
প্রায় আট দশক ধরে বিশ্বের বাঘা বাঘা গণিতবিদদের ধাঁধায় ফেলে রাখা একটি বিখ্যাত গাণিতিক সমস্যার সমাধান করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই জানিয়েছে, তাদের একটি নতুন এআই মডেল ‘ইউনিট ডিস্ট্যান্স প্রবলেম’ নামে পরিচিত জটিল সমস্যাটির সমাধান করেছে—যা দীর্ঘদিন ধরে মানুষের নাগালের বাইরে ছিল।
কয়েক বছর আগেও উন্নত এআই মডেলগুলো সাধারণ গাণিতিক সমস্যা সমাধান করতেই হোঁচট খেত। অথচ এখন তারা আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের স্বর্ণপদকজয়ী শিক্ষার্থীদের সমমানের পারফরম্যান্স দেখাচ্ছে। সর্বশেষ তারা কম্বিনেটোরিয়াল জ্যামিতির একটি ঐতিহাসিক সমস্যার সমাধানে বীজগাণিতিক সংখ্যাতত্ত্ব ব্যবহার করে এই অভাবনীয় সাফল্য দেখাল।
সংখ্যা ও জটিল সমীকরণে অভ্যস্ত নন এমন সাধারণ পাঠকদের জন্য ওপেনএআই তাদের ফলাফল ব্যাখ্যা করতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এআইয়ের সমাধানের সঙ্গে খ্যাতনামা গণিতবিদদের ১৯ পৃষ্ঠার বিশদ মন্তব্য ও ব্যাখ্যাও প্রকাশ করেছে, যাতে সাধারণ মানুষ এবং বিশেষজ্ঞরা সমানভাবে বিষয়টি বুঝতে পারেন।
সাধারণভাবে গণিতবিদরা অতিরঞ্জিত দাবি বা প্রচারণার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থাকেন। কোনো নতুন আবিষ্কার বা যুগান্তকারী দাবি গ্রহণ করার আগে তাঁরা কঠোর প্রমাণ দেখতে চান। এ কারণেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তাঁদের ক্ষেত্রকে আমূল বদলে দেবে—এমন ধারণা নিয়ে অনেক গণিতবিদ এতদিন সন্দিহান ছিলেন। তবে এই সমাধানের পর বিশিষ্ট গণিতবিদদের প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হলে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তৈরি হয়।
প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নোগা অ্যালন বলেন, 'অনেক অসাধারণ মানব গবেষক যে কাজ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন, এআই সেখানে সফল হয়েছে।' টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড্যানিয়েল লিটের মন্তব্য করেন, 'এটাই প্রথম এআই-উৎপাদিত ফলাফল, যা নিজস্ব গুরুত্বের কারণেই আমাকে উচ্ছ্বসিত করেছে; ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাবনার ইঙ্গিত হিসেবে নয়।'
ফ্রান্সের কলেজ দ্য ফ্রান্সের অধ্যাপক ও ফিল্ডস মেডেলজয়ী গণিতবিদ টিমোথি গাওয়ার্স বলেন, 'ইউনিট ডিস্ট্যান্স সমস্যার এই সমাধান এআই-ভিত্তিক গণিত গবেষণার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। কোনো মানুষ যদি এই গবেষণাপত্র লিখে 'অ্যানালস অব ম্যাথেমেটিকস'-এ জমা দিতেন এবং আমাকে মতামত দিতে বলা হতো, তাহলে আমি বিনা দ্বিধায় তা প্রকাশের সুপারিশ করতাম। এর আগে কোনো এআই-সৃষ্ট প্রমাণ এর ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি।' মানব গণিতবিদদের জন্য সর্বোচ্চ সম্মান ফিল্ডস মেডেলের বিজয়ী গাওয়ার্সের মতে, গাণিতিক সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে মানুষের জন্য এখন এআইয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা খুব কঠিন হয়ে উঠবে।
কী এই ‘ইউনিট ডিস্ট্যান্স প্রবলেম’
