
ধান, আখ আর আমকেন্দ্রিক প্রথাগত কৃষির চেনা ছক ভেঙে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলায় দানা বাঁধছে এক নীরব বিপ্লব। ক্রমবর্ধমান উৎপাদন খরচ, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং বাজারে পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার দীর্ঘস্থায়ী সংকটে যখন দিশেহারা কৃষক, ঠিক তখনই উচ্চমূল্যের বিকল্প ফসল চাষ করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন এ অঞ্চলের তরুণ উদ্যোক্তারা। কম খরচে অধিক লাভ এবং টেকসই জমির ব্যবহারের ফলে চারঘাটের গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।
পদ্মা অববাহিকার বরেন্দ্র জনপদ চারঘাটের অর্থনীতি দীর্ঘকাল ধরে ধান, আখ এবং মৌসুমী আম চাষের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেচ সংকট, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি এবং সার-বীজের চড়া দামের কারণে উৎপাদিত ফসলের কাঙ্ক্ষিত লাভ ঘরে তুলতে হিমশিম খাচ্ছিলেন কৃষকরা। এক ফসলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং বাজারে পণ্যের দামের অস্বাভাবিক ওঠানামায় অনেক চাষি লোকসানের মুখে পড়েন। এই সংকট উত্তরণে জমির উর্বরতা রক্ষা, মাটির গুণাগুণ বজায় রাখা এবং আধুনিক বাজারের চাহিদা মাথায় রেখে কৃষকরা ঝুঁকছেন বৈচিত্র্যময় ও লাভজনক বিকল্প ফসলের দিকে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথাগত ফসলের বৃত্ত ভেঙে চারঘাটে বর্তমানে প্রায় ২৫০ হেক্টর জমিতে নতুন ধারার ও উচ্চমূল্যের ফসলের চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য
উচ্চমূল্যের ফল ও উদ্যান ফসল: মাল্টা, স্ট্রবেরি, আঙুর, কমলা, বারোমাসি ও মিষ্টি আমড়া।আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি: পলিনেট হাউসে উৎপাদিত উচ্চমানের সবজি ও ফলমূলের চারা।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই বহুমুখী উদ্যোগ একদিকে যেমন স্থানীয় পুষ্টির চাহিদা মেটাচ্ছে, অন্যদিকে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের নতুন পথ উন্মুক্ত করছে।
চাকরির পিছু না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ার যে জোয়ার সারা দেশে শুরু হয়েছে, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন চারঘাটের তরুণরা।
উপজেলার ফতেহপুর গ্রামের উচ্চশিক্ষিত যুবক হানিফ মন্ডল ২০১৯ সালে সনাতনী পেশার মোহ ত্যাগ করে প্রায় ১৬ বিঘা জমিতে গড়ে তোলেন সমন্বিত ফলের বাগান ও নার্সারি। বর্তমানে তার খামারে মাল্টার পাশাপাশি কমলা, আঙুর, আতা, আনার ও আম উৎপাদিত হচ্ছে। কেবল ফল বিক্রিই নয়, উন্নত জাতের মানসম্মত চারা বিক্রি করে তিনি এখন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী। তার এই অভাবনীয় সাফল্য এলাকার বেকার তরুণদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
হলিদাগাছি গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা শিবলী সাদেক ২০২২ সালে বাণিজ্যিকভাবে শুরু করেন আনার চাষ। মাত্র দুই বিঘা জমিতে ৩০০টি আনার গাছ রোপণ করে আজ তিনি সফল। এর মধ্যে প্রায় ২০০টি গাছ থেকে নিয়মিত ফল আসছে। সঠিক পরিচর্যা ও অনুকূল আবহাওয়া থাকায় উৎপাদিত আনার বিক্রি করে তিনি ইতিমধ্যে প্রায় ১০ লাখ টাকা আয় করেছেন।
অন্যদিকে,খাদ্য ও ফল ফসলের পাশাপাশি চারঘাটের কৃষিতে অর্থকরী ফসল হিসেবে শক্ত অবস্থান করে নিয়েছে তুলা। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের চারঘাট উপজেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ১৫০ হেক্টর জমিতে তুলার আবাদ হয়েছে, যা গত কয়েক বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে কৃষকদের নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ, মানসম্মত বীজ ও প্রণোদনা দেওয়ায় এ ফসলের প্রতি নতুন করে আগ্রহ বাড়ছে।
কৃষিবিদদের মতে, বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটি ও জলবায়ু সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে যেকোনো প্রতিকূলতা জয় করা সম্ভব।
চারঘাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আল মামুন হাসান এ বিষয়ে জানান,কৃষিকে লাভজনক ও টেকসই করতে সঠিক সময়ে সঠিক ফসল নির্বাচন, উৎপাদন ব্যয় সংকোচন এবং বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া অপরিহার্য। চারঘাটের মাটি মাল্টা, আনার কিংবা তুলার মতো লাভজনক ফসল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। আমরা কৃষকদের মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শ ও সহায়তা দিচ্ছি। এই বিকল্প ফসলের ধারা অব্যাহত রাখা গেলে জেলার সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।"