দীর্ঘপথ হাঁটানোর আগে উটকে লবণ খাওয়ানো হয় কেন?
চারপাশে ধু-ধু মরুভূমি, মাথার ওপর গনগণে সূর্য আর পায়ের নিচে তপ্ত বালি। এমন চরম প্রতিকূল পরিবেশেও অনায়াসে মাইলের পয় মাইল পাড়ি দিতে পারে যে প্রাণীটি সেটি হলো ‘মরুভূমির জাহাজ’ নামে পরিচিত পশু উট। দিনের পর দিন পানি ছাড়া বেঁচে থাকা, পিঠে ভারী বোঝা নিয়ে চলা, মরুর ঝড় আর আবহাওয়াকে উপেক্ষা করার অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে এদের।
তবে মরুভূমিতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার আগে উটকে অদ্ভুত এক জিনিস খাওয়ান মরুবাসীরা। যাত্রার ঠিক আগে অনেকটা জোর করে তাদেরকে প্রচুর পরিমাণ লবণ খাওয়ানো হয়। আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টি অদ্ভুত আর অবৈজ্ঞানিক মনে হতে পারে। কারণ আমরা জানি অতিরিক্ত লবণ খেলে শরীর দ্রুত ডিহাইড্রেট হয়ে পড়ে। কিন্তু উটের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আলাদা। তাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ জীববিজ্ঞান বা ‘বায়োলজিক্যাল মেকানিজম’ সম্পূর্ণ আলাদা। আর এর নেপথ্যে লুকিয়ে আছে এক অবিশ্বাস্য বিজ্ঞান।
উটকে লবণ খাওয়ালে কী হয়?
মরুভূমির দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় উটের শরীরে তরল পদার্থের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং পানি ধরে রাখতে ম্যাজিকের মতো কাজ করে লবণ। যাত্রার আগে লবণ খাওয়ানো হলে উটের তৃষ্ণা বহুগুণ বেড়ে যায়। ফলে মরুভূমিতে প্রবেশের আগেই উট একবারে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করে তা নিজের শরীরে মজুত করে নেয়। মরুভূমির তীব্র গরমে হাঁটার সময় উটের শরীর থেকে ঘাম বাষ্প হয়ে বেরিয়ে যায়। সেসময় লবণ শরীরে ‘ইলেক্ট্রোলাইট’ (Electrolyte Balance) বা খনিজের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। ফলে এরা সহজে ক্লান্ত হয় না।
অনেকেই মনে করেন, উট তাদের পিঠের কুঁজে (Hump) পানি জমিয়ে রাখে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান ও প্রাণিবিজ্ঞান বলছে এটি সম্পূর্ণ একটি ভুল ধারণা বা মিথ। উটের কুঁজে আসলে পানি থাকে না, সেখানে জমা থাকে প্রচুর চর্বি বা ফ্যাট। মরুভূমিতে যখন দীর্ঘদিন খাবার মেলে না, তখন উট তার স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে এই চর্বি গলিয়ে তা থেকে শক্তি এবং মেটাবলিক পানি তৈরি করে বেঁচে থাকে। পানি ধরে রাখা এবং মরুভূমিতে টিকে থাকার জন্য উটের শরীরে আরও কিছু অবিশ্বাস্য মেকানিজম রয়েছে।
১. ডিম্বাকৃতি রক্তকণিকা (Oval-shaped Red Blood Cells):
মানুষের রক্তকণিকা গোল হলেও উটের রক্তকণিকা হয় ডিম্বাকৃতির। পানিশূন্যতার কারণে রক্ত যখন খুব ঘন হয়ে যায়, তখনও এই বিশেষ আকারের জন্য উটের রক্তনালীতে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকে। অন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ক্ষেত্রে এটি অসম্ভব।
২. কিডনি ও নাসারন্ধ্র:
উটের কিডনি অত্যন্ত শক্তিশালী হয়। এটি শরীর থেকে পানির অপচয় প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনে। এদের নাসারন্ধ্র বা নাকের ছিদ্র এমন ভাবে তৈরি, যা নিঃশ্বাস ছাড়ার সময়ও শরীরের আর্দ্রতা বা জলীয় বাষ্প বাতাসে উড়ে যেতে দেয় না।
৩. শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ:
পরিবেশের সঙ্গে উটের শরীরের তাপমাত্রা ওঠানামা করতে পারে। ফলে তীব্র গরমেও এরা সহজে ঘামায় না, যা পানি সংরক্ষণে দারুণ সাহায্য করে।
আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার মরু অঞ্চলের মানুষ শত শত বছর ধরে বাণিজ্য, যাতায়াত এবং বেঁচে থাকার জন্য উটের ওপর নির্ভরশীল। কোনো ল্যাবরেটরি বা আধুনিক বিজ্ঞান ছাড়াই, কেবল প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে উটকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেই মরুবাসীরা লবণ খাওয়ানোর এই কৌশল আয়ত্ত করেছিলেন। প্রাণিটির শরীরের গঠন বুঝে যাত্রার আগে লবণ খাওয়ানোর এই ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি আজও মরুভূমির কঠিনতম পরিস্থিতিতে উটদের সুরক্ষিত রাখে।