ইয়াছিন ইবনে ফিরোজ
বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ। উঁচু পাহাড়ে ঘেরা সবুজ কক্সবাজার। তারই ছায়া সুনিবিড় গ্রাম দরিয়ানগর। গ্রামের একদিকে সারি সারি ঝাউবন, অন্যদিকে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা পাহাড়ি ঝরনা। এই দরিয়ানগরের বাতাস সব সময় সমুদ্রের নোনা গন্ধে আর পাহাড়ের স্নিগ্ধতায় ভরে থাকে। গ্রামের সবচেয়ে সুন্দর দিকটি হলো, এখানকার মানুষের সহজ-সরল জীবন আর পরম করুণাময় আল্লাহর প্রতি অবিচল ঈমান।
ভোররাতে যখন সমুদ্রের গর্জন ছাড়া আর কোনো শব্দ থাকে না, ঠিক তখনই দরিয়ানগরের বাঁশঝাড়ের পাশের পুরোনো মসজিদ থেকে ভেসে আসে ফজরের আজান। সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দের সাথে মুয়াজ্জিনের সেই সুমধুর কণ্ঠ মিলেমিশে স্বর্গীয় পরিবেশের সৃষ্টি করে। গ্রামের জেলেরা সাগরে জাল ফেলার আগে ওজু করে মসজিদে ছুটে যায়। নামাজ শেষে আল্লাহর কাছে রিজিক চেয়ে তবেই তারা নৌকায় পা রাখে।
দরিয়ানগর গ্রামেই বাস করতো সাত বছর বয়সী উমর। উমরের বাবা গত হয়েছেন বেশ কয়েক বছর আগে, এক ভয়াল সামুদ্রিক ঝড়ে। সেই থেকে উমর আর তার মা আমিনার ছোট্ট একটি পৃথিবী।
উমরের মা দিনরাত কাজ করতেন কিন্তু ছেলের মুখের দিকে তাকালেই তার সব ক্লান্তি কোথায় যেন জাদুর মতো মিলিয়ে যেত। উমর ছেলেটা ভারী মিষ্টি হলেও কী হবে রাতের বেলা তার বড্ড ভয়! অন্ধকার নামলেই মনে হতো, জানালার বাইরে বুঝি কোনো ছায়া দাঁড়িয়ে আছে কিংবা খাটের নিচে লুকিয়ে আছে কোনো দৈত্য। ভয়ে সে কুঁকড়ে যেত। মা তখন নিজের সব কাজ ফেলে ছুটে আসতেন। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে চুলে বিলি কেটে শোনাতেন রূপকথার গল্প। মায়ের গন্ধ আর ওমে উমরের সব ভয় নিমেষেই পালিয়ে যেত।
শীতকাল ঘনিয়ে আসছে। উত্তরের হিমেল হাওয়া বইতে শুরু করেছে। উমরের মা একদিন নিজের সবচেয়ে প্রিয় আর রঙিন পুরোনো শাড়িগুলো বের করলেন। সুতো দিয়ে যত্ন করে সেলাই করতে বসলেন একটা নকশিকাঁথা।
দিনের আলোয় ঘরের কাজ সেরে, রাতের নিভু নিভু প্রদীপের আলোয় মা কাঁথা সেলাই করতেন। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। একদিন রাতে উমর ঘুম থেকে উঠে দেখলো, মা তখনো সেলাই করছেন। উমর চোখ মুছতে মুছতে জিজ্ঞেস করলো, ‘মা, তুমি ঘুমাওনি? কী বানাচ্ছো এত রাত জেগে?’ মা স্নেহভরা হাসি হেসে তার কপালে চুমু খেলেন। বললেন, ‘তোর জন্য একটা জাদুর কাঁথা বানাচ্ছি বাবা। এই কাঁথার প্রতিটি সুতোয় আমি আমার সাহস, আমার আদর আর আমার ঘুমপাড়ানির গান বুনে দিচ্ছি। এই কাঁথা গায়ে জড়ালে পৃথিবীর কোনো ভয়, কোনো দৈত্য তোকে ছুঁতে পারবে না।’
কয়েকদিন পর জাদুর কাঁথা তৈরি হলো। লাল, নীল, হলুদ সুতোয় বোনা কী অপূর্ব এক কাঁথা! সেদিন রাতে উমর যখন জাদুর কাঁথা গায়ে দিয়ে শুলো, তার মনে হলো ভারী অদ্ভুত এক শান্তি। অন্ধকারেও তার আর একটুও ভয় করলো না। তার মনে হলো, কাঁথাটা যেন ঠিক মায়ের দুই হাতের মতো তাকে শক্ত করে জড়িয়ে আছে। জাদুর কাঁথার জাদুতে উমর রোজ রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতো।
একদিন রাতে গ্রামে প্রচণ্ড ঝড় উঠলো। হু হু বাতাস আর বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ। এমন সময় উমর জানালার বাইরে একটা শব্দ শুনতে পেল। উঁকি দিয়ে দেখলো, ছোট্ট একটা কুকুরের ছানা শীতে আর ভয়ে বারান্দার এক কোণে থরথর করে কাঁপছে। উমরের খুব মায়া হলো। সে ভাবল, আমার তো জাদুর কাঁথা আছে, কিন্তু ওর তো কেউ নেই! উমর চুপিচুপি দরজা খুলে কুকুর ছানাটাকে ঘরের ভেতরে এনে নিজের সেই প্রিয় জাদুর কাঁথাটা নিয়ে ভালো করে পেঁচিয়ে দিলো। ছানাটা ওম পেয়ে একটু পরেই শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লো।
খালি গায়ে উমরের হঠাৎ খুব শীত করতে লাগলো। বাইরে মেঘের বিকট গর্জনে তার বুক কেঁপে উঠলো। এখন জাদুর কাঁথা তো তার গায়ে নেই! আজ তাকে কে বাঁচাবে? ভয়ে সে যখন প্রায় কেঁদেই ফেলবে, ঠিক তখনই অন্ধকারে একটি হাত তাকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরলো। মা! মা তাকে নিজের বুকের ভেতর টেনে নিলেন। নিজের আঁচল দিয়ে ঢেকে দিলেন ছেলেকে। মায়ের বুকের সেই উষ্ণতায় তার সব শীত, সব ভয়, সব কান্না এক মুহূর্তে কোথায় যেন উধাও হয়ে গেল! উমর অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকালো। বলল, ‘মা, আমার কাছে তো জাদুর কাঁথা নেই, তবু তো আমার একটুও ভয় করছে না! তোমার কাছে কি আরও বড় কোনো জাদু আছে?’
মা হাসলেন। অন্ধকারেও মায়ের সেই হাসি যেন তারার মতো জ্বলজ্বল করে উঠলো। মা বললেন, ‘বোকা ছেলে! জাদু তো কাঁথায় ছিল না। জাদু ছিল মায়ের ভালোবাসায়। তুই যখনই ভয় পাবি, শুধু মনে করবি মা তোর সাথেই আছে। দেখবি, সব ভয় পালিয়ে গেছে। সেই ঝড়ের রাতে ছোট্ট উমর জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যিটা শিখেছিল। সে জেনেছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আর জাদুকরী জায়গা হলো মায়ের কোল। আর পৃথিবীর সব মায়ের আঁচলেই লুকানো থাকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাদু, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
সূত্র : জাগোনিউজ