আর্কাইভ কনভাটার ঢাকা, সোমবার, মে ২৭, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
Logo

ঘূর্ণিঝড় রেমাল

logo

বঙ্গবন্ধুর চিঠিপত্র: যেন এক অন্য মুজিব

Bangabandhu's letter


দেওয়ান মামুনূর রশিদ প্রকাশিত:  ২৬ মে, ২০২৪, ০১:৫৯ এএম

বঙ্গবন্ধুর চিঠিপত্র: যেন এক অন্য মুজিব
দেওয়ান মামুনূর রশিদ

একজন রাজনৈতিক ব্যক্তির প্রবন্ধ, নিবন্ধ, ভাষণ অভিভাষণে যেমন তাঁর মন-মানস, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রতিফলিত হয় তেমনি স্মৃতিচারণ, আত্মজীবনী, চিঠিপত্র, ব্যক্তি জীবনের আনন্দ-বেদনা, আশা-হতাশা, সংগ্রাম, আন্দোলন, সাফল্য ও ব্যর্থতা ইত্যাদি উদ্ভাসিত হয়। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ইতিহাসের এক উত্তাল সময়ে ঘটনাতরঙ্গের কেন্দ্রস্থলে থাকা ব্যস্ত একজন মানুষের অন্তরঙ্গ একান্ত পরিচয় ফুটে উঠেছে তাঁর চিঠি পত্রে। তাঁকে দিয়েছে বা তিনি দিয়েছেন এমন সকল চিঠি পর্যবেক্ষণ করলে তাঁর দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ, মমতা ও ব্যতিক্রমী জীবন ফুটে ওঠে, মনে হয় এ যেন এক অন্য মুজিব।

আমি ২০০৯ সাল হতে সরকারের শিক্ষাখাতের উন্নয়ন, অগ্রগতি, সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করে চলেছি। এ পথ অতিক্রম করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন সংগ্রাম, জীবন-দর্শন, ব্যক্তিত্ব, হৃদয়ের আবেগ ও ব্যকুলতা পাওয়া না পাওয়ার মধ্যেও মা-মাটিকে আঁকড়ে ধরে সংগ্রামী পথ অতিক্রম করার যে নিজস্ব আন্তরিকতা ও ভালোবাসা বোধ লক্ষ্য করেছি তা বিস্ময়কর। তাছাড়া বিভিন্ন সময়ে পিতা ও কন্যার মধ্যে যে সবচিঠি পত্র আদান প্রদান হয়েছে তার অন্তরনিহিত ভাব ও দর্শন আমি লক্ষ্য করেছি। জেল থেকে বেগম মুজবের (বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব) প্রতি প্রেরিত কিছু চিঠি আমি পড়েছি, চিঠিগুলোর প্রতিটি অক্ষরের প্রতি আবেগায়িত হয়েছি। এর ভাষা, ভাষা চয়ন, শব্দ রিতি ও দিক নির্দেশনা নিয়ে অনেক ভেবেছি। আমি বেশ কয়েকটি চিঠি পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করেছি। তাতে করে মনে হয়েছে যে, এক একটি চিঠি যেন এক একটি জীবন্ত ইতিহাস। এগুলোর মধ্যে বাঙালির জন্য যেমনি জ্ঞানের আলো লুকিয়ে আছে, তেমনি পৃথিবীর যে কোনো মানুষের জন্য রয়েছে জ্ঞানমূলক পথ নির্দেশনা। 

১৯৫৯ সালের ১৬ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু সেদিন ঢাকা জেলে রাজবন্দী। কয়েকদিন আগে ঈঁদুল ফিতর অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। বেগম মুজিবকে তিনি রেনু বলে ডাকতেন, অর্থাৎ বঙ্গমাতার ডাক নাম ছিলো রেনু। ঈঁদের পরে তিনি সেন্ট্রাল জেলে এসেছেন স্বামী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করতে। কিন্তু ছেলে-মেয়েদের কাউকে সাথে করে আনেননি। সাক্ষাৎ শেষে বঙ্গবন্ধু যথারিতি তাঁর কারা কামরায় চলে গেছেন। পরে বেগম মুজিবের নিকট চিঠি লিখেছেন। 

