
পবিত্র ঈদুল আজহার দ্বিতীয় দিনেও রাজধানীর লালবাগের পোস্তা এলাকায় জমে উঠেছে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার বাজার। দুপুরের পর থেকেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রাক, ভ্যান ও পিকআপে করে চামড়া আসতে শুরু করে।
ঈদের দিনের চেয়ে দ্বিতীয় দিনে তুলনামূলক কম চামড়া আসে। তবে গতবারের চেয়ে কম দামে কোরবানির চামড়া বিক্রি হতে দেখা গেছে।
আর ছাগলের চামড়ার চাহিদা নেই বললেই চলে। অনেকে বিনামূল্যে ছাগলের চামড়া দিয়ে দিয়েছেন।
অন্যদিকে বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিক্রেতারা।
শুক্রবার (২৯ মে) রাজধানীর পোস্তা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রাজধানীসহ আশপাশের এলাকা থেকে দুপুরের পর পোস্তায় কাঁচা চামড়া আসতে শুরু করে।
আর আড়তদারদের হাঁকডাকে সরব হয়ে উঠেছে লালবাগের শায়েস্তা খান, রাজ নারায়ণ ধর রোডসহ আশপাশের বিভিন্ন সড়ক। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রতিনিধিরা ট্রাক, ভ্যান ও রিকশায় করে কাঁচা চামড়া নিয়ে আসেন। আড়তদাররা সেই চামড়া দরদাম করে কেনেন।
তবে এ বছর ঈদের দ্বিতীয় দিন অনেক পশু কোরবানি হয়েছে তাই চামড়াও অনেক আসছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। এখানে চামড়া সংগ্রহের পর প্রথমে লবণজাত করা হবে। পরে তারা সাভারের ট্যানারিগুলোতে পাঠিয়ে দেবেন। এদিন পুরান ঢাকার পোস্তায় লবণ ছাড়া কাঁচা চামড়া বিক্রি হচ্ছে ছোট সাইজের ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা, মাঝারি সাইজের ৫৫০ থেকে ৭০০ টাকা এবং বড় সাইজের ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকা। আর ছাগলের চামড়া কেনায় ব্যবসায়ীদের কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি। কোথাও কোথাও রাস্তায় চামড়া পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
জানা গেছে, সাধারণত বড় আকারের গরুর চামড়া ৩১-৪০ বর্গফুট, মাঝারি আকারের গরুর চামড়া ২১-৩০ এবং ছোট আকারের গরুর চামড়া ১৬-২০ বর্গফুটের হয়। নির্ধারিত দাম অনুযায়ী, ঢাকায় ছোট আকারের গরুর একটি ১৬ থেকে ২০ বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম হওয়ার কথা সর্বনিম্ন ৯৯২ থেকে সর্বোচ্চ ১৩০০ টাকা, মাঝারি আকারের ২১ থেকে ৩০ বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম হওয়ার কথা সর্বনিম্ন ১৩৬৫ থেকে সর্বোচ্চ ১৯৫০ টাকা এবং বড় আকারের ৩১ থেকে ৪৫ বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম হওয়ার কথা সর্বনিম্ন ২০১৫ থেকে সর্বোচ্চ ২৯২৫ টাকা।
আর ঢাকার বাইরে ছোট আকারের গরুর একটি ১৬ থেকে ২০ বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম হওয়ার কথা সর্বনিম্ন ৯১২ থেকে সর্বোচ্চ ১২৪০ টাকা, মাঝারি আকারের ২১ থেকে ৩০ বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম হওয়ার কথা সর্বনিম্ন ১১৯৭ থেকে সর্বোচ্চ ১৮৬০ টাকা এবং বড় আকারের ৩১ থেকে ৪৫ বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম হওয়ার কথা সর্বনিম্ন ১৭৬৭ থেকে সর্বোচ্চ ২৭৯০ টাকা।
