Template: 1
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
বিজয় বাংলা নিউজ
জাতীয় দৈনিক | bijoybangla.news
QR
ই-পেপার / অনলাইন সংস্করণ
Tuesday , ১৬ জুন ২০২৬ | ১১:০৭ পূর্বাহ্ন

বদলগাছীতে জিআই স্বীকৃত লাকফজলির চাহিদা বাড়লেও বাজার নেই, ক্ষতির মুখে চাষিরা

সৈকত সোবহান, বদলগাছী (নওগাঁ): ১৬ জুন ২০২৬

নওগাঁর বদলগাছীতে চলতি মৌসুমে জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) স্বীকৃত ঐতিহ্যবাহী নাকফজলি আমসহ বিভিন্ন জাতের আমের বাম্পার ফলন হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার প্রায় ২০ থেকে ২২ কোটি টাকার আম বিক্রির সম্ভাবনা দেখছে কৃষি বিভাগ। তবে স্থায়ী আড়ত, আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা ও কোল্ড-চেইন পরিবহনের অভাবে উৎপাদনের প্রকৃত সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় চাষিরা। ফলে ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি নিয়ে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তারা।

বদলগাছী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে বদলগাছীতে মোট ৫৫০ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ২৬০ হেক্টর জমিতে জিআই স্বীকৃত নাকফজলি এবং ২৯০ হেক্টর জমিতে আম্রপালি, বারি আম-৪, কাটিমন ও ব্যানানা ম্যাঙ্গোসহ বিভিন্ন উচ্চফলনশীল জাতের আম রয়েছে। এ বছর উপজেলায় প্রায় ৭ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সম্প্রতি নওগাঁ কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় বদলগাছী নাকফজলি আমচাষি সমবায় সমিতি লিমিটেডের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ‘নওগাঁর নাকফজলি আম’ ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি লাভ করে। গত ২০২৫ সালের ১ মে বিশ্ব মেধাস্বত্ব দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সমিতির সভাপতি মোজাফফর হোসেনের হাতে জিআই সনদ তুলে দেওয়া হয়।

স্বাদ, গুণগত মান ও দীর্ঘস্থায়িত্বের কারণে নাকফজলি আম দেশের অন্যতম জনপ্রিয় আম হিসেবে পরিচিত। আঁশবিহীন, সুস্বাদু ও তুলনামূলক কম পচনশীল হওয়ায় বাজারে এ আমের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পর দেশজুড়ে এ আমের পরিচিতি ও চাহিদা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জিআই স্বীকৃতির ফলে বদলগাছীর নাকফজলি আমের ব্র্যান্ড মূল্য বৃদ্ধি, রপ্তানির সম্ভাবনা সম্প্রসারণ এবং নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হয়েছে।

অস্থায়ী বাজারে বিক্রি, কুরিয়ারনির্ভর বিপণনে ভোগান্তি।

সরেজমিনে দেখা যায়, স্থায়ী বাজার না থাকায় বদলগাছী সদর উপজেলার ডাকবাংলো মোড়, উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন এলাকা, হাটখোলা বাজার ও চারমাথা মোড়ে অস্থায়ীভাবে মৌসুমি আমের বাজার গড়ে উঠেছে। চাষি ও ব্যবসায়ীরা ক্যারেট ও ডালাভর্তি আম নিয়ে সড়কের পাশে বেচাকেনা করছেন।

স্থায়ী আড়ত না থাকায় পুরো বাজার ব্যবস্থা এখন কুরিয়ার ও অনলাইননির্ভর হয়ে পড়েছে। ফেসবুক পেজ, মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অর্ডার সংগ্রহ করছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা। এরপর বাগান থেকে আম সংগ্রহ করে ক্যারেটে প্যাকিং করে সুন্দরবন, জননী, এজেআর ও স্টেডফাস্ট কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৪৫০ মণ আম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কুরিয়ার এজেন্টরা।


 ২০ কোটি টাকার আমের সম্ভাবনা থাকলেও ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত কৃষকরা

