Template: 3
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
অনলাইন ডেস্ক | ১৯ মে ২০২৬
bijoybangla.news
logo
বিজয় বাংলা নিউজ
জাতীয় দৈনিক

বাংলাদেশের নীরব পরাগসংকট, বিষাক্ত কীটনাশক ও পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে রাজশাহীতে নীতি আলোচনা ও সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত

নিজস্ব প্রতিবেদক : Bangladesh's silent pollen crisis, toxic pesticides and environmental disaster

বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান কীটনাশক ব্যবহার, মৌপতঙ্গের মৃত্যু, প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংস এবং পরিবেশগত বিপর্যয় নিয়ে আজ রাজশাহীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি আলোচনা ও সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুষ্ঠানের মূল প্রতিপাদ্য ছিল-“বাংলাদেশের নীরব পরাগসংকট: কীটনাশকনির্ভর কৃষি, মৌপতঙ্গের মৃত্যু ও পরিবেশগত বিপর্যয়”।

আজ মঙ্গলবার ( ১৯ মে ২০২৬) রাজশাহী নগরির এসকে ফুড সেমিনার হলে উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক ( ইঅজঈওক) ও গ্রিন কোয়ালিশন-রাজশাহীর যৌথ আয়োজনে বাংলাদেশের নীরব পরাগসংকট, বিষাক্ত কীটনাশক ও পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে রাজশাহীতে নীতি আলোচনা ও সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশগ্রহণ করেন দেশের বিশিষ্ট পরিবেশ ও প্রাণীবিজ্ঞানী, কৃষি গবেষক, মানবাধিকার কর্মী, মৌচাষী এবং মাঠ পর্যায়ের কৃষক প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে তাদের দাবি এবং বক্তব্য তুলে ধরেন। এতে শুরুতে গ্রিন কোয়ালিশন রাজশাহীর এর সভাপতি নদী ও পরিবেশ গবেষক মাহবুব সিদ্দিকীর শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন। পরে  “বাংলাদেশের নীরব পরাগসংকট, বিষাক্ত কীটনাশক ও পরিবেশ বিপর্যয়: বরেন্দ্র অঞ্চলে কীটনাশক জনিত পরাগগায়নকারী পতঙ্গের হ্রাস ও পরিবেশ অবক্ষয়-বহুপ্রজাতিক সংকট, কৃষি-রাসায়নিককীরণ” বিষয়ে নীতিপত্র উপস্থাপন করেন বারসিক এর গবেষক ও আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো: শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন- এগ্রোইকোলজি চর্চা বাড়লে বহুপ্রজাতিক সংকট এবং পতঙ্গবাহী বা মৌপতঙ্গ বিলুপ্তী থেকে রক্ষা পাবে। একইসাথে আঞ্চলিকভাবে খাদ্য সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা পাবে। জাতীয়ভাবে মৌপতঙ্গ বা পরাগায়ন সুরক্ষা নীতিমালা তৈরীর দাবি জানান তিনি।

 নীত আলোচনা ও সংবাদ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীগণ জানান, আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় থাকা ডাল, তৈলবীজ যেমন সরিষা, শাকসবজি এবং সিংহভাগ ফলমূলের উৎপাদন সরাসরি প্রাকৃতিক পরাগায়নের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু মাঠের পর মাঠ তীব্র বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে এই মৌপতঙ্গগুলোর স্নায়ুতন্ত্র ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। একই সাথে, আগাছানাশক ব্যবহারের ফলে মাঠের আইল বা রাস্তার ধারের বন্য ফুল ও ঝোপঝাড় ধ্বংস হওয়ায় এই জীবগুলো তাদের খাদ্য ও চিরচেনা বাসস্থান হারাচ্ছে। এর ফলে স্থানীয় জাতের ফসলের প্রাকৃতিক বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে এবং কৃষক তার নিজস্ব সনাতনী বীজ ব্যবস্থা হারিয়ে বহুজাতিক কোম্পানির হাইব্রিড বীজ ও দামি কেমিক্যালের চক্রে বন্দি হয়ে পড়ছে, যা সরাসরি দেশের খাদ্য সার্বভৌমত্বের ওপর বড় আঘাত। নীরব সংকট মোকাবিলায় ক্ষতিকর কীটনাশক নিষিদ্ধ করা, পরিবেশবান্ধব কৃষি বা এগ্রোইকোলজি জাতীয়ভাবে প্রবর্তন করাসহ  পরাগায়নকারী পতঙ্গ সুরক্ষায় জাতীয় নীতিমালার ও সুনিদিষ্ট তথ্য সংরক্ষণে গবেষনার দাবি করা হয়।