এদিকে এ বছর গরুর কাঁচা চামড়ার দর ঢাকার ভেতরে প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকার বাইরে গরুর কাঁচা চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম ৫৭ থেকে ৬২ টাকা। সারা দেশে খাসির চামড়ার প্রতি বর্গফুট ২৫-৩০ টাকা ও সারা দেশে বকরির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুটে ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
মৌসুমি বিক্রেতারা বলছেন, সরকার লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে কিন্তু কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ না করায় ইচ্ছামতো দাম দিচ্ছে আড়তদাররা। পরিবহন খরচ, লবণের দাম ও শ্রমিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই লোকসানের আশঙ্কা করছেন।
মোহাম্মদপুর থেকে পোস্তায় চামড়া নিয়ে এসেছেন মো. রকিবুল হাসান। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ঈদের দ্বিতীয় দিন কোরবানি কম হয় তারপরও সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ৫০টি চামড়া সংগ্রহ করেছি। এখানে আনার পর শুধু বড় চামড়ার দাম বলে ৭০০ টাকা, আর মাঝারি চামড়া বলে ৫৫০ টাকা। ছোটটা নিতে চাচ্ছে না। বলে এ চামড়া ভালো না। আমরা প্রত্যাশিত দাম পাচ্ছি না। খরচ তুলতেই কষ্ট হচ্ছে।
আড়তদাররা বলছেন, ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে বকেয়া অর্থ সময়মতো না পাওয়ায় নগদ অর্থের সংকট রয়েছে। ফলে চামড়া কেনায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন অনেক ব্যবসায়ী। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা ও রপ্তানির অনিশ্চয়তার প্রভাবও বাজারে পড়েছে।
পোস্তার শাকিল এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. শাকিল আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, চামড়ার দাম কম এ বছর, শ্রমিক সংকট, লবণ কম, অতিরিক্ত গরম আবার বৃষ্টিও হচ্ছে। এছাড়া অনেক বড় ব্যবসায়ী চামড়া কিনছেন না। ট্যানারিরা আমাদের টাকা দিচ্ছে না। কাঁচা চামড়া রপ্তানি করতে পারলে ভালো হতো দাম ভালো পেতাম।
বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মঞ্জুরুল হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, আজ ঈদের দ্বিতীয় দিন দুপুরের পর থেকে পোস্তায় চামড়া আসতে শুরু করেছে। তবে আজ কোরবানি কম হওয়ায় চামড়াও কম আসবে।
এ বছরও চামড়ার দাম কম হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, চায়নার আগ্রাসন, চামড়া শিল্প নগরী পরিপূর্ণভাবে চালু না হওয়া এবং ট্যানারি মালিকরা বকেয়া পরিশোধ না করায় প্রয়োজনীয় অর্থ ও সংরক্ষণ সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক ব্যবসায়ী কম পরিসরে চামড়া সংগ্রহ করছেন। তবে চামড়ার মধ্যে সমস্যা থাকলে দাম কম হয়। সমস্যাযুক্ত চামড়া কিনলে পরে সেটা ফেলে দিতে হয়। ভালো চামড়া ভালো দাম দিয়েই কিনছি। লবণ ও কেমিক্যালের দাম বেশির কারণে চামড়ার দামটা কম।
তিনি বলেন, এবার সংরক্ষণের লক্ষ্যমাত্রাও কিছুটা কমিয়ে এক লাখ পিস করা হয়েছে। বাংলাদেশে চামড়ার কোনো সিন্ডিকেট নেই। সিইটিপি না হওয়ায় চায়না এখানে সিন্ডিকেট তৈরি করেছে। তারা লোক দিয়ে চামড়া কিনছেন। ফলে ফড়িয়া বা মৌসুমি ব্যবসায়ীরা দাম পাচ্ছে না।
তবে ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, আগামী এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে ট্যানারিগুলোতে সরবরাহ বাড়লে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হবে।