাগিদে বিদেশে পাড়ি জমানো মানুষ কিংবা চাকরির কারণে পরিবার থেকে দূরে থাকা ব্যক্তিদের কাছে চিঠিই ছিল যোগাযোগের অন্যতম ভরসা। প্রিয়জনের কাছ থেকে একটি চিঠি পাওয়ার জন্য অনেকে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতেন।


বিশেষ করে প্রবাসীদের পরিবারের কাছে চিঠি ছিল দূরদেশের খবর জানার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বিদেশে থাকা বাবা কিংবা স্বামীর পাঠানো চিঠিতে পরিবারের খোঁজখবর, সন্তানের পড়াশোনার কথা, সংসারের হিসাব কিংবা দেশে ফেরার আশ্বাস লেখা থাকত। সেই চিঠি পড়ে পরিবারের সদস্যরা দূরে থাকা মানুষটির উপস্থিতি যেন কিছুটা হলেও অনুভব করতেন।


একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কলেজে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীরা বাড়িতে চিঠি লিখে জানাতেন পড়াশোনার খবর ও খরচের চাহিদা। কখনো সেই চিঠির উত্তরের জন্য অপেক্ষা করতে হতো কয়েক দিন, কখনো আরও বেশি সময়। অপেক্ষার এই সময়টুকুও ছিল সম্পর্কের একটি অংশ।


এসব চিঠির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ব্যক্তিগত আবেগ। হাতের লেখা দেখেই অনেক সময় বোঝা যেত প্রিয় মানুষটি কতটা যত্ন নিয়ে কথাগুলো লিখেছেন। একটি চিঠি বহু বছর পর হাতে নিলেও স্মৃতি, সময় ও অনুভূতি যেন নতুন করে জীবন্ত হয়ে উঠত।


তবে আধুনিক যুগে মোবাইল ও ইন্টারনেটের বিস্তার মানুষের যোগাযোগব্যবস্থাকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। এখন দেশের এক প্রান্তে বসে অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে মুহূর্তেই কথা বলা সম্ভব। বিদেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভিডিও কলেও কথা বলা যায়। শুধু তাই নয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি, ভিডিও কিংবা ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে সহজেই ভাগ করে নেওয়া যায় নিজেদের অনুভুতি।


কর্মসংস্থানের জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চল কিংবা বিদেশে নানা শ্রেণীর মানুষ বসবাস করেন, সেখানে এই প্রযুক্তি পারিবারিক যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রবাসী শ্রমিকেরা কর্মব্যস্ততার মধ্যেও পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে পারছেন। দূরে থাকা মা-বাবা সন্তানের মুখ দেখতে পাচ্ছেন, সন্তানেরাও পাচ্ছে আপনজনের সান্নিধ্য। তবে যোগাযোগ সহজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিঠি লেখার অভ্যাসও অনেকের জীবন থেকে সরে গেছে। অনুভূতি প্রকাশের দীর্ঘ চিঠির জায়গা দখল করেছে সংক্ষিপ্ত বার্তা, ইমোজি কিংবা কয়েক সেকেন্ডের ভয়েস মেসেজ।


মোবাইলে পাঠানো একটি বার্তা মুহূর্তেই মুছে যেতে পারে, হারিয়ে যেতে পারে অসংখ্য কথোপকথনের ভিড়ে। কিন্তু হাতে লেখা একটি চিঠি অনেক সময় বছরের পর বছর স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকে। সেখানে থাকে লেখকের নিজস্ব হাতের ছাপ, শব্দ বেছে নেওয়ার যত্ন এবং অনুভূতি প্রকাশের আলাদা ধরন। কাউকে চিঠি লিখতে বসলে মানুষ সাধারণত সময় নিয়ে নিজের কথা সাজায়। কোন অনুভূতিটি কীভাবে প্রকাশ করবে, কোন স্মৃতিটি তুলে ধরবে-এসব ভাবতে গিয়ে চিঠিটি হয়ে ওঠে একান্ত ব্যক্তিগত।


অন্যদিকে, ব্যক্তিগত চিঠির ব্যবহার কমে গেলেও ডাকসেবার প্রয়োজন পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। পার্সেল, পণ্য পরিবহন, দাপ্তরিক চিঠিপত্র এবং বিভিন্ন ধরনের ডাকসেবা এখনো মানুষের কাজে লাগছে। অনলাইন কেনাকাটার বিস্তারে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রেও ডাক ও কুরিয়ার সেবার গুরুত্ব রয়েছে। তাই ডিজিটাল যুগে মানুষের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডাক বিভাগকে সেবার মান, দ্রুততা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হচ্ছে।


সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা বদলাবে, বদলাবে যোগাযোগের মাধ্যমও। একসময় চিঠি ছিল দূরের মানুষের কাছে পৌঁছানোর প্রধান পথ; আজ সেই জায়গায় এসেছে মোবাইল, ইন্টারনেট ও ডিজিটাল যোগাযোগ। ভবিষ্যতে আরও নতুন প্রযুক্তি মানুষের সম্পর্কের ধরন বদলে দিতে পারে।

--সংগৃহীত ছবি