প্রাণী বিজ্ঞানী ড. বিধান চন্দ্র দাস বলেন- বিশ্বে আমাদের প্রকৃতিতে প্রায় বিশ হাজার প্রজাতির মৌপতঙ্গ নথিভুক্ত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে কোন কোন মৌপতঙ্গ বিলুপ্ত হলো বা কি ধরনের সংকটে আছে, তা নিয়ে কোন সঠিক গবেষণা বা নথিভুক্তকরণ নেই। তিনি এতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে গবেষণার দাবি করেন এবং মৌপতঙ্গ সুরক্ষায় জাতীয় নীতিমালাসহ প্রাকৃতিক পরিবেশ সুরক্ষা ও অতিরিক্ত ক্ষতিকর কীটনাশক বন্ধের দাবি করেন, তা না হলে বাস্তুতাত্ত্বিক এক মাহাসংকটে পড়তে হবে ভবিষ্যতে।

রাজশাহী মৌচাষী মো: শফিকুল ইসলাম বাবু বলেন-দিনে দিনে তীব্র তাপদাহ বাড়ছে, বরেন্দ্র অঞ্চলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং উঠা-নাম করে মারাত্বকভাবে, এফর ফলে মৌমাছির সমস্যা হয়। তিনি আরো বলেন- মৌমাছির আদর্শ তাপমাত্রা ৩৩ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর উপরে গেলে মাছি মরে যায়, উৎপাদনও কম হয় বা অনেক সময় মরে যায়।

রাজশাহীর দরগা পাড়ার আরেক মৌচাষি মো: শফিকুল ইসরাম রঞ্জু বলেন- পবা উপজেলায় মধু সংগ্রহকালে বক্স স্থাপন করলে আমার ১২০ টি বক্সের মৌমাছি মরে যায় কীটনাশকের কারনে। তিনি আরো বরেন- সবজি খেতে কীটনাশক দেয়ায় আমার অজান্তেই মৌমাছিগুলো মারা যায়।

পবা উপজেরার কৃষক মো: মিজানুর রহমান বলেন- আমাদের অনেক ফসল এখন টাকা খরচ করে নিজেরা পরাগায়ন করতে হয়, যেমন পেয়াজের বজি করতে, কুমড়ো ফুলে এরকম। কিন্তু একসময় অনেক বোমর, মৌমাছি, মাছি ছিলো, এগুলোই পরাগায়নের কাজ করতো। এখন এই ভোমর , পতঙ্গগুলো দেখা যায়। তিনি কারন হিসেবে বলেন- অতিরিক্ত কীটনাশক এবং দেশি গাছপালা না থাকার কারনে এসব মৌপতঙ্গ বিলিন হয়ে যাচ্ছে। কৃষাণী সুলতানা খাতুন বলেন-আমাদের আর আগের মতো কীটপতঙ্গ দেখতে পাইনা,কালো ভোমরা হারিয়ে গেছে, আর দেখাা যায়না।

নীতি আলোচনায় মাধ্যমিক তথ্য বিশ্লেষণ করে বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি আতিকুর রহমান আতিক বলেন- কৃষিতে ব্যবহৃত বহু কীটনাশক পরাগবাহী পতঙ্গের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিশেষত ফুল ফোটার সময় নির্বিচারে কীটনাশক স্প্রে করার ফলে মৌপতঙ্গ সরাসরি বিষক্রিয়ার শিকার হচ্ছে। এই সংকটকে শুধুমাত্র কৃষি উৎপাদনের প্রশ্ন হিসেবে দেখলে হবে না; এটি একটি বৃহত্তর পরিবেশগত, বহুজীবিক এবং রাজনৈতিক বাস্তুতাত্ত্বিক সংকট হিসেবে দেখতে হবে।

নীতি আলোচনা ও সংবাদ সম্মেলন  থেকে নিম্নোক্ত সুপারিশসমূহ তুলে ধরা হয়ঃ

১. উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ও নিষিদ্ধ কীটনাশকের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে;

২. জাতীয় পরাগায়ণকারী সুরক্ষা নীতি প্রণয়ন করতে হবে;

৩. এগ্রোইকোলজি ও পরিবেশবান্ধব কৃষির প্রসার ঘটাতে হবে;

৪. বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য বিশেষ পরিবেশগত সুরক্ষা কর্মসূচি নিতে হবে;

৫. কৃষকদের নিরাপদ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংবেদনশীল কৃষি বিষয়ে তাদের নিজস্ব মতামতগুলো গুলো নিতে হবে;

৬. পরাগবাহী পতঙ্গ ও প্রাণবৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণের জন্য জাতীয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে;

৭. গবেষণা, গণমাধ্যম ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পরাগবাহী সংকট-কে গুরুত্ব দিতে হবে।


© বিজয় বাংলা নিউজ
bijoybangla.news