
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা আরও গতিশীল ও জনবান্ধব করতে চালু হয়েছে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার’ (ওসেক)।
হাসপাতালের জরুরি ও ক্যাজুয়ালটি বিভাগের মাধ্যমে পরীক্ষামূলক বা পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে এই আধুনিক সেবা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর ফলে জরুরি বিভাগে আসা রোগীরা এখন একই স্থানে পাবেন একাধিক বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ ও প্রাথমিক চিকিৎসা।
রামিক হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, সার্জারি, অর্থোপেডিকস, মেডিসিন, এনেস্থেসিয়া এবং গাইনি বিভাগের দক্ষ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত এই ওয়ান স্টপ সার্ভিস খোলা থাকছে।
উদ্যোগটির বিষয়ে হাসপাতালের মুখপাত্র ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. শেখ শামীম আহমেদ বলেন, “হাসপাতালে আসা অনেক রোগী ছোটখাটো সমস্যা নিয়ে আসেন, যাদের মূলত ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হয় না। ওসেক চালুর ফলে রোগীরা এখানেই প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারবেন। এর ফলে হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে রোগীর অতিরিক্ত চাপ কমবে এবং ভর্তি থাকা রোগীদের দিকে ইন্টার্ন ও মিড-লেভেলের ডাক্তাররা আরও বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন।”
তিনি আরও বলেন, “রোগীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি লাঘব এবং সেবার মান আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতেই আমাদের এই বিশেষ প্রয়াস। পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে এর সাফল্য পর্যবেক্ষণ করে ভবিষ্যতে এর পরিধি আরও বাড়ানো হবে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সবসময় সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় আধুনিক ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর।”
এই আধুনিক ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারটি চালুর ফলে রোগীরা নিচের সুবিধাগুলো ভোগ করতে পারবেন, এক ছাদের নিচে সব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা: সার্জারি, অর্থোপেডিকস, মেডিসিন, এনেস্থেসিয়া ও গাইনি—এই পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা একই স্থানে রোগীদের সেবা দেবেন। ফলে বিভিন্ন বিভাগে ছোটাছুটি করার ঝামেলা থাকবে না।
দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা ও ছাড়পত্র: জরুরি বিভাগে আসা রোগীরা প্রথমেই ওসেক-এ তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা পাবেন। অনেক রোগী ছোটখাটো বা সাধারণ সমস্যা নিয়ে আসেন, যারা এই সেন্টার থেকেই চিকিৎসা নিয়ে একই দিনে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারবেন।
অপ্রয়োজনীয় ভর্তি ও হয়রানি থেকে মুক্তি: সাধারণ সমস্যার জন্য রোগীদের আর বিনা কারণে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে না। ফলে অপ্রয়োজনীয় ভর্তি এবং সিট পাওয়ার দীর্ঘ অপেক্ষার ভোগান্তি থেকে রোগীরা রেহাই পাবেন।
চিকিৎসকদের উন্নত মনোযোগ ও মানসম্মত সেবা: ওয়ার্ডগুলোতে রোগীর অতিরিক্ত চাপ কমে যাওয়ায় ভর্তি থাকা গুরুতর রোগীরা ইন্টার্ন এবং মিড-লেভেল ডাক্তারদের কাছ থেকে আরও নিবিড় ও উন্নত সেবা পাবেন।
সময় ও অর্থের সাশ্রয়: দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং একই স্থানে সব সেবা পাওয়ার কারণে রোগীদের যাতায়াত খরচ, সময় এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপ অনেকটাই কমে যাবে।
নতুন এই সেবা চালুর পর হাসপাতালে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে স্বস্তির ছাপ দেখা গেছে। তাদের অনুভূতি ও বক্তব্য নিচে তুলে ধরা হলো,
মো. রফিকুল ইসলাম (একজন রোগীর স্বজন):
"আগে সামান্য আঘাত বা সমস্যা নিয়ে আসলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিভিন্ন ওয়ার্ডে ঘুরতে হতো। রোগী ভর্তি করানো নিয়ে এক ধরনের যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হতো। এখন জরুরি বিভাগেই যদি ডাক্তাররা সব দেখে ওষুধ ও প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দেন, তাহলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের ভোগান্তি অর্ধেক কমে যাবে।"
নাজমিন নাহার (চিকিৎসা নিতে আসা এক নারী):
"অনেক সময় ছোটখাটো সমস্যার জন্য পুরো রাত হাসপাতালেও থাকতে হয় বা ওয়ার্ডে সিট পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এই ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুর খবরটি শুনে খুব ভালো লেগেছে। ডাক্তাররা যদি এক জায়গায় বসেই সব সমাধান করে দেন, তবে আমাদের অনেক কষ্ট লাঘব হবে।"
আব্দুল জব্ধার (বয়োবৃদ্ধ এক রোগী):
"বয়সের কারণে হাসপাতালে এসে ছোটাছুটি করা আমার জন্য খুব কষ্টকর। একই জায়গায় যদি মেডিসিন বা সার্জারির ডাক্তার পাওয়া যায়, তাহলে আর কষ্ট করে সিড়িতে বা ওয়ার্ডে দৌড়াতে হবে না। সরকারের এই উদ্যোগটি আমাদের জন্য অনেক উপকারে আসবে।"
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এই ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার (ওসেক) চালুর উদ্যোগটি দেশের সার্বিক স্বাস্থ্যসেবা খাতে একটি সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। সাধারণ রোগীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি, হাসপাতালে অপ্রয়োজনীয় জট এবং অতিরিক্ত চাপের স্থায়ী সমাধানে এই পাইলট প্রজেক্টটি বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা যায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা এবং সঠিক মনিটরিংয়ের মাধ্যমে যদি এই সেবাটি নিরবচ্ছিন্ন রাখা সম্ভব হয়, তবে এটি শুধু রাজশাহী নয়, বরং দেশের অন্যান্য বড় হাসপাতালের জন্যও একটি চমৎকার রোল মডেল হয়ে উঠতে পারে।