আর্কাইভ কনভাটার ঢাকা, বুধবার, জুন ১৯, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৫ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
Logo

logo
রক্তাত্ব ২ এপ্রিল ১৯৭১

চিরভাস্বর রাজশাহী কলেজের প্রাক্তন ছাত্র

Bleeding April 2, 1971


ওয়ালিউর রহমান বাবু প্রকাশিত:  ১৯ জুন, ২০২৪, ০৬:৩৩ এএম

চিরভাস্বর রাজশাহী কলেজের প্রাক্তন ছাত্র
শহিদ সুরেশপান্ডে ও শহিদ বীরেন্দ্রনাথ সরকার

শহিদ এ্যাডভোকেট বীরেন্দ্রনাথ সরকার ও সমাজসেবী শহিদ সুরেস পান্ডে


৩১মার্চের পর রাজশাহী ক্যান্টনমেন্টে থাকা পাকিস্তানি সৈন্যরা বাইরে বের না হলেও দোসরদের নিয়ে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হত্যার তালিকা করে। এই তালিকায় ছিলেন রাজশাহী কলেজের মেধাবী প্রাক্তন ছাত্র আইনজীবী রাজনীতিবিদ, ক্রীড়াবিদ, ক্রীড়া সংগঠক, সমাজসেবী বীরেন্দ্রনাথ সরকার। রাজশাহী কলেজের প্রাক্তন মেধাবী ছাত্র, রাজশাহী পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান সুরেশপান্ডে। আইনজীবী রণেশ মৈত্র, সিদ্ধার্থ বাবু, ডাক্তার দাক্ষী প্রমুখ।

বীরেন্দ্রনাথ সরকার, সুরেশ পাণ্ডে সহ হত্যাতালিকায় থাকা ব্যক্তিবর্গকে অন্যত্র চলে যেতে বললেও তারা রাজী না হয়ে সকলের মধ্যে ঐক্য ধরে রেখে সকলকে সাহসী করে তোলেন। ২এপ্রিল রাতে ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের কিলিং গ্রুপের দোসরদের মদদে রাজশাহী জেলা সদরের রাণীবাজারে এ্যাডভোকেট বীরেন্দনাথ সরকাররের বাড়িতে গিয়ে নিচের ঘরে থেকে হত্যা তালিকায় থাকা আইনজীবী রনেশ মৈত্র ও সিদ্ধার্থ বাবুকে ডেকে দোতলায় নিয়ে গিয়ে বীরেন্দ্রনাথ সরকারকে ডাকায়। এরপর তারা বীরেন্দ্রনাথ সরকারের বুকে গুলি করলে দেহটি নিথর হয়ে অর্ধেক বিছানায় এবং কোমরের নিচের অংশ মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। বিপ্লবী এই ব্যক্তির রক্তে লাল হয়ে যায় বিছানা ও ঘরের মেঝে। রনেশ মৈত্র ও সিদ্ধাত্র বাবুকে পাকিস্তানি সৈন্যরা চিনতে না পারায় তারা বেঁচে যান। 

বৈচিত্রময় জীবনের সুদর্শন, দীর্ঘ দেহী বীরেন্দনাথ সরকার ১৯১৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারী রাজশাহী জেলার বাগমারা থানার জাহানাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা যোগেন্দ্রনাথ সরকার জাহানাবাদ এষ্টেটে চাকুরী করতেন। মা নিতেন বালা সরকার চার ভাই বোনের মধ্যে বীরেন্দ্রনাথ সরকার দ্বিতীয়। রাজশাহী বিশে^শ^র হিন্দু একাডেমিতে পড়ার সময় রাজনীতিতে জড়িয়ে ছাত্র ফেডারেশনের নির্ভীক সক্রিয় কর্মী হয়ে উঠেন। রাজশাহী কলেজে ভর্তি হবার পর, প্রত্যক্ষভাবে ইংরেজীদের বিরুদ্ধে গড়ে উঠা বিপ্লবী সংগঠন ‘অনুশীলন’ দলের কর্মী হিসাবে ভূমিকা রাখতে থাকেন। বিপ্লবী নেতা প্রভাসচন্দ্রলাহিড়ী ও জিতেশচন্দ্রলাহিড়ীর ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসেন। রাজশাহী জেলা সদরের ভদ্রা এলাকার জঙ্গলে রেল-লাইনের উপর রানী বাজার সুকুলের মাঠে জীতেশচন্দ্রলাহিড়ীর কাছে সামরিক প্রশিক্ষণ নেন। পাশাপাশি নিয়মিত কুস্তি, ব্যয়াম করতেন। বৃটিশ নাগরিক রাজশাহী কারাগারের সুপার ও সিভিল সার্জন মি. নিউককে হত্যার প্রচেষ্টার সাথে জড়িত থাকায় বিপ্লবী কর্মকারের সাথে তাকে গ্রেফতার করে রাজশাহী কারাগারে রেখে উত্তর প্রদেশে বিহারের দুর্গম বকশা বন্দি শিবিরে পাঠিয়ে দীর্ঘ সময় পর পাঠানো হয় মেদিনীপুরের হিজলা বন্দি শিবিরে। 

