
আওয়ামী জমানায় রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) বিদ্যুৎ বিভাগের সব কাজই পেত হ্যারো ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন নামের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। এর স্বত্ত্বাধিকারী আশরাফুল হুদা টিটো ছিলেন তৎকালীন মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তিনি একবার চায়না থেকে আনা দেড় হাজার সড়কবাতি গুছিয়ে দেন রাসিকের বিদ্যুৎ বিভাগে। এসব সড়কবাতির ব্যালাস্ট ছিল অতি নিম্নমানের। তাই লাগানোর পর বাতি টিকতই না।
কিন্তু সিটি করপোরেশন ২০২০ সালের ১৯ মে থানায় মামলা করে বিদ্যুৎ বিভাগের তিন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ, ইচ্ছাকৃতভাবে তারা বিভিন্ন সড়কের বাতি পুড়িয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু সড়কবাতিই নিম্নমানের বলে ঠিকাদারকে বিল দিচ্ছিলেন না বিদ্যুৎ বিভাগের দায়িত্বে থাকা তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম মুর্শেদ। এ জন্য এক কর্মচারীকে দিয়ে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায় করে এই প্রকৌশলীকেও মামলায় ফাঁসানো হয়। তারপর নির্বিঘ্নে বিল তুলে নেন ঠিকাদার। আর মামলা নিয়ে ভুগতে থাকেন কর্মকর্তা -কর্মচারীরা। গত ১৩ মার্চ আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেছেন মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক আব্দুল কুদ্দুস। এতে আসামিরা খালাস পেয়েছেন।
এই মামলাটি নিয়ে আওয়ামী লীগের আমলে ভয়ে মুখ খুলতেন না নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম মুর্শেদ। বুধবার যোগাযোগ করা হলে তিনি এই মামলা দায়েরের পেছনের কারণ জানিয়েছেন। দিয়েছেন চাঞ্চল্যকর তথ্য।
ঠিকাদারকে বাঁচাতেই মামলা:-
প্রকৌশলী গোলাম মুর্শেদ জানিয়েছেন, সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণে একচেটিয়া বিদ্যুৎ বিভাগের কাজ পেত হ্যারো ইঞ্জিনিয়ারিং। একবার তিনি চায়না থেকে আনা কিছু সড়কবাতির নমুনা এনে মেয়র লিটনকে দেখান। মেয়র লিটন তখন এই সড়কবাতি কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করতে বলেন। দরপত্র আহ্বান করা হলে হ্যারো ইঞ্জিনিয়ারিংই কাজ পায় এবং দেড় হাজার বাতি সরবরাহ করেন। এই সড়কবাতিগুলো দেখতে সুন্দর। আলোও ভাল। কিন্তু ব্যালাস্ট ছিল অত্যন্ত দুর্বল। প্রতিরাতেই বেশ কিছু বাতির ব্যালাস্ট পুড়ে যাচ্ছিল।
এ অবস্থায় গোলাম মুর্শেদ ঠিকাদারের বিল আটকে দেন। তখনই ঠিকাদারকে বাঁচাতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরিক্ত ভোল্টে দিয়ে সড়কবাতি পুড়িয়ে দেওয়ার মামলা দায়ের করা হয়। রাসিকের তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও আইন কর্মকর্তা সমর কুমার পাল বাদী হয়ে মামলাটি করেন।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ২০১৯ সালের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সড়কের বাতি ১০ থেকে ১২ বার পর্যন্ত পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে করপোরেশনের এক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। নিম্নমানের বাতি সরবরাহকারী ঠিকাদারকে বাঁচাতে এভাবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ফাঁসানো হয়। পরে ১২ কোটি টাকা বিল তুলে নিয়ে ভাগ-বাঁটোয়ারা করা হয়। ভুগছেন আট কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রথমে মামলাটি করা হয়েছিল করপোরেশনের স্ট্রিট লাইট মিস্ত্রি মিজানুর রহমান শাহিন, উপসহকারী প্রকৌশলী শফিকুল হাসান ও দৈনিক মজুরিভিত্তিক মিস্ত্রি ইব্রাহিম হোসেনকে আসামি করে। পরে বিল আটকে রাখা প্রকৌশলী গোলাম মুর্শেদকেও অভিযোগপত্রে আসামি করা হয়।
মামলাটি প্রথমে থানা-পুলিশ এবং পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করে। মামলার পর আসামিদের সহযোগিতা করার অভিযোগে চাকরিচ্যুত করা হয় দৈনিক মজুরিভিত্তিক হেলপার শফিকুল ইসলাম, কাজিম উদ্দিন ও মো. মাসুম ও গিয়াস উদ্দিনকে।
যোগাযোগ করা হলে চাকরিচ্যুত অস্থায়ী কর্মচারী শফিকুল ইসলাম ও কাজিম উদ্দিন জানান, ওই সময় দফায় দফায় তাদের পিবিআই অফিসে ডাকা হয়েছে। লাইট পোড়ানোর সঙ্গে নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম মুর্শেদ জড়িত বলে তাদের সাক্ষী দিতে বলা হয়। কিন্তু তারা মিথ্যা জবানবন্দী দিতে রাজি হননি। এ কারণে তাদের নির্যাতন করা হয়। আবার মিথ্যা সাক্ষ্য দিলে চাকরিতে বহাল করারও প্রলোভন দেখানো হয়। কিন্তু তাতেও তারা রাজি হননি। এখন তারা বিনাদোষে চাকরিচ্যুত অবস্থায় আছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। তারা তাদের চাকরিতে যোগদান করানোর দাবি জানান।