এখানে বিশেষ করে দেশের জন্য, স্বাধীনতার জন্য, জেলে যাওয়া একজন ব্যক্তির স্ত্রী ও সন্তানদের অভাব-অনটন, হৃদয়ের হাহাকার, বেদনা-বিধুরতা ফুটে উঠেছে। তিনি সন্তানদের লেখাপড়ার পাশাপাশি মাকেও (বেগম মুজিবকে) পড়তে বলেছেন। ক’জন স্বামী আছেন যিনি স্ত্রীকে এগিয়ে নেয়ার জন্য, জ্ঞান চর্চার জন্য বই পড়ার কথা বলেন, তাও জেলে থেকে। বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা অনুরাগ ও জ্ঞান দর্শন এখানে স্পষ্ট। তিনি ছবি আঁকা প্রছন্দ করতেন ছেলে-মেয়েদের এক্সট্রা কারিকুলাম বাড়ানোর প্রতি তাঁর আগ্রহ ফুটে উঠেছে। এদেশের জন্য স্বাধীনতার জন্য একাকি জেলে থাকতে তাঁর কতো কষ্ট হয়েছে তাও চিঠিতে উঠে এসেছে। সে বছর ঈঁদের দিনে বঙ্গবন্ধুর পরিবারে আনন্দ ছিলোনা। এমন অনেক ঈঁদে তাঁদের বেধনা বিধুর সময় গেছে। যাঁদের ত্যাগে আজ সুন্দর স্বাধীন দেশ আমরা পেয়েছি।

বঙ্গবন্ধু বই ভালোবাসতেন, ১৯৭২ সালে নিউইয়র্ক টিভিতে দেয়া এক স্বাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন আমার জিনিস পত্র হানাদাররা লুট করেছে তাতে আমার কোনো কষ্ট নেই। কিন্তু কষ্ট হলো আমার বইগুলো তাঁরা নিয়েগেছে। দেখুন, বইয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা কতো গভীর ছিলো। 


পর্যবেক্ষণে দেখাগেছে যে, বঙ্গবন্ধুর চিঠিকে চার স্তরে সাজানো যায়। 

১। রাজনৈতিক নেতা কর্মীদের নিকট বঙ্গবন্ধুর লেখা চিঠি। 

২। সরকারি কার্মকর্তাদের নিকট বঙ্গবন্ধুর চিঠি।

৩। বঙ্গবন্ধুকে লেখা রাজনৈতিক নেতা কর্মী ও বিভিন্ন জনের চিঠি এবং

৪। স্ত্রী-সন্তান ও মা-বাবাসহ আত্মিয় স্বজনদের কাছে লেখা বঙ্গবন্ধুর চিঠি।

আমি এ বিষয়টি ব্যক্তিগত চিন্তা ও পর্যবেক্ষণে অনুভব করেছি।

উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন শুরু হয়েছিলো ১৯৩৮ সালে বৃটিশ ভারতের কারাগারে। এর পরে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে কেটেছে দীর্ঘ কাল। তবে পর্যবেক্ষণ ও গবেষণায় দেখা গেছে বঙ্গবন্ধুর অনেক চিঠি প্রাপকের হাতে পৌঁছায়নি। পুলিশ বাহিনীর প্রতি সরকারি নির্দেশনা থাকায় বঙ্গবন্ধুর চিঠি পোষ্ট অফিস থেকে বাজেয়াপ্ত করা হতো। অনেক সময় চিঠির অনুরূপ কপি রেখে প্রাপকের নিকট পাঠানো হতো। ১০ আগস্ট ১৯৪৯ সালের লেখা চিঠিটি বাজেয়াপ্ত হয়েছে গোয়েন্দা সংস্থার কাছে। যেহেতু চিঠিতে তারিখ লেখা ছিলো না, তাই মনে হচ্ছে, উল্লেখিত তারিখের দু’এক দিন আগে হয়তো চিঠিটা লেখা হয়েছে। তবে বাজেয়াপ্ত হওয়ার তারিখ এখানে উল্লেখ করা হলো। এই চিঠি ছিলো শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রতি লেখা। 


