Template: 2
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
logo
বিজয় বাংলা নিউজ
bijoybangla.news
০৩ জুন ২০২৬
০৭:১০ অপরাহ্ন

রাজশাহীতে বোম্বাই লিচুতে বাজার মাত, ৫৬ কোটি টাকার বাণিজ্যের আশা

অনলাইন ডেস্ক Expected trade of 56 crore taka

রাজশাহী মহানগরী ও জেলার ৯টি উপজেলায় এ বছর লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। আগাম জাতের দেশি লিচুর দাপট শেষ না হতেই এখন বাজার দখল করে নিয়েছে জনপ্রিয় ও সুস্বাদু বোম্বাই লিচু। ফলের আকার, রঙ ও স্বাদ ভালো হওয়ায় চাষি থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও বিরাজ করছে ব্যাপক উৎসাহ।

কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, অনুকূল বাজার পরিস্থিতি বজায় থাকলে চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে প্রায় ৫৬ কোটি টাকার লিচু বাণিজ্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলার ৯টি উপজেলায় ৫২৮ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। দেশি ও বোম্বাই জাত মিলিয়ে মোট ৩ হাজার ৭৭৫ মেট্রিক টন লিচু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, গত বছরের তুলনায় এবার ফলন আরও ভালো হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে কিছুটা তাপপ্রবাহ থাকলেও পরবর্তীতে অনুকূল আবহাওয়া ও বৃষ্টির কারণে অধিকাংশ বাগানে লিচুর আকার ও রঙ ভালো হয়েছে। বিশেষ করে বোম্বে লিচুর গুণগত মান নিয়ে সন্তুষ্ট চাষিরা। ফলে অনেক ক্ষেত্রে পাইকাররা সরাসরি বাগান থেকেই লিচু কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।

‘গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার পোকার আক্রমণ কম ছিল। দেশি লিচু বিক্রি করে ভালো দাম পেয়েছি। এখন বোম্বে লিচু নামানো শুরু করেছি। ফলের মান ভালো হওয়ায় পাইকাররা বাগান থেকেই কিনে নিচ্ছেন।’

গোদাগাড়ী উপজেলার লিচুচাষি আব্দুর রহিম সাগর বলেন, ‘গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার পোকার আক্রমণ কম ছিল। দেশি লিচু বিক্রি করে ভালো দাম পেয়েছি। এখন বোম্বে লিচু নামানো শুরু করেছি। ফলের মান ভালো হওয়ায় পাইকাররা বাগান থেকেই কিনে নিচ্ছেন।’

নগরীর চন্দ্রিমা থানার বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে ৪০টি গাছে লিচু চাষ করেছেন হানিফ মাহমুদ। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এবার লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। বাজারে সরবরাহও ভালো। দাম এখনো স্থিতিশীল আছে। অতিরিক্ত খরা না থাকলে লিচুর উৎপাদন আরও ভালো হতে পারত। আবহাওয়া ভালো থাকলে শেষ পর্যন্ত ভালো লাভ হবে বলে আশা করছি।’

রাজশাহী মহানগরীর কাশিয়াডাঙ্গা এলাকার লিচু ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এবার বোম্বে লিচুর চাহিদা বেশ ভালো। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা রাজশাহীতে এসে সরাসরি বাগান থেকে লিচু কিনে নিচ্ছেন। ফলের মান ভালো থাকায় বাজারেও দাম সন্তোষজনক রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে মৌসুমের শেষ পর্যন্ত ব্যবসা আরও জমে উঠবে বলে আশা করছি।’

সরেজমিনে রাজশাহী মহানগরীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দেশি লিচুর মৌসুম প্রায় শেষ। এখন বড় আকারের রসালো বোম্বাই লিচুর আধিপত্য। খুচরা বাজারে ভালো মানের ১০০টি লিচু ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি বাজারেও বেচাকেনা জমে উঠেছে। প্রতিদিন শত শত ট্রাকে করে রাজশাহীর লিচু ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে। দেশি জাতের ছোট লিচুতে পোকা থাকলেও বোম্বে লিচুতে কোনো ধরনের পোকা পাওয়া যাচ্ছে না।

‘অনুকূল আবহাওয়া, চাষিদের নিয়মিত পরিচর্যা এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুসরণ করায় অধিকাংশ বাগানে সন্তোষজনক ফলন পাওয়া গেছে। বর্তমানে বাজারে বোম্বাই লিচুর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে এবং পাইকাররা সরাসরি বাগান থেকে লিচু সংগ্রহ করছেন।’

এদিকে বাম্পার ফলনের এই আনন্দের মধ্যেও কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে চাষিদের। কৃষি বিভাগ ও চাষিদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে অতিরিক্ত তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতার অস্বাভাবিক ওঠানামার কারণে জেলার কিছু এলাকায় কাঁচা ও আধাপাকা লিচু ফেটে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। কয়েক দিনের টানা গরমের পর হঠাৎ আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় ফলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে এবং খোসা ফেটে যাচ্ছে।

পবা উপজেলার চাষি আব্দুল মালেক বলেন, ‘কিছু বাগানে লিচু ফেটে যাচ্ছে। প্রচণ্ড গরমের পর হঠাৎ আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় এ সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবে সঠিক পরিচর্যা করলে ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।’

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার হঠাৎ পরিবর্তনে লিচুর খোসা দ্রুত প্রসারিত ও সংকুচিত হয়। ফলে কিছু ক্ষেত্রে ফল ফেটে যায়। তবে জেলার অধিকাংশ বাগানে উৎপাদন পরিস্থিতি এখনো সন্তোষজনক রয়েছে।

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, এ বছর রাজশাহীতে লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে মৌসুমের শুরুতে অতিরিক্ত খরার কারণে কিছু এলাকায় লিচু ফেটে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষকদের নিয়মিত হালকা সেচ দেওয়া এবং গাছের গোড়ায় মালচিং করার পরামর্শ দেওয়া হয়, যাতে মাটির আর্দ্রতা স্থিতিশীল থাকে। এর ফলে ফল ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে মৌসুমের শেষ পর্যন্ত ভালো উৎপাদন পাওয়া যাবে এবং কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত লাভবান হবেন বলে আমরা আশা করছি।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) পাপিয়া রহমান মৌরী বলেন, এ বছর রাজশাহীতে লিচুর উৎপাদন ও গুণগত মান দুটিই বেশ ভালো হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, চাষিদের নিয়মিত পরিচর্যা এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুসরণ করায় অধিকাংশ বাগানে সন্তোষজনক ফলন পাওয়া গেছে। বর্তমানে বাজারে বোম্বাই লিচুর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে এবং পাইকাররা সরাসরি বাগান থেকে লিচু সংগ্রহ করছেন। বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে প্রায় ৫৬ কোটি টাকার লিচু বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। এতে শুধু বাগান মালিকরাই নন, আড়তদার, পরিবহন শ্রমিক ও এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হাজারো মানুষ অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হবেন।

লিচুর বাম্পার ফলন, বাজারে শক্তিশালী চাহিদা এবং বোম্বে লিচুর ব্যাপক সরবরাহে রাজশাহীর অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বাগান মালিক, আড়তদার, পরিবহন শ্রমিকসহ এ খাতের সঙ্গে জড়িত হাজারো মানুষের মধ্যে ফিরেছে নতুন আশা। তবে মৌসুমের শেষ পর্যন্ত অনুকূল আবহাওয়া বজায় থাকাই এখন চাষিদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

© বিজয় বাংলা নিউজ
bijoybangla.news