প্রায় ৮০ বছর আগে ১৯৪৬ সালে এই সমস্যাটি উত্থাপন করেছিলেন কিংবদন্তি গণিতবিদ পল এরদশ। ‘ইউনিট ডিস্ট্যান্স প্রবলেম’-এর সহজ রূপ হলো—যদি আপনি একটি কাগজে 'n' সংখ্যক বিন্দু বসান, তবে ঠিক কত জোড়া বিন্দুর মধ্যবর্তী দূরত্ব নিখুঁতভাবে ১ ইউনিট হবে? এরডশ দেখিয়েছিলেন যে এই বিন্দুগুলোকে গ্রিড আকারে সাজালে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার জোড়া পাওয়া যায় এবং তার অনুমান ছিল যে অন্য কোনো উপায়ে এর চেয়ে বেশি জোড়া পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু ওপেনএআইয়ের তৈরি মডেলটি এমন একটি বিন্যাস খুঁজে বের করেছে যা এরডশের সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। অর্থাৎ, এই প্রমাণটি ছিল মূলত একটি ‘ভুল প্রমাণ’ বা ডিসপ্রুফ।
পল এরদশ এই সমস্যাটির সমাধানের জন্য শুরুতে ৩০০ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করলেও পরে তা বাড়িয়ে ৫০০ ডলার করেছিলেন। ওপেনএআইতে কর্মরত কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গণিতবিদ মেহতাব সাহনি বলেন, 'আমি শুরুতে এটি বিশ্বাসই করতে পারিনি।' তাই তারা ভুল খুঁজতে শুরু করেন এবং অন্য বিশেষজ্ঞদের দিয়ে ফলাফলটি পুনরায় যাচাই করান। শেষ পর্যন্ত কোডিং এজেন্টের সাহায্যে নিশ্চিত হওয়া যায় যে এআইয়ের করা সমাধানটি সম্পূর্ণ সঠিক।
মানুষ যেখানে দশকের পর দশক চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে, এআই সেখানে কীভাবে সফল হলো—এর পেছনে গবেষকেরা তিনটি মূল কারণ দেখিয়েছেন। প্রথমত, এই সমাধানটি মানুষের চিন্তাভাবনার সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। মানুষ যেখানে এরডশের তত্ত্বটিকে সত্য প্রমাণ করার চেষ্টা করছিল, এআই সেখানে প্রথাগত চিন্তার বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ নতুন উপায়ে একে ভুল প্রমাণ করার পথ খুঁজে নেয়।
দ্বিতীয়ত, মানুষ সাধারণত নির্দিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হলেও এআই একাধিক ক্ষেত্রের জ্ঞান একত্রে ব্যবহার করতে পারে। এই ক্ষেত্রে মডেলটি বীজগাণিতিক সংখ্যাতত্ত্ব এবং বিচ্ছিন্ন জ্যামিতির ধারণাকে একত্র করেছে—যে দুটি ক্ষেত্রকে সাধারণত খুব কাছাকাছি মনে করা হয় না।
তৃতীয়ত, এআই ক্লান্ত হয় না। এটি দীর্ঘ সময় ধরে একই সমস্যার পেছনে লেগে থাকতে পারে। গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, মডেলটির চিন্তাপ্রক্রিয়ার সংক্ষিপ্ত সংস্করণই ছিল ৭৫ হাজার শব্দের বেশি, যা ‘হ্যারিপটার’ সিরিজের প্রথম বইয়ের দৈর্ঘ্যের সমান। পুরো সমাধানটি বের করতে এআইয়ের সময় লেগেছে মাত্র ৩২ ঘণ্টা এবং ১ হাজার ডলারের কম কম্পিউটিং ব্যয় হয়েছে। ওপেনএআইয়ের গবেষক সেবাস্তিয়ান বুবেক বলেন, 'এক বছর আগের কথা ভুলে যান। এক মাস আগেও এমন কিছু অকল্পনীয় ছিল।'
তবে এই সাফল্যের পরও ওপেনএআইয়ের গবেষকেরা মনে করেন না যে গণিতবিদদের ভূমিকা শেষ হয়ে যাচ্ছে। বরং তারা এটিকে ক্যালকুলেটর বা দাবা-কম্পিউটারের মতো একটি শক্তিশালী সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে দেখছেন। গবেষকদের মতে, এআই নতুন ধারণা ও পদ্ধতির জন্ম দিতে পারে, যার ওপর ভিত্তি করে মানুষ আরও বড় সমস্যার সমাধান খুঁজবে।
এসআইএল/বিবিএন