তবে এই ব্যবস্থায় নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন উদ্যোক্তারা। ‘ম্যাঙ্গো সেল বাজার’-এর স্বত্বাধিকারী এম এম মোস্তাকিম বলেন, অনলাইনে ব্যাপক সাড়া থাকলেও কুরিয়ার জটিলতার কারণে অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে আম পৌঁছায় না। এতে আম নষ্ট হয়, গ্রাহক অসন্তুষ্ট হন এবং লোকসান গুনতে হয়।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দারা জানান, বাজার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন না থাকায় কৃষকেরা এখনো মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরশীল। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই তারা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

বদলগাছী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাবাব ফারহান বলেন,“আমাদের দেশে বর্তমানে আম উৎপাদন ও বিপণনের যে সম্ভাবনা রয়েছে, বাস্তবে তা আরও অনেক বেশি সম্প্রসারণ করা সম্ভব। তবে কৃষকদের কিছু দক্ষতার ঘাটতি এবং আধুনিক বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে উৎপাদিত আমের একটি বড় অংশ—প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ—সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিবহন পর্যায়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আমরা মাঠপর্যায়ে কৃষকদের বাগান পরিদর্শন করে দেখেছি, অনেক ক্ষেত্রে উত্তম কৃষি চর্চা (GAP) যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না। বিশেষ করে আম সংগ্রহের সময় গাছ থেকে নামানো ফল সরাসরি মাটিতে রাখা হয়, যা ফলের গায়ে আঘাত লাগিয়ে গুণগত মান ও বাজারমূল্য কমিয়ে দেয়। অথচ একটি সাধারণ ত্রিপল বা পলিথিন ব্যবহার করলেই এই ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

কৃষি কর্মকর্তা আরও জানান, প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রেও অনিয়ম রয়েছে। অনেক সময় ক্যারেট বা কার্টনে অতিরিক্ত আম গাদাগাদি করে রাখা হয়, যার ফলে পরিবহনের সময় চাপ ও ঘর্ষণে অনেক আম নষ্ট হয়ে যায়।

তিনি বলেন, বর্তমানে ব্যবহৃত ট্রাক, পিকআপ বা সাধারণ পরিবহন ব্যবস্থা পচনশীল ফল পরিবহনের জন্য উপযোগী নয়। উচ্চ তাপমাত্রা ও দীর্ঘ সময় পরিবহনের কারণে আমের গুণগত মান নষ্ট হয়। তাই সময়ের দাবি হলো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোল্ড-চেইন পরিবহন ব্যবস্থা চালু করা।

সাবাব ফারহান আরও যোগ করেন,বর্তমানে অনেক কৃষক ও উদ্যোক্তা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আম পাঠালেও অনুপযুক্ত প্যাকেজিংয়ের কারণে দুই থেকে তিন দিনের যাত্রায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাই আমের অপচয় কমাতে এবং কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্যাকেজিং, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ—সব ধাপে আধুনিক প্রযুক্তি ও উত্তম কৃষি চর্চার বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এ ক্ষতি কমাতে কৃষকদের আধুনিক পদ্ধতিতে আম সংগ্রহ ও প্যাকেজিংয়ের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কভার্ড ভ্যানের পরিবর্তে কোল্ড-চেইন বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ ছাড়া উন্নত বাজারজাতকরণের সুবিধার্থে জাবারীপুর হাট, গোঁবরচাঁপা হাট, ভান্ডারপুর হাট ও বদলগাছী হাটে বিশেষায়িত আমের বাজার স্থাপনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইশরাত জাহান ছনি বলেন, উপজেলার আমচাষিদের সুবিধার্থে এবং জিআই স্বীকৃত নাকফজলির বাজার সম্প্রসারণে একটি স্থায়ী আমের বাজার ও আড়ত গড়ে তোলার বিষয়ে প্রশাসন কাজ করছে। উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় চাষিরা সরাসরি লাভবান হবেন এবং ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা সহজ হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, জিআই স্বীকৃত নাকফজলির ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রূপ দিতে হলে বদলগাছী উপজেলাতে দ্রুত একটি স্থায়ী আমের আড়ত, আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা এবং কোল্ড-চেইন পরিবহন সুবিধা গড়ে তোলা জরুরি। তা না হলে প্রতিবছর বাম্পার ফলনের পরও উৎপাদনের প্রকৃত সুফল থেকে বঞ্চিত হবেন স্থানীয় আমচাষিরা।

স্থায়ী আড়ত ও আধুনিক পরিবহনের অভাবে ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত চাষিরা