কমবেশি সাড়ে চার মণ মাংস হবে এমন একটি গরুর দাম এক লাখ ৮০ হাজার টাকা চাচ্ছেন বিক্রেতা আবু হোসেন। ক্রেতা অনেক কথার পরে শেষে দাম বললেন, ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এরপর বিক্রেতার সাফ জবাব, ‘এ দামে খামার থেকে আরও ছোট গরুও কিনতে পারিনি।’
পাশে সাড়ে তিন থেকে চার মণ মাংস হবে এমন কয়েকটি গরু দেখিয়ে আবু হোসেন ওই ক্রেতাকে বললেন, ‘আরও কিছু বাড়াতে পারলে ওইগুলোর একটা নেন। এগুলোও আমার। ভালো হবে।’
ক্রেতা কিছুটা বিরক্তি নিয়ে পাশ কেটে চলে গেলেন। এরপর কথা হলো ওই ক্রেতার সঙ্গে। তিনি জানালেন, বাজেটের মধ্যে গরু মেলাতে পারছেন না তিনি। প্রতিটি গরুর দাম গত বছরের চেয়ে প্রায় ২০ হাজার টাকা বেশি মনে হচ্ছে।
আরও কয়েকজন ভাগে পশু কোরবানির জন্য একসঙ্গে এসেছেন রাজধানীর খিলগাঁও চৌধুরীপাড়া এলাকা থেকে। তারাও বললেন, দুই লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে গত বছর তারা প্রায় ছয় মণ মাংসের গরু কিনেছিলেন। এবার ওই ধরনের গরুর দাম আড়াই লাখ টাকার ওপরে চাইছেন বিক্রেতারা।
এসব চিত্র রাজধানীর শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনি সংলগ্ন মৈত্রী সংঘ মাঠ ও আশপাশের খালি জায়গায় বসা অস্থায়ী পশুর হাটের।
প্রতিবছরের মতো এবারও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অনুমোদিত এই হাটে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত ট্রাকে করে গরু ও ছাগল এসেছে। তবে সেখানে অধিকাংশ ক্রেতার দাবি, শুরুতে পশুর দাম বেশি।
এদিকে ওই হাটে প্রায় ১০ হাজারের মতো পশু আমদানি হয়েছে বলে জানিয়েছেন হাট ইজারাপাওয়া প্রতিষ্ঠানের লোকজন। তবে ঈদের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকলেও হাটের কেনাবেচায় এখনো পুরোপুরি গতি আসেনি। যে কারণে বিক্রেতারা কিছুটা হতাশ। যদিও তারা মনে করছেন, ঈদের মূল বেচাকেনা হবে মঙ্গলবার ও বুধবার।
বিক্রেতারা বলছেন, গোখাদ্যের বাড়তি দামের কারণে খামারেই এবার পশুর দাম কিছুটা বেশি। সে হিসেবে প্রত্যাশিত দামে পশু বিক্রি করতে পারছেন না তারা। আর ক্রেতাদের অভিযোগ, ব্যাপারিরা শুরুতেই আকাশচুম্বী দাম হেঁকে বাজার যাচাই করছেন।
শাহজাহানপুর হাট ঘুরে দেখা যায়, মাঠ ছাড়িয়ে আশপাশের প্রধান সড়কের পাশে এবং খালি গলিতেও বাঁশ বেঁধে পশুর সারি তৈরি করা হয়েছে। শামিয়ানা দিয়ে তৈরি অস্থায়ী শেডের নিচে বাঁধা রয়েছে সারি সারি পশু। তবে সেই তুলনায় ক্রেতা কম মনে হয়েছে।
তারপরও কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নাটোর ও যশোর জেলা থেকে আসা ব্যাপারী ও খামারিরা তাদের পশু নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। হাটে ছোট ও মাঝারি সাইজের গরুর সরবরাহ সবচেয়ে বেশি হলেও, নজর কাড়ছে বেশ কিছু বিশালাকৃতির আকর্ষণীয় ষাঁড়।
মকবুল মিয়া নামের একজন ব্যাপারী জামালপুর থেকে এনেছেন ১৪টি গরু। এর মধ্যে বিক্রিও করেছেন তিনটি। তিনি বলেন, ‘বাজারের ভাব এখনো পুরোপুরি বোঝা যাচ্ছে না। তবে মূল বেচাকেনা হবে কাল থেকে।’
তিনি বলেন, ঢাকার মানুষের রাখার জায়গা নেই বলে তারা আগে গরু কেনেন না। বাজারের ধারণা নিতে অনেকেই এলেও মূল ক্রেতা আসে শেষ দিকে।
ক্রেতাদের সাধ্য ও বাজারের বাস্তবতা
খিলগাঁও থেকে হাটে গরু কিনতে এসেছেন বেসরকারি চাকরিজীবী সম্রাট চৌধুরী। সকাল সকাল প্রায় দুই ঘণ্টা হাট ঘুরে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, গত বছর যে সাইজের গরু ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে, এবার ব্যাপারী সেটির দাম চাচ্ছেন পৌনে দুই লাখ টাকা।
আরেকজন ক্রেতা গরু খুঁজছেন এক লাখ টাকার মধ্যে। তিনি বলেন, ‘আমরা যারা মধ্যবিত্ত, আমাদের বাজেট তো সীমিত। এক লাখ টাকার মধ্যে মাঝারি মানের একটা গরু খোঁজার চেষ্টা করছি, কিন্তু বিক্রেতারা দাম ছাড়ছেন না।’
বাজারের এই চড়া ভাবের বিষয়ে পাবনার বেড়া উপজেলা থেকে আসা খামারি আব্দুল কুদ্দুস বলেন ভিন্ন কথা। তিনি এবার ১০টি শাহীওয়াল ও ফ্রিজিয়ান জাতের গরু নিয়ে শাহজাহানপুর হাটে এসেছেন।
আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ভুষি, খৈল আর খড়ের দাম গত এক বছরে যেভাবে বেড়েছে, তাতে একেকটা গরু লালন-পালন করতেই আমাদের বিশাল খরচ হয়েছে। এর ওপর আছে ঢাকা আসার ট্রাক ভাড়া, ঘাটের ও হাটের খরচ।
তিনি বলেন, ‘তারপরও আমরা কিন্তু ৫-১০ হাজার টাকা লাভ পেলেই একটি গরু বিক্রি করে দেই। লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে এতটুকু লাভ না করলে হয়? তারপরও শেষ পর্যন্ত গরু থেকে যায়, অনেক বছর লোকসান করতে হয়।’