Template: 3
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
অনলাইন ডেস্ক | ২১ জুন ২০২৬
bijoybangla.news
logo
বিজয় বাংলা নিউজ
জাতীয় দৈনিক

বাবা হিসেবে মুসলিমদের আদর্শ যে ৩ নবী

অনলাইন ডেস্ক 3 Prophets Who Are Ideal Fathers for Muslims

একটি শিশুর সঠিক মানসিক ও শারীরিক বিকাশে বাবার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মায়ের পাশাপাশি বাবার সক্রিয় অংশগ্রহণই শুধু সন্তানের একটি সুন্দর ও পরিপূর্ণ বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে পারে। পবিত্র কোরআনে এমন বেশ কয়েকজন বাবার কথা উল্লেখ রয়েছে, যাদের আদর্শ ও আচরণ প্রতিটি বাবার জন্য অনন্য শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে।

দোয়া ও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে সন্তানের পাশে থাকা

হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম একদম শেষ বয়সে এসে বাবা হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া এই উপহারে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত ছিলেন। সন্তানের বয়স কম হলেও তিনি সবসময় তার মতামতকে মূল্যায়ন করতেন। যেমনটি দেখা যায় যখন তিনি আল্লাহর নির্দেশে সন্তানকে কোরবানি করার স্বপ্নের কথা তাকে জানিয়েছিলেন।

পবিত্র কোরআনের সূরা আস-সাফফাতের ১০২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যখন সেই সন্তান ইব্রাহিমের সঙ্গে কাজ করার বয়সে পৌঁছাল, তখন ইব্রাহিম তাকে বলল, হে আমার প্রিয় ছেলে, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে আমি তোমাকে কোরবানি করছি। এখন বলো, এই বিষয়ে তোমার মতামত কী? ছেলে জবাব দিল, হে আমার প্রিয় বাবা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তা-ই করুন। আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের একজন হিসেবে পাবেন।

সন্তানের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম সন্তানের জন্য মন থেকে দোয়া করতেন, যা পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে। 

এই দোয়াগুলো আমাদের শেখায় কীভাবে সন্তানের ইহকাল ও পরকালের সাফল্যের জন্য প্রার্থনা করতে হয়। সূরা ইব্রাহিমের ৪০ নম্বর আয়াতে তিনি দোয়া করেন, হে আমার প্রতিপালক, আমাকে এবং আমার সন্তানদের নামাজ কায়েমকারী বানান। হে আমাদের প্রতিপালক, আমার প্রার্থনা কবুল করুন।

শুধু নিজের সন্তানই নয়, বরং অনাগত প্রজন্মের জন্যও হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের এই ব্যাকুলতা প্রতিটি বাবার জন্য এক বড় শিক্ষা।

বন্ধুত্বপূর্ণ ও আস্থার যোগাযোগ তৈরি করা

হজরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের ১২ জন ছেলের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ছোট ছেলে হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম। ইউসুফের সঙ্গে তার বাবার অত্যন্ত গভীর ও ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল। এই সুসম্পর্কের কারণে তাদের মধ্যে চমৎকার যোগাযোগের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। এ কারণেই ছোট্ট ইউসুফ তার একটি অদ্ভুত স্বপ্নের কথা বাবার কাছে অকপটে বলতে পেরেছিলেন এবং হজরত ইয়াকুবও একজন ভালো শ্রোতা হিসেবে তা শুনেছিলেন। 

একজন ছোট শিশু যেভাবে কোনো দ্বিধা ছাড়া তার স্বপ্নের কথা বাবার কাছে খুলে বলেছিল, তা প্রমাণ করে যে তাদের মধ্যকার সম্পর্ক কতটা বিশ্বাস ও সম্মানের ওপর টিকে ছিল।

সূরা ইউসুফের ৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যখন ইউসুফ তার বাবাকে বলল, হে আমার বাবা, আমি স্বপ্নে এগারোটি নক্ষত্র, সূর্য এবং চাঁদকে দেখেছি; আমি দেখেছি তারা সবাই আমাকে সেজদা করছে।

হজরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম তার ছেলেদের মনস্তত্ত্ব বুঝতেন। তাই তিনি ইউসুফকে পরম স্নেহে পরামর্শ দিলেন যাতে এই স্বপ্নের কথা সে তার ভাইদের না বলে। তবে এই পরামর্শ দেওয়ার সময় তিনি ভাইদের প্রতি ইউসুফের মনে