১৯৪৮ সালে তিনি ঢাকা জেলখানা থেকে যেসব চিঠি পাঠিয়েছেন স্বজনদের নিকট তার কিছু চিঠি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে এবং ১৯৫০ সালে তিনি ফরিদপুর কারাগার থেকে শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে যে চিঠি লেখেছেন তাও গোয়েন্দাদের নিকট আটক হয়। এর পরে ১৯৫১ সালে তাঁকে খুলনা কারাগারে পাঠানো হয়। 

সবগুলো চিঠি ছিলো দেশ ও স্বাধীনতাকে ঘিরে, বাঙালির মুখে হাসি ফুটাতে তাঁর সংগ্রামের কথা লেখেছেন। বঙ্গবন্ধুর চিঠিগুলো এখনো প্রাণবন্ত, এখনো গুরুত্ব বহন করে। চিঠি পড়ে যে কারোই চোখ অশ্রু সিক্ত হতে পারে!

দেখুন, ১৯৫১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তিনি ঢাকা কারাগার থেকে তৎকালীন আওয়ামী মুসলিম লীগের সেক্রেটারি জনাব শামসুল হকের নিকট চিঠি লেখেন। এই চিঠি গোয়েন্দাদের নিকট বাজেয়াপ্ত হয়েছিলো। চিঠির ১ম স্তবকে বঙ্গবন্ধু লেখেছেন- “ভয়ের কোনো কারণ নেই। আমি জানি, আমি মরতে পারিনা বহু কাজ আমায় করতে হইবে”। তাইতো, বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় বিশ্বাস তাঁকে এগিয়ে দিয়েছে। তিনি মরেন নাই, বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন হাজার বছর ধরে ইতিহাস হয়ে। 

পাকিস্তানিরাও তাঁকে মারতে পারেনি। দেখুন, কী অভাক করা বিষয়, তিনি শামসুল হক সাহেবের চিঠিতে লেখেছেন “দু’এক খানা ভালো ইতিহাসের বা গল্পের বই পাঠাতে পারলে সুখী হব”। তার মানে তিনি কারাগারে একটুও অবসর ছিলেন না। আত্মজীবনী লেখেছেন, ডায়রিতে ইতিহাস লিখেছেন ও পড়েছেন অনেক বই। দু:খের বিষয় হলো বঙ্গবন্ধুর অনেক লেখনি উদ্ধার করা যায়নি। জননেত্রী শেখ হাসিনার অবদানে আমরা কিছু (অসমাপ্ত আত্মজীবনী) লেখেনি পেলাম। বঙ্গবন্ধুর চিঠির মধ্যে আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও নির্ভরতা ফুটে ওঠেছে। তেমনি দেশি-বিদেশী বই পড়ার প্রতি অধিক আগ্রহ আমি লক্ষ্য করেছি। তিনি প্রায় চিঠিতে বই পাঠানোর কথা লেখেছেন। সত্যি বই এক প্রকার শক্তি যা, মানুষকে নেতৃত্বের গুণে বলীয়ান করে। করে জ্ঞানী ও ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন। 

তাঁর চিঠিগুলো আগামী প্রজন্মের নিকট গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস। চিঠিগুলো গবেষণার মাধ্যমে আরো ঐতিহাসিক দালিলিক তথ্য উঠে আসবে যা, একটি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য বড় প্রয়েজন।

লেখক: আইনজীবী ও নির্বাহী পরিচালক, বিদ্যাভবন গবেষণা কেন্দ্র। 


google.com, pub-6631631227104834, DIRECT, f08c47fec0942fa0