বন্দি অবস্থায় আই.এ ও বি.এ পাস করেন। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের সময় তাকে মুক্তি দিলেও নজরদারিতে রাখা হয়। রাজশাহী জেলা সদরে ফিরে এলে তাকে বোয়ালিয়া থানা এলাকার বাইরে গেলে অনুমতি নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। বাড়িতে অস্ত্র আছে এই অভিযোগে একদিন ভোরবেলা বাড়িতে পুলিশ এলে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে থাকা তার ঠাকুরমা কদম বিথী সরকার কৌশলে পূজার সামগ্রীর ভিতরে অস্ত্র রেখে তা বাইরে নিয়ে আসেন। বৃটিশ ভারত ছাড়ো আন্দোলনে বন্দি অবস্থায় আইন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৪৫ সালে মুক্তি পেয়ে প্রখ্যাত আইনজীবী নরেন মুন্সীর সহকারী হিসাবে আইন পেশা শুরু করেন। ১৯৪৮ সালের ৩১ জানুয়ারি রাজশাহী জেলা সদরে ভূবন মোহন পার্কে অনুষ্ঠিতব্য যুব সম্মেলনকে কমিউনিষ্টদের সম্মেলন বলে জেলা প্রশাসক নিষেধাঙ্গা দেন। 

৩০ জানুয়ারি খবর আসে মহত্মা গান্ধীকে হত্যা করা হয়েছে। শোক সভার অনুমতি পেয়ে তিনি কৌশলে যুব সম্মেলন করে ফেলেন। তিনি ভিয়েতনাম থেকে আসা বিপ্লবী মুক্তিযোদ্ধ মাই-থি-চাও এর ইংরেজী বক্তব্যের বাংলা অনুবাদ করেন। নেতাজী সুভাস চন্দ্র বসুর রেভ্যুলুশানারি সোসালিস্ট পার্টির আদর্শ প্রকাশ্যে জনসাধরনের সামনে তুলে ধরতেন। অল্প সমর্থক থাকেলই নিজেই স্লোগান দিয়ে মিছিলের নেতৃত্ব দিতেন। আইন পেশার পাশাপাশি নিজেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত রাখেন। কোন ভয় তাকে থামিয়ে রাখতে পারে নি। বিভিন্ন মতাদর্শের নেতাকর্মীদের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। তিনি ছিলেন প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (পিটিআই) এর রাজশাহী প্রতিনিধি। ফুটবল ও লন টেনিসে পারদর্শী ছিলেন। দক্ষ ক্রীড়াবিদ, দক্ষ ক্রীড়া সংগঠক, দক্ষ রেফারির পরিচিতি পান। 

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগে হিন্দু সম্প্রদায় সীমান্তের ওপারে চলে থাকলে তিনি তা না করে, এদিকে থেকে গেলেন। পঞ্চাশ দশকে রাজশাহীর নাচোলে আদিবাসী আন্দোলনের বিপ্লবী রানীমা ইলামিত্রের পক্ষে আইনজীবী হিসাবে সহযোগিতা করেন। ১৯৪৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের আইন পরিষদের সদস্য এম আতাউর রহমান ও অন্যান্য দের নিয়ে রাজশাহী প্রেস কøাব গঠন করে বিপ্লবী নেতা যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী তার রাজনৈতিক গুরু প্রভাসচন্দ্রলাহিড়ীকে দিয়ে এর উদ্ভোদন করান। ১৯৫৭ সালে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) গঠন করলে, তিনি জেলার সভাপতি হন। ষাট দশকে মতবিরোধে জেলা প্রশাসক রাজশাহী প্রেস ক্লাবের তহবিলের উপর হস্তক্ষেপ করলে তিনি মামলা করে তাকে পরাজিত করেন। 

তিনি ছিলেন সাংবাদিকদের অভিভাবক। রাজশাহী প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও নির্বাহী সদস্যের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান ভারত যুদ্ধের সময় অবাঙালি জেলা প্রশাসক চাপ দিয়েও তাকে দিয়ে ভারত বিরোধী বিবৃতিতে স্বাক্ষর করাতে না পেরে নজরদারিতে রাখেন। ১৯৬৭ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বিভক্ত হলে তিনি ওয়ালী-মোজাফফর ন্যাপে যোগ দিয়ে জননেতা এম আতাউর রহমান ও অন্যান্য দের নিয়ে রাজনৈতিক কর্মকন্ডে সম্পৃক্ত থাকেন। জনদরদী এই নেতা প্রতিদিন কোর্ট থেকে ফেরার সময় পরিচিতদের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিয়ে বাড়িতে ফিরতেন, অসুস্থদের সহযোগিতা করতেন। বিপদে আপদে সমস্যায় থাকা মানুষদের পাশে থেকেছেন। নজরদারীতে থাকা লোকজন তার কাছে সহযোগিতা পেয়েছেন। অবসরে তিনি তার সহকারী অন্যান্য আইনজীবীদের নিয়ে আলোচনায় বসতেন। ছুটির দিনে তার বাড়িতে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের বৈঠক বসতো। 

