কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মঙ্গলবাড়িয়ার লিচু এখন শুধু একটি মৌসুমি ফল নয়, এটি পুরো অঞ্চলের পরিচিতি ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। টসটসে রসালো শাঁস, ছোট বিচি, মধুর মতো মিষ্টি স্বাদ ও অনন্য ঘ্রাণের কারণে দেশজুড়ে ব্যাপক খ্যাতি পেয়েছে এ লিচু। চলতি মৌসুমে প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার লিচু বিক্রির আশা করছে কৃষি বিভাগ। একই সঙ্গে মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর জন্য ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতির আবেদন করার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
বছরের এই সময়টায় মঙ্গলবাড়িয়া গ্রাম যেন এক উৎসবের জনপদে পরিণত হয়। গাছে গাছে ঝুলে থাকা পাকা লিচুর লাল আভা আর মিষ্টি সুবাসে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন ক্রেতা, ব্যবসায়ী ও দর্শনার্থীরা। কেউ পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসছেন, কেউ কিনছেন পছন্দের লিচু, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন এ অঞ্চলের সৌন্দর্য।
মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে সারি সারি লিচুগাছ। বাড়ির উঠান, রাস্তার পাশ, পুকুরপাড় ও জমির আইলজুড়ে লিচুর সমারোহ। কোথাও গোলাপি আভা, কোথাও গাঢ় লাল হয়ে আছে থোকা থোকা লিচু। অনেক গাছের ডাল লিচুর ভারে নুয়ে পড়েছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শ্রমিক ও বাগান মালিকরা লিচু সংগ্রহ, পরিচর্যা ও বিক্রিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
বর্তমানে আকার ও মানভেদে প্রতি ১০০ লিচু বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। বিশেষ কিছু বড় আকারের লিচুর দাম আরও বেশি। বাজারে নেওয়ার আগেই অনেক বাগানের লিচু বিক্রি হয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন চাষিরা।
স্থানীয়দের দাবি, মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর ইতিহাস প্রায় ২২৫ বছরের পুরোনো। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে তারা জেনেছেন, ১৮০২ সালের দিকে গ্রামের এক ব্যক্তি চীন থেকে দুটি লিচুর চারা এনে এখানে রোপণ করেছিলেন। পরবর্তীতে সেই গাছ থেকেই বিস্তার লাভ করে বিখ্যাত এই লিচুর জাত। বর্তমানে মঙ্গলবাড়িয়া ছাড়াও আশপাশের কুমারপুর, নারান্দী ও হোসেন্দী গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এ লিচুর চাষ।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, পুরো এলাকায় বর্তমানে প্রায় ১০ হাজারের বেশি লিচুগাছ রয়েছে। সরাসরি ও পরোক্ষভাবে কয়েক হাজার পরিবার লিচু চাষ, পরিচর্যা, সংগ্রহ, পরিবহন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত। শুধু মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামেই প্রায় ২০০ পরিবার বাণিজ্যিকভাবে লিচু চাষ করছেন।
পাকুন্দিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূর-ই-আলম বলেন, ‘মঙ্গলবাড়িয়ার লিচু সারা দেশেই একটি জনপ্রিয় ও সুস্বাদু লিচুর জাত হিসেবে পরিচিত। এর স্বাদ, ঘ্রাণ ও মান অন্য এলাকার লিচু থেকে আলাদা। এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন অত্যন্ত ভালো হয়েছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার লিচু বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা বিবেচনায় আমরা এ লিচুর জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) স্বীকৃতির আবেদন করার বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। জিআই স্বীকৃতি পেলে এ অঞ্চলের লিচুর ব্র্যান্ড মূল্য আরও বাড়বে এবং চাষিরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবেন।’
পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রূপম দাস বলেন, ‘মঙ্গলবাড়িয়ার লিচু এখন একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। আমরা চাই দেশের বিভিন্ন জায়গায় এর পরিচিতি আরও ছড়িয়ে পড়ুক এবং চাষিরাও ন্যায্যমূল্য পাক।’