Template: 2
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
logo
বিজয় বাংলা নিউজ
bijoybangla.news
১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
০১:০৮ অপরাহ্ন

অদেখা বার্তা

জুবায়ের হোসেন unseen message

আমার পকেটে এখন দুটা ফোন আছে। একটা আমার—লেটেস্ট মডেলের ফোন। আরেকটা আইফোন ১১— স্ক্রিনটা পুরাতন এবং হালকা স্ক্রেচ পড়া। এটা হচ্ছে নীলার।

নীলা আমার স্ত্রী ছিল। আজ থেকে পাঁচ বছর আগ পর্যন্ত।

আমি ধানমন্ডি লেকের পাশে একটি বেঞ্চে বসে আমার ফোনটা বের করে হোয়াটসঅ্যাপ ওপেন করলাম। পিন করা চ্যাট লিস্টের একদম ওপরে তার নাম: "My Neela" দিয়ে সেভ করা।

আমি টাইপ করতে শুরু করলাম। আমার হাত কাঁপছে না, কিন্তু বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে।

"নীলা, আজকে আমি অফিসে প্রমোশন পেয়েছি, ভিপি হয়েছি। সবাই অভিনন্দন জানাচ্ছে। কিন্তু তুমি আমাকে এখন শুভেচ্ছা জানাওনি? আজ আমি সেই নোটিফিকেশনটা মিস করছি, যেটা দেখে আমি আগে বিরক্ত হতাম।"

সেন্ড!

আমি ডান হাত দিয়ে মেসেজটা পাঠাই, আর বাঁ হাতে ধরে রাখা নীলার ফোনটার দিকে তাকিয়ে থাকি। হঠাৎ নীলার ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। একটা নোটিফিকেশন: Saif sent you a message.

এই আলোটুকুর জন্যই আমি বেঁচে আছি, কিন্তু এই আলোই আমাকে পোড়ায়। কারণ এটা আমাকে মনে করিয়ে দেয়, আমি কীভাবে এই আলোটা নিভিয়ে দিয়েছিলাম।

আমার মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা। যখন নীলা আমার পাশে ছিল, তখন তার মেসেজগুলো আমার কাছে ছিল 'বিরক্তিকর'। আমি তখন ক্যারিয়ার গড়ার পিছনে ফোকাস দিচ্ছিলাম। সারাদিন মিটিং, প্রেজেন্টেশন নিয়ে আমি ব্যস্ত থাকতাম।

নীলা মেসেজ করত: "সাইফ, আকাশটা দেখো, কী সুন্দর চাঁদ উঠেছে!" আমি নোটিফিকেশন প্যানেল থেকে দেখে মনে মনে বলতাম, 'ধুর! এখন কাজের সময়।' আমি আর রিপ্লাই দিতাম না। সে লিখত: "খেয়েছ? খাবার গরম করে রাখব?" আমি সিন করে রেখে দিতাম। ভাবতাম, বাড়ি ফিরে উত্তর দেব।

আমি তাকে টেক ফর গ্র্যান্টেড নিয়েছিলাম। ভাবতাম, নীলা তো আছেই। সে তো আমার পার্মানেন্ট, কিন্তু কাজটা টেম্পোরারি। আমি তখনও বুঝতে পারিনি যে আমি ভুল ছিলাম।

এখন আমার জীবনে কাজটা পার্মানেন্ট হয়ে গেল, নীলা টেম্পোরারি হয়ে গেল!

সবচেয়ে ভয়ংকর দিনটা ছিল ১২ই আগস্ট, ২০১৯।

আমার জীবনের সবথেকে বড় ডিল সাইন হওয়ার দিন, ক্লায়েন্ট মিটিং চলছে। আমার ফোনটা টেবিলের ওপর রাখা। রাত ৯:৩০, ফোনটা ভাইব্রেট করল। নীলার মেসেজ। স্ক্রিনে ভেসে উঠল: "সাইফ, শরীরটা ভালো লাগছে না, তুমি কি আজকে একটু তাড়াতাড়ি বাসায় আসতে পারবে?" আমি ভ্রু কুঁচকে তাকালাম। মনে হলো, 'আবার ন্যাকামি শুরু হলো।' আমি ফোনটা উল্টে রাখলাম।

রাত ৯:৪৫, আবার ফোন বেজে উঠল, এবার কল। আমি কেটে দিলাম। এবং ফোনটা 'Do Not Disturb' মোডে দিলাম। আমি চাইনি আমার ক্যারিয়ারের এই বড় মুহূর্তে কেউ আমাকে ডিস্টার্ব করুক।

মিটিং শেষ হলো ১০:৩০-এ, ডিল সাইন হয়েছে। সবাই হাততালি দিচ্ছে। আমি বিজয়ের হাসি নিয়ে ফোনটা হাতে নিলাম। 'Do Not Disturb' অফ করলাম।

দেখলাম, ৪৭টি মিসড কল!!!

নীলার নয়!

আমাদের দারোয়ানের, প্রতিবেশীর, আর সবশেষে... হাসপাতালের।

আমি তাড়াহুড়ো করে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

আমি যখন হাসপাতালে পৌঁছালাম, ডাক্তাররা তখন সাদা চাদর দিয়ে তার মুখটা ঢেকে দিচ্ছিল। ডাক্তার আমাকে বলল, "মি. সাইফ, আপনি যদি ৩০ মিনিট আগে আসতেন! ওনার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। উনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার ফোনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। কাউকে কল করতে দেননি, বলেছিলেন—'সাইফ আসছে, ও ঠিকই চলে আসবে'।"

যেই রাতে আমি প্রমোশন পেয়েছিলাম। সেই রাতেই আমি আমার পৃথিবীটাকে হারিয়েছিলাম।

আমি এখন আমার ফোনের দিকে তাকাই। আমার মেসেজের পাশে দুটো ধূসর টিক চিহ্ন। চ্যাটের ওপরে লেখা: Last seen: 12th August, 2019 at 10:15 PM.