১৯৬৯ সালে গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলন-প্রতিরোধ সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করতে সক্রিয় নেতা হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সৈন্যরা গণহত্যা শুরু করলে তিনি সকলকে সাহসী করে তোলেন। ২ এপ্রিল তাকে হত্যা করার পর কিলিং গ্রুপটি ফুদকি পাড়ার রাজশাহী কলেজের প্রাক্তন ছাত্র বৃটিশ বিরোধী নেতা যুক্তফ্রন্টের সদস্য রাজশাহী পৌরসভার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আইয়ুব সরকারের বিডি সদস্য ও ওয়ার্ড কমিশনার, সমাজসেবী সুরেশ পাণ্ডের বাড়ি সৈলজ্য কুটির গেটে এসে তাকে ডাক দিলে তিনি সহজ মনে দোতালা থেকে নেমে এসে তাদের সাথে কথা বলেন। দোতালায় ছিলেন স্ত্রী চিত্র লিখাদেবী, ছেলে লালজী ও মন্টু। নিচের ঘরে বৃদ্ধা মা গেনদা সুন্দরী। কথা বলে  ফিরার সময় তারা গুলি করলে গুলি তার মাথার পিছন দিক দিয়ে উঠানে পড়ে। তিনি ও পড়ে গেলে তার মাথাটি দুভাগ হয়ে যায়। বৃদ্ধা মা কিছুই বুঝতে না পেরে  বলেন, ‘বাবা সুরেশ এক গ্লাস জল দে, জল খাবো’। স্ত্রীর হাতে পানি পান করে সুরেশ পাণ্ডে  মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন। এরপর কিলিং গ্রুপটি মালোপাড়ায় ডাক্তার দাক্ষীকে ধরতে গেলে তিনি বুঝে ফেলে স্ত্রীকে ঘাড়ে তুলে নিয়ে অন্য একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন। তার আত্মীয় সঙ্গীত শিল্পী ছাত্র ইউনিয়নের নেতা কানু মোহন গোস্বামী উর্দুতে নিজের  নাম কালু বাড়িতে কাজ করে বলে রক্ষা পান। 

রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের পূর্ব দিকে জেবের মিয়া ইট ভাটায় থাকা আইয়ুব ক্যাডেট কলেজের এডজ্যুটেন্ড ক্যাপ্টেন রশীদ (বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধকালীন ৭নং সেক্টরের ৪নং সাবসেক্টর, কাজী পাড়া ক্যাম্প কমান্ডার), প্রফেসর আবু বক্কর সিদ্দিকী (বীরপ্রতীক, শহিদ) ও চারঘাট থানার মীরগঞ্জ বিওপির সুবেদার নায়েব সিরাজউদ্দিন লস্কর (বীর মুক্তিযোদ্ধা) তাদের বাহিনী নিয়ে রাজশাহী জেলা সদরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা তুলে রাজশাহী জেলা সদরকে মুক্ত ঘোষণা করেন। টহলে থাকা পাকিস্তানি সৈন্যরা পালিয়ে যায়। সকালে পশ্চিম দিক দিয়ে নওগাঁ থেকে আসা ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ই.পি.আর) ৭নং উইং এর সেকেন্ড ইন কমান্ড ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন আহমেদ চৌধরী (বীর মুক্তিযোদ্ধা), মুক্তিযুদ্ধকালীন ৭নং সেক্টরের ৪নং সাবসেক্টর কমান্ডার তার বাহিনী নিয়ে রাজশাহী জেলা সদরে এলে তাকে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়। 

জেলা পরিষদ ডাক বাংলো ও সার্কিট হাউজে থাকা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অফিসারদের আত্মসর্মপণ করতে ইংরেজী, বাংলা ও উর্দুতে ঘোষণা দিবার কিছু পরেই এই দুই জায়গার পতন হয়। কমরেড মণি সিংয়ের নেতৃত্বে রাজশাহী কারাগারে বিদ্রোহে কয়েকজন শহিদ হন। কমরেড মণি সিং, কমরেড দেবেং শিকদার, পাবনার ঈশ^রদী বাম নেতা ফজলুর রহমান ফান্টুকে সীমান্ত পার করে দেয়া হয়। তৎকালীন চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহকুমার শিবগঞ্জ বাম নেতা মীরাতুল ইসলাম তার অঞ্চলে চলে গেলেন। হিন্দু সম্প্রদায় সহ অন্যান্যরা সীমান্তের দিকে চলে যেতে থাকে। মুসলিম লীগ সহ পাকিস্তান পন্থি অনেকে বীরেন্দ্রনাথ সরকার ও সুরেশপান্ডেকে হত্যার বিষয়টি মেনে নিতে পারলেন না। দুপুরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এর কর্ণেল সেন ও মেজর ত্রিবেদী ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন আহমেদ চৌধুরীর সাথে দেখা করেন। রাজশাহী ক্যান্টেনমেন্ট অবরোধ করার পরিকল্পনা নেয়া হয়। পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়।


লেখক মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রাহক, রাজশাহী।

google.com, pub-6631631227104834, DIRECT, f08c47fec0942fa0