
দেশজুড়ে গ্যাস সংকটের চাপ যখন বাড়ছে, তখন নতুন সম্ভাবনার সন্ধানে আরও গভীরে নামছে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে প্রথমবারের মতো প্রায় ৫ হাজার ৬০০ মিটার গভীর পর্যন্ত কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গভীরতার প্রকল্প। এই কাজ বাস্তবায়ন করছে চীনা প্রতিষ্ঠান সিনোপেক কনট্র্যাক্টিং অ্যান্ড ড্রিলিং কোম্পানি লিমিটেড (সিসিডিসি)।
সোমবার (৪ মে) সরেজমিনে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে দেখা গেছে ব্যস্ত কর্মচাঞ্চল্য। বিশাল ড্রিলিং রিগ নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে, দেশি-বিদেশি প্রকৌশলী ও কর্মীদের সমন্বয়ে এগিয়ে চলছে খনন কার্যক্রম। যন্ত্রের শব্দ ও কম্পনে মাটির গভীরে চলছে সম্ভাবনার অনুসন্ধান।
বাংলাদেশে আগে সর্বোচ্চ প্রায় ৪ হাজার ৯০০ মিটার পর্যন্ত কূপ খনন করা হয়েছিল। এবার সেই সীমা অতিক্রম করে প্রায় ৫.৬ কিলোমিটার গভীরে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এত গভীরে বড় ধরনের গ্যাস মজুত থাকার সম্ভাবনা বেশি।
বিজিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী আব্দুল জলিল প্রামাণিক জানিয়েছেন, তিতাসের এই কূপ খনন শেষে একই রিগ দিয়ে বাখরাবাদেও আরেকটি কূপ খনন করা হবে। দুটি প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫৯৪ কোটি টাকা। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন হলে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাস পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে, যদিও চূড়ান্ত নিশ্চিত হতে খনন-পরবর্তী পরীক্ষা জরুরি।
দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা কাগজে প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট হলেও বাস্তবে তা প্রায় ৫০০ কোটির কাছাকাছি। অন্যদিকে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২৬০ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট। এর একটি বড় অংশ, প্রায় ৮০-৮৫ কোটি ঘনফুট, আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমে যাওয়ায় এই ঘাটতি আরও প্রকট হচ্ছে। নতুন গ্যাসের উৎস আবিষ্কৃত হলে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
তিতাস-৩১ নম্বর কূপ খননে মোট সময় ধরা হয়েছে ২১০ দিন। গত ১৯ এপ্রিল শুরু হওয়া এই প্রকল্পের প্রায় ২২ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। অন্যদিকে বাখরাবাদ-২১ কূপ খননে সময় লাগবে প্রায় ১৮০ দিন। খনন শেষে পরীক্ষার মাধ্যমে গ্যাসের উপস্থিতি ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা যাচাই করা হবে এবং উপযোগী হলে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তিতাসে ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৫ হাজার ৪০০ মিটার গভীরতার মধ্যে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এখানে চারটি সম্ভাব্য স্তর চিহ্নিত করা হয়েছে প্রথমটি প্রায় ৩ হাজার ৭৩৬ মিটার গভীরে এবং শেষটি ৫ হাজার ৩১৫ থেকে ৫ হাজার ৩৪৪ মিটারের মধ্যে। মাঝের স্তরগুলোও সমানভাবে সম্ভাবনাময়।
তবে গভীরতার সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়ে। ৩ হাজার ৭৫০ মিটার পেরোলেই উচ্চচাপের স্তরে প্রবেশ করতে হয়, যা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে পুরো প্রকল্প ব্যাহত হতে পারে। এ ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যবহৃত হচ্ছে ১৫ হাজার পিএসআই ক্ষমতাসম্পন্ন আধুনিক ব্লো-আউট প্রিভেন্টর, যা দেশের জন্য নতুন প্রযুক্তি।
কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রকল্প শুধু গ্যাস অনুসন্ধান নয়, বরং দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও বড় পদক্ষেপ। তিতাসের গভীরে কী মজুত আছে তা এখনো নিশ্চিত নয়, তবে প্রতিটি ধাপ অতিক্রমের সঙ্গে বাড়ছে প্রত্যাশা এই অনুসন্ধানই হয়তো জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।