এ মামলায় অভিযুক্ত হওয়ার কিছু দিন আগে অবসরে যান তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম মুর্শেদ। তিনি জানান, মামলা হওয়ার কারণে এতদিনেও তার পেনশনের টাকা দেওয়া হয়নি। উপসহকারী প্রকৌশলী শফিকুল হাসান সম্প্রতি চাকরিতে যোগদান করেছেন। কিন্তু মামলা চলাকালে তিনি সাময়িক বরখাস্ত ছিলেন। মামলায় খালাস পাওয়ায় তাকে এখন বকেয়া বেতনসহ সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। কিন্তু তিনি সেগুলো এখনও পাননি। মিথ্যা মামলায় শফিকুল ও ইব্রাহিম জেলও খাটেন। ইব্রাহিমসহ ছয়জন কর্মচারী এখনও চাকরি ফিরে পাননি। তিনি এই ছয় কর্মচারীকেও চাকরিতে বহাল করার দাবি জানান।
জানতে চাইলে রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘এ বিষয়টা আমরা দেখছি। রায়ের কথা আমরা জেনেছি। পর্যালোচনা করে আমরা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’
অভিযুক্তরা কে কোথায়:-
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিম্নমানের সড়কবাতি কিনে বিপুল টাকা আত্মসাতের এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন রাসিকের তৎকালীন মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, তার এপিএস আব্দুল ওয়াহেদ খান টিটু, তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট ও মামলার বাদী সমর কুমার পাল, বিদ্যুৎ বিভাগের প্রকৌশলী এবিএম আসাদুজ্জামান সুইট ও ঠিকাদার আশরাফুল হুদা টিটো। গণঅভ্যুত্থানের পর তৎকালীন মেয়র লিটন স্বপরিবারে ভারতে চলে গেছেন। আব্দুল ওয়াহেদ খান টিটো এখন কারাগারে। সমর কুমার পাল এখন সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)। এবিএম আসাদুজ্জামান সুইট রয়েছেন রাসিকের বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে। আর ঠিকাদার আশরাফুল হুদা টিটো কোথায় তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাঁর মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।
নির্বাহী প্রকৌশলী এবিএম আসাদুজ্জামান সুইট এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘এসব সত্য না। আমি এখন মিটিংয়ে। পরে কথা বলব।’
মিথ্যা মামলার বাদী সমর কুমার পাল বলেন, ‘সবকিছু বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজনই করেছিল। আমি কিছুই জানি না। শুধু আইন কর্মকর্তার পদে থাকার কারণে আমাকে মামলার বাদী হতে হয়েছিল।’
হ্যারোর দুর্নীতি অনুসন্ধান থমকে:-
হ্যারো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আশরাফুল হুদা টিটো আওয়ামী জমানায় তখনকার মেয়র খায়রুজ্জামান লিটনকে নিজের বন্ধু বলে পরিচয় দিতেন। সব সময় বসে থাকতেন বিদ্যুৎ বিভাগেই। তার দাপটে তটস্থ থাকতেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। কাজ নিয়ে নিম্নমানের মালামাল সরবরাহ করতেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে রাসিক তাকে অতিরিক্ত বিলও পরিশোধ করত।
২০১৯ সালের শেষের দিকে নগরের ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ১৬টি ফ্লাডলাইট বসানোর কাজ পায় হ্যারো। ৯ কোটি ৭ লাখ ৭৭ হাজার ৭৭৭ টাকার এ কাজেই প্রায় ৭ কোটি টাকা অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করে রাসিক। পরে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযান চালিয়ে প্রকল্পের নথিপত্র জব্দও করে। কিন্তু দীর্ঘ দিনেও দুদকের অনুসন্ধান কার্যক্রম শেষ হয়নি। ফলে হ্যারোকে আরও অনেক কাজ দেওয়া হয়েছে রাসিকের বিদ্যুৎ বিভাগের।
২০২১ নালে প্রতিষ্ঠানটি নগরের বিলশিমলা থেকে কাশিয়াডাঙ্গা পর্যন্ত ৪ দশমিক ২ কিলোমিটার সড়কে ৫ কোটি ২২ লাখ টাকায় সড়কবাতি বসানোর কাজ পায়। নিম্নমানের কাজের কারণে স্থাপনের ৪৯ দিনের মাথায় ২০২১ সালের এপ্রিলে দমকা বাতাসে ১৭৪টি সড়কবাতির মধ্যে ৮৬টি কাত জয়ে পড়ে। এরপর ২০২২ সালে আবার তালাইমারী থেকে কল্পনা সিনেমা হলের মোড় (স্বচ্ছ টাওয়ার) পর্যন্ত চার লেন সড়কে ৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকায় সড়কবাতি বসানোর কাজ পায় হ্যারো। তখন সড়কের আইল্যান্ডে বসানো হয় ১৩০টি সড়কবাতির পোল। প্রতিটি খুঁটির মাথায় লাগানো হয় ১৩টি বাতি।
এ ছাড়া সড়কসংলগ্ন বাঁধে স্থাপন করা হয় ১৮০টি আধুনিক সুদৃশ্য গার্ডেন লাইটের খুঁটি। প্রতিটি খুঁটিতে আছে পাঁচটি অত্যাধুনিক বাতি। লাগানোর দুই মাস না যেতেই বাতিগুলো ঘোলা হয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত বাতি নষ্টও হচ্ছে। দুদকের সমন্বিত রাজশাহী জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক ফজলুল বারী বলেন, ১৬টি ফ্লাডলাইট বসানোর কাজে অনিয়মের বিষয়ে দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে অনুসন্ধান কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে অন্য কোনো বিষয়ে অনিয়মের কোনো খবর তাদের জানা নেই।