ওই ১০:১৫ পর্যন্ত সে অপেক্ষা করেছিল। সে বিশ্বাস করেছিল আমি ফোনটা ধরব। কিন্তু আমি ধরিনি, আমি আমার ইগো, আমার কাজ, আর আমার অবহেলা দিয়ে আমার নীলাকে হত্যা করেছি। ডেঙ্গু বা হার্ট অ্যাটাক তাকে মারেনি, মেরেছে আমার 'Do Not Disturb' মোড!

আজও আমি তাকে ভয়েস নোট পাঠাই। "নীলা, ফিরে এসো। আমি আর কোনোদিন ফোন সাইলেন্ট করব না। আমি প্রমিস করছি, মিটিংয়ের মাঝখানেও আমি তোমার কল ধরব। প্লিজ, তুমি একবার শুধু একবার কলটা ধরো।"

সেন্ড!

কোনো রিপ্লাই নেই। শুধু লেকের ধারে বাতাসের শব্দ। আর আমার হাতের মুঠোয় দুটো ফোন—একটা আমার বর্তমান, আরেকটা আমার মৃত অতীত।

ঠিক তখনই খেয়াল করলাম, আমার পাশের বেঞ্চে একটি ছেলে বসে আছে। বয়স পঁচিশের মতো হবে। সাধারণ টি-শার্ট, হাতে একটা পুরোনো বাদামী নোটবুক। সে আমাকে দেখছে, সে দেখছে, কীভাবে একজন সফল মানুষ তার সাফল্যের ভারে পিষে মরছে। সে দেখছে, আধুনিক যুগের ট্র্যাজেডি কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে হয় না, হয় একটা ভুল সিদ্ধান্তের মধ্যে।

আমি ছেলেটার দিকে তাকালাম। আমার চোখ থেকে পানি পড়ছে।

"ভাই," আমি বললাম, গলাটা ধরে এলো। "তোমার প্রিয় মানুষটা যদি টেক্সট করে, বিরক্ত হইয়ো না। রিপ্লাই দিও। কাজ তো সারা জীবন থাকবে, কিন্তু মানুষটা থাকবে না। তাকে 'Unseen' করে রেখো না। কারণ একবার অফলাইন হয়ে গেলে, পৃথিবীর সবথেকে দামী ওয়াইফাই দিয়েও আর কানেক্ট করা যায় না।"

ছেলেটা শান্ত চোখে আমার দিকে তাকাল। তার হাতে পেন্সিলটা নড়ে উঠল। সে যেন বুঝল, টেকনোলজি আমাদের কাছে এনেছে ঠিকই, কিন্তু আমরা সেটাকে ব্যবহার করেছি দূরে ঠেলে দেওয়ার জন্য।

আমি ফোন দুটো পকেটে ঢোকালাম। নীলার ফোনের চার্জ প্রায় শেষ হয়ে আসছে। আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে। চার্জ দিতে হবে। ওটা বন্ধ হতে দেওয়া যাবে না। ওটা বন্ধ হলে নীলা দ্বিতীয়বারের মতো মারা যাবে।

পরবর্তীতে,সাইফ সেদিনও বাড়ি ফিরে গেল। সে জানে এটা এক ধরনের মানসিক রোগ, কিন্তু সে এই ডিজিটাল খাঁচা থেকে বেরোতে চায় না। তার মুক্তি নেই, কারণ সে নিজেই তার জেইলার। সে তার সাফল্যের শিখরে বসে আছে, কিন্তু তার ভিত্তিটা নড়বড়ে—কারণ সেটা অনুশোচনার ওপর দাঁড়িয়ে।

আদনান তখন ২৫ বছরের যুবক। সে দেখল, 'Last seen' এর টাইমস্ট্যাম্পটা আধুনিক মানুষের জন্য এক নতুন ধরনের সমাধিফলক। সে বুঝল, ভালোবাসার মানুষের মেসেজ 'সিন' না করাটা কত বড় অপরাধ হতে পারে।

আদনান তার নোটবুকটি বের করল। সেখানে আগের কিছু লেখা ছিল। সে এবার পঞ্চম পাতায় এল।

"অনুশোচনা হলো ধীরগতির বিষ, আর অবহেলা হলো সেই বিষের উৎস। নীল টিকের অপেক্ষায় থেকো না। মানুষটা অনলাইন থাকতে থাকতেই তাকে ভালোবাসার কথা বলো। কাজের অজুহাতে প্রিয়জনকে 'মিউট' করে রেখো না। কারণ একবার 'Last Seen' এর সময়টা স্থির হয়ে গেলে, তোমার পাঠানো হাজারটা মেসেজ কেবল সার্ভারে জমা হবে, হৃদয়ে পৌঁছাবে না। প্রিয়জনের কল কখনও কেটে দিও না, কারণ সেটাই হয়তো শেষ রিং হতে পারে।"

আদনান সেদিনই পকেট থেকে ফোন বের করল। তার একজনকে ফোন করার ছিল—যাকে সে অনেকদিন ধরে কাজের অজুহাতে এড়িয়ে চলেছে। সে আর টেক্সট করবে না। সে সরাসরি কল করবে। সে তার কণ্ঠস্বর শুনতে চায়, স্ক্রিনের লেখা নয়। 

© বিজয় বাংলা নিউজ
bijoybangla.news