
রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) নবনির্মিত ছাত্রহল-১ এর উন্নয়ন ও অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত কাজের দীর্ঘসূত্রতা ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এন এইচ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী নিজামুল হকের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, অব্যবস্থাপনা এবং প্রজেক্টের বরাদ্দ অর্থ অন্য প্রকল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে কালবিলম্ব করার অভিযোগ উঠেছে। একাধিকবার সময়সীমা নির্ধারণ ও লিখিত আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তব অগ্রগতির ঘাটতি প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এ বিষয়ে রুয়েটের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. এইচ এম রাসেল বলেন, “প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রকল্প বাস্তবায়নে নিরলস প্রচেষ্টা ও তদারকি অব্যাহত রয়েছে। কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার লক্ষ্যে অর্থছাড়সহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রশাসনিক সহযোগিতা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নিশ্চিত করা হয়েছে। আমরা আশা করছি, চলমান কার্যক্রমের অগ্রগতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা খুব শিগগিরই হলের পূর্ণাঙ্গ সুবিধাসমূহ ভোগ করতে পারবে।”
সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এন এইচ এন্টারপ্রাইজ প্রথমে অক্টোবর, পরে ফেব্রুয়ারি এবং সর্বশেষ চলতি বছরের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে লিফট স্থাপন ব্যতীত বাকি সব কাজ সম্পন্ন করার লিখিত প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে ধারাবাহিকভাবে নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রান্ত হলেও প্রতিষ্ঠানটি প্রতিশ্রুত কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হয়। প্রশাসনের অভিযোগ, একাধিকবার তাগাদা, অর্থছাড় এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহযোগিতা প্রদান করা সত্ত্বেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রত্যাশিত দায়বদ্ধতা, সমন্বয় ও কার্যকর অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, বিল উত্তোলনের পর এন এইচ এন্টারপ্রাইজ রুয়েটের নির্ধারিত পূর্তকাজের জন্য বরাদ্দ অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় না করে তাদের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে স্থানান্তর ও ব্যবহার করেছে। এর ফলে ছাত্রহল-১ এর উন্নয়ন কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য ধীরগতি দেখা দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। বিষয়টি প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, ছাত্রহল-১ এর বিভিন্ন স্থানে এখনো গুরুত্বপূর্ণ পূর্তকাজ অসম্পূর্ণ। বহু কক্ষে দরজা স্থাপন শেষ হয়নি, সাবস্টেশন পুরোপুরি চালু করা যায়নি, নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়নি, ওয়াইফাই সংযোগ স্থাপন অসম্পূর্ণ এবং লিফট স্থাপনও এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। মৌলিক এসব অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে আবাসিক শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত ভোগান্তি, অনিশ্চয়তা ও অস্বস্তিকর পরিবেশের মধ্যে বসবাস করছেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বারবার দাবি ও তাগাদা সত্ত্বেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত সীমিত জনবল দিয়ে কাজ পরিচালনা করছে, যা প্রকল্পের ধীরগতির অন্যতম প্রধান কারণ। তাদের মতে, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজের বাস্তবায়ন না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের আস্থা ক্রমেই কমে যাচ্ছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহিম দাবি করেছেন, প্রকল্পের কাজ সম্পন্নে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সাবস্টেশনের কাজ শেষ পর্যায়ে, এমডিবি বোর্ড স্থাপন প্রক্রিয়াধীন এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ হাতে পেলেই বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পানির পাম্প ও লিফটের যন্ত্রাংশ পৌঁছানোর পর প্রকল্পের গতি আরও বাড়বে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এই বিষয়ে পুরকৌশল বিভাগের ২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শাকিল আহমেদ বলেন, “এসব আশ্বাস নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। কাজের তুলনায় জনবল অত্যন্ত কম, পরিকল্পনায় সমন্বয়ের অভাব রয়েছে এবং প্রতিবারই নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করে দায় এড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।”
শিক্ষার্থীদের সূত্রে জানা যায়, পাশাপাশি অবস্থিত ছাত্রহল-২ এর উন্নয়নকাজ তুলনামূলকভাবে সন্তোষজনক হলেও হল-১ এ বাস্তব অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। এতে হল-১ এর শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্যবোধ ও হতাশা বাড়ছে।
এ প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীরা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এন এইচ এন্টারপ্রাইজ এবং এর স্বত্বাধিকারী নিজামুল হকের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সব অসমাপ্ত কাজ সম্পন্নের দাবি জানিয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা, কার্যকর তদারকি, স্বচ্ছ অর্থব্যবস্থা এবং সময়োপযোগী বাস্তবায়নের মাধ্যমে ছাত্রহল-১ কে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ, নিরাপদ ও মানসম্মত আবাসিক পরিবেশে রূপান্তর করা হবে।