
৪ মে ভারতের মেহসানা জেলার একটি সরকারি হাসপাতাল থেকে পুলিশকে জানানো হয়, একজন যুবক হাসপাতালের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহের প্রাথমিক তদন্ত করে। তখন ওই ব্যক্তির পকেট থেকে একটি কাগজ উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীটি।
ওই কাগজে আত্মহত্যাকারী ব্যক্তি লিখে গেছেন, তিনি তার স্ত্রী ও মেয়েকে হত্যা করেছেন। স্থানীয় পুলিশের ভাষ্য, ওই ব্যক্তি চিঠিতে লিখেছেন যে প্রায় সাত মাস আগে তিনি তার স্ত্রী ও দুই বছর বয়সী মেয়েকে হত্যা করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি সেই বাড়ির কথাও উল্লেখ করেন, যেখানে তাদের মরদেহ পুঁতে রাখা হয়েছে।
পরদিন পুলিশ একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে সঙ্গে নিয়ে ওই বাড়িতে যায় এবং বাড়ির নির্দিষ্ট স্থানের মাটি খুঁড়ে মা ও মেয়ের মরদেহ খুঁজে পায়। পুলিশের দাবি, স্বামী প্রায় সাত মাস আগে স্ত্রী ও মেয়েকে হত্যা করে নিজ বাড়িতেই পুঁতে রাখেন।
ঘটনাটির সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, ‘হত্যাকাণ্ডের পর ওই ব্যক্তি তার আরেক মেয়েকে নিয়ে একই বাড়িতে গত সাত মাস বসবাস করেছেন। এমনকি যেখানে মরদেহ পুঁতে রাখা হয়েছিল, সেখানে বসেই তিনি নিয়মিত খাওয়া-দাওয়া করতেন।’
ছাদ থেকে লাফ দেওয়া ওই ব্যক্তির নাম গিরিশ এবং তার বয়স ৩০ বছর। আর তার স্ত্রীর বয়স ছিল ২৯ বছর, নাম প্রিয়াঙ্কা। তাদের নিহত মেয়ের নাম পরী। প্রায় দুই ঘণ্টা অনুসন্ধান চালিয়ে মা ও মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, স্ত্রী ও মেয়েকে হত্যার পর গিরিশ প্রথমে তাদের মরদেহ মাটিচাপা দেন, এরপর মাটির ওপরে সিমেন্টের প্লাস্টার করে দেন।
প্রেমের বিয়ে, শুরুতে পরিবারের আপত্তি
মর্মান্তিক ওই ঘটনাটি ঘটেছে মেহসানা জেলার শাহপুর গ্রামের একেবারে শেষপ্রান্তের এলাকায়।
যে বাড়িতে পরিবারটি থাকতো, তার ত্রিসীমানায় আর কোনো বাড়ি ছিল না।
পুলিশের ভাষ্য, চার বছর আগে গিরিশ নিজের পছন্দের মেয়ে প্রিয়াঙ্কাকে কোর্ট ম্যারেজ করেছিলেন। তারা একসময় সহপাঠী ছিলেন। সেখান থেকেই তাদের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
পরিবারের সদস্যরা বলছে, শুরুতে দুই পরিবারের কেউই বিয়েটি মেনে না নিলেও পরে মেনে নেয়। গিরিশ স্থানীয় একটি কারখানার ডায়মন্ড পলিশ বিভাগে কাজ করতেন।
বিয়ের পর প্রিয়াঙ্কাও স্থানীয় একটি হাসপাতালে চাকরি শুরু করেন। আর গিরিশের মা তাদের সঙ্গেই থাকতেন। কিন্তু বিয়ের এক বছরের মাথায় তিনি মারা যান। এর এক বছর পর গিরিশ ও প্রিয়াঙ্কার যমজ কন্যাসন্তান জন্ম নেয়।
আর্থিক সংকট ও দাম্পত্য কলহ
প্রিয়াঙ্কার দাদা রমনভাই যোগী বলেন, ‘আমার নাতনি প্রিয়াঙ্কা আমার কাছেই বড় হয়েছে। যখন সে গিরিশকে কোর্ট ম্যারেজ করে, তখন আমরা চিন্তায় পড়েছিলাম। পরে অবশ্য আমরা বিষয়টি মেনে নেই।’
রমনভাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, গিরিশের মা বেঁচে থাকা পর্যন্ত তাদের মাঝে তেমন কোনো সমস্যা ছিল না। তবে যমজ কন্যাসন্তান জন্মের পর থেকেই তাদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ শুরু হয়।
পরিবার জানিয়েছে, মেয়েদের জন্মের পর প্রিয়াঙ্কা চাকরি ছেড়ে দেন। অন্যদিকে, দিন দিন সংসারের খরচও বাড়তে থাকে। আর সেখান থেকেই শুরু হয় দ্বন্দ্ব।
রমনভাই জানান, ওই সময়ে দুই পরিবারই গিরিশ ও প্রিয়াঙ্কাকে আর্থিকভাবে সহায়তা করতো। আমরা ব্যবসার জন্য গিরিশ ও প্রিয়াঙ্কাকে টাকা পাঠিয়ে সাহায্য করতাম। কিন্তু মেয়েদের জন্মের পর গিরিশ প্রিয়াঙ্কাকে নানা কথা শুনাতো। তখন থেকেই পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকে।
তার দাবি, প্রিয়াঙ্কা প্রায়ই ফোন করে নিজের সমস্যার কথা জানাতেন।
রমনভাই জানান, ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে সে আমাকে শেষবার ফোন করেছিল। এরপর থেকে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
পুলিশ জানিয়েছে, পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর গিরিশ ফোন করে প্রিয়াঙ্কার দাদাকে জানান, প্রিয়াঙ্কা তার মেয়ে পরীকে নিয়ে কোথাও চলে গেছেন। এই দম্পতির অন্য যমজ মেয়ে চাহাত তখন গিরিশের কাছেই ছিল।
রমনভাই বলেন, খবর পেয়ে তিনি গিরিশের বাড়িতে যান এবং গিরিশকে থানায় অভিযোগ করতে বলেন। কিন্তু গিরিশ বিষয়টি এড়িয়ে যেতে থাকেন।
তার ভাষায়, ‘গিরিশ নানা অজুহাত দিতো। বলতো, প্রিয়াঙ্কা কয়েক দিনের মধ্যেই ফিরে আসবে। এমনও বলেছিল, এর আগেও এমন হয়েছে। তার এসব কথাবার্তা শুনে আমার সন্দেহ হচ্ছিল যে কিছু একটা ঠিক নেই।’
যদিও এই সময়ের মধ্যে প্রিয়াঙ্কার পরিবারের কেউ পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি।
এর প্রায় সাত মাস পর গত ২৮ এপ্রিল প্রিয়াঙ্কার দাদা তার নাতনি ও নাতনির মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে থানায় অভিযোগ করেন।
স্থানীয় পুলিশ জানায়, অভিযোগ পাওয়ার পর গিরিশকে দুইবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়।
গিরিশ কাজে গেলে তার মেয়ে চাহাতকে নিজের বোনের বাসায় রেখে যেতেন। এজন্য গিরিশের বোনকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়েছিল বলে জানায় পুলিশ।
স্থানীয় থানার পুলিশ পরিদর্শক এম এন দাভে বলেন, ‘ঘটনাটি নিয়ে আমাদের সন্দেহ হয়েছিল। তাই আমরা গিরিশকে বলেছিলাম, তদন্তের জন্য তার বোনকে সঙ্গে আনতে। কিন্তু বোনকে নিয়ে থানায় আসার আগেই সে হাসপাতালের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করে।’
পুলিশ জানিয়েছে, প্রায় চার ফুট গভীর থেকে উদ্ধার করা হাড়ের নমুনা বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে, সেগুলো গিরিশের স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা ও মেয়ে পরীর-ই মরদেহের অবশিষ্টাংশ। পরে তাদের শেষকৃত্যের জন্য সেগুলো প্রিয়াঙ্কার দাদা রমনভাইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সূত্র: বিবিসি বাংলা।
এসআইএল/বিবিএন