স্বাদ, গুণগত মান ও ঐতিহ্যের অনন্য সমন্বয়ে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ফল হিসেবে পরিচিত মাগুরার লিচু। বিশেষ করে জেলার হাজরাপুর এলাকার লিচু ভৌগোলিক নির্দেশক (জি আই) পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার পর এর সুনাম ও চাহিদা আরও বেড়েছে দেশজুড়ে। চলতি মৌসুমে বাজারে উঠতে শুরু করেছে এই সুস্বাদু ফল। আর মৌসুমের শুরুতেই লিচু ঘিরে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে জেলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে।
কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় লিচুর ফলন মোটামুটি ভালো হয়েছে। কোথাও বাম্পার ফলন হয়েছে, আবার কিছু এলাকায় ফলন তুলনামূলক কম। তবে সামগ্রিকভাবে উৎপাদন সন্তোষজনক হওয়ায় খুশি বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা।
মাগুরা সদর উপজেলায় গড়ে উঠেছে তিন হাজারেরও বেশি বাণিজ্যিক লিচু বাগান। এসব বাগানকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। দেশি জাতের পাশাপাশি বোম্বাই ও চায়না-৩ জাতের লিচুর চাষও এখন ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বোম্বাই ও চায়না জাতের লিচুর আকার, স্বাদ ও সংরক্ষণ ক্ষমতা ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা আগাম বাগান কিনতে আসছেন।
লিচুর মৌসুমকে কেন্দ্র করে জেলার গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বাগান পরিচর্যা, আগাছা পরিষ্কার, গাছে ওষুধ প্রয়োগ, লিচু সংগ্রহ, ঝুড়ি ও প্যাকেট প্রস্তুত, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ—সবখানেই সৃষ্টি হয়েছে অস্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ। এতে উপকৃত হচ্ছেন নিম্নআয়ের বহু মানুষ।
স্থানীয় শ্রমিক মোছা. আলেয়া বেগম বলেন, লিচুর মৌসুমে প্রায় প্রতিদিনই কাজ পাই। এতে সংসারে কিছুটা স্বচ্ছলতা আসে। অন্য সময় এত কাজ পাওয়া যায় না।
বাগান মালিক মো. বিল্লাল হোসেন বলেন, এ বছর গাছে লিচু ভালো এসেছে। শুরুতেই বাজারে দামও মোটামুটি ভালো। যদি শেষ পর্যন্ত ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায়, তাহলে লাভবান হওয়া সম্ভব হবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও বলছেন, মৌসুমের শুরুতেই বাজারে আগাম লিচুর চাহিদা ভালো রয়েছে। বর্তমানে দেশি লিচু প্রতি শত ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। উন্নত জাতের লিচুর দাম আরও বেশি। ফলে কৃষকদের মধ্যে স্বস্তি বিরাজ করছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে শুধু মাগুরা সদর উপজেলাতেই ৫৩১ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এ বছর প্রায় ৮৫ কোটি টাকার লিচু বাণিজ্যের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাগুরা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা বলেন, এ বছর লিচুর উৎপাদন মোটামুটি ভালো হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় রোগবালাইও তুলনামূলক কম ছিল। সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে চাষিরা আরও লাভবান হবেন।
তিনি আরও বলেন, মাগুরার লিচুর সুনাম দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে। জি আই স্বীকৃতি পাওয়ার পর এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও আরও বেড়েছে। সবমিলিয়ে, উৎপাদনে কিছুটা কম-বেশি থাকলেও বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকায় আশাবাদী চাষি ও ব্যবসায়ীরা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনা ও পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে চলতি মৌসুমে মাগুরার লিচু শিল্প নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।