উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ পশুর হাট রাজশাহীর সিটি হাট। কুরবানিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জেলার কয়েকলাখ ক্রেতা-বিক্রেতা আর ব্যাপারীর সমাগমে জমজমাট সেই হাট এখন ইজারাদারদের টাকা কামানোর মেশিন। টোল আদায়ের বিধি-বিধান লঙ্ঘন করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ।
রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) এপ্রিলে বিএনপি-জামায়াত-আওয়ামী লীগের শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কাছে হার মেনে স্বল্পমূল্যে হাটটি ইজারা দিয়েছে। কাগজ-কলমে শওকত আলী নামে একজন ব্যবসায়ী এর ইজারাদার হলেও মূল অংশীদার শওকতসহ তিন দলের মোট ছয়জন নেতা ও সমর্থক। আর এটি এখন নিয়ন্ত্রণ করছেন আওয়ামী লীগ কর্মী আমিনুল ইসলাম আমিন।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও রাজশাহীর সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের অত্যন্ত আস্থাভাজন হিসাবে পরিচিত আমিন সিটি করপোরেশন থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় দুইশ কোটি টাকার ঠিকাদারি। তিনি আওয়ামী জামানায় এ হাটের ইজারাদার দলের নেতা আতিকুর রহমান কালুর ডানহাত হিসাবেও কাজ করেছেন। তবে পটপরিবর্তনের পর আমিন বিএনপি নেতাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে রয়েছেন বহাল তবিয়তে।
এদিকে কুরবানিকে সামনে রেখে রাসিক নির্ধারিত টোল আদায়ের বিধি-বিধান না মেনে গরু-মহিষ প্রতি আদায় করা হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। রশিদে লেখা থাকছে না টাকার পরিমাণ। নিয়ম ভেঙে বিক্রেতাদের কাছ থেকেও নেওয়া হচ্ছে টাকা। এভাবে আমিন প্রতিহাটে অন্তত পৌনে এক কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। পাশাপাশি একই গরু হাত বদল হয়ে দুইবার বিক্রি হচ্ছে। এক্ষেত্রে ইজারাদাররা বিক্রেতা কৃষক এবং ক্রেতা ফড়িয়াদের কাছ থেকেও তিনি অবৈধভাবে টাকা আদায় করছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নামেও ট্রাকপ্রতি আদায় করা হচ্ছে বিপুল অর্থ।
অভিযোগ রয়েছে, সিলেট সীমান্ত পার হয়ে আসা ভারতীয় গরু ও মহিষের মূল্য হিসাবে প্রতিহাটে হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করা হচ্ছে অন্তত ২০ কোটি টাকা। হাটে টোল আদায়ের নির্ধারিত হার সংক্রান্ত কোনো সাইনবোর্ড নেই। একটি বুথের সামনে ছোট্ট করে লেমেনেটিং কাগজে প্রতিটি মহিষের জন্য ৮০০, গরু ৭০০ এবং ছাগলের ক্ষেত্রে ৫০০ টাকা টোলের হার উল্লেখ করা রয়েছে।
নাটোরের গুরুদাসপুরের গরু বিক্রেতা হেলাল বলেন, ‘আমার কাছে একশ টাকা নিয়েছে। তাতে রশিদ দেয়নি।’ বিক্রেতার কাছ থেকে টাকা নেওয়ার নিয়ম নেই জানালে তিনি বলেন, ‘ইজারাদাররা জোর করে নিয়েছেন।’ একই এলাকার আরেক ব্যক্তি আসমত আলী দুটি মহিষ কিনেছেন। তিনি বলেন, ‘প্রতি মহিষের জন্য আমার কাছে ৯০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। আর বিক্রেতার কাছ থেকে আদায় করেছে ২০০ টাকা।’
এছাড়া হাটে আসা ক্রেতাদের টোল আদায়ের রশিদে দেখা গেছে, টাকার পরিমাণ উল্লেখের জন্য নির্দিষ্ট স্থান থাকলেও তা ফাঁকা রয়েছে। প্রতিটি গরু এবং মহিষের টোল হিসাবে ২০০-২৫০ টাকা ক্রেতা-বিক্রেতার কাছ থেকে বেশি নেওয়া হচ্ছে। ঈদের আগে প্রতিহাটে অন্তত ৩০ হাজার গরু ও মহিষ বিক্রি হয়। এ হিসাবে হাটপ্রতি বাড়তি প্রায় ৭৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ইজারাদাররা। হাটের মূল নিয়ন্ত্রক আমিনের বিরুদ্ধে ব্যাপারীদের কাছ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী একটি বাহিনীর নামে ব্যাপক চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। এটি ওপেন সিক্রেট হলেও এ বিষয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পান না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসময় প্রতিহাটে প্রায় ৫০০টি ট্রাকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় গরু-মহিষ যায়। এজন্য ট্রাকপ্রতি তিন হাজার করে টাকা আদায় করেন আমিন। এর মাধ্যমে প্রতিহাটে ১৫ লাখ টাকা চাঁদাবাজি হয়। ঈদের মৌসুমে শুধুমাত্র এ কৌশলে তিনি অন্তত আড়াই থেকে তিন কোটি টাকা ব্যাপারীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেন। এছাড়া সারা বছরই তার চাঁদাবাজি চলে।
সিলেট সীমান্ত দিয়ে আসা ভারতীয় গরু এবং মহিষের ছাড়পত্র স্থানীয় চোরাচালানিরা সুকৌশলে তৈরি করেন। এরপর ছোট ছোট পশুহাটে তোলা হয়। সিটি হাটে ভারতীয় একটি মহিষের দাম চার লাখ থেকে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত। আর গরুর দাম তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ। ৫০০ এর মধ্যে অন্তত ৩০০টি গরু থাকে। প্রতি গরুর দাম তিন লাখ ২০ হাজার টাকা হলেও মোট মূল্য নয় কোটি ৬০ লাখ টাকা। আর প্রতি মহিষের দাম সাড়ে পাঁচ লাখ হলে মোট দাম হয় ১১ কোটি টাকা। সবমিলে সাড়ে ২০ কোটি টাকার বেশি। এ টাকা প্রতি হাটে হুন্ডির মাধ্যমে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের পরিশোধ করেন ইজারাদাররা।
গরু-মহিষের টোল কিছুটা বেশি আদায় করা হয় স্বীকার করে ইজারাদার শওকত আলী বলেন, ‘আমরা ১০০ টাকা বেশি নিই। ব্যবস্থাপনার জন্য নেওয়া হয়। সময়ের অভাবে রশিদে টাকার পরিমাণ উল্লেখ থাকে না।’ তবে বিক্রেতার কাছ থেকে টাকা নেওয়ার প্রশ্নে তিনি জবাব দিতে পারেননি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নামে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘অভিযোগ সঠিক না। ব্যাপারীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয় না। হুন্ডি ব্যবসার সঙ্গে সিটি হাটের ইজারাদাররা সম্পৃক্ত না।’
ব্যাপারীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের বিষয়টি অস্বীকার করে আমিন বলেন, ‘ব্যাপারীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয় না। শুধুমাত্র টোলের টাকা নেওয়া হয়।’ হুন্ডির মাধ্যমে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের টাকা পরিশোধের অভিযোগ সম্পর্কে প্রশ্নে করতেই তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। আমিন বলেন, ‘হুন্ডির মাধ্যমে টাকা ভারতে পাচারের অভিযোগ ভিত্তিহীন।’ এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
ইজারাদারদের বেশি টোল আদায়ের অভিযোগ সম্পর্কে রাসিক’র সচিব সোহেল রানা বলেন, ‘টোল আদায় নিয়ে অভিযোগ পেয়েছি। আমরা ছাড়পত্রে টোলের পরিমাণ উল্লেখ করার জন্য ইজারাদারদের সতর্ক করেছি।’
রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) মুখপাত্র উপকমিশনার গাজিউর রহমান বলেন, আমরা হাটে খোঁজ নিতে সশরীরে গিয়ে অসঙ্গতি পাইনি। ট্রাকপ্রতি ব্যাপারীদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের বিষয়ে জানা নেই। বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখব। তবে আমরা নিশ্চয়তা দিচ্ছি, পুলিশের কোনো সদস্য টাকা নেন না।
এসআইএল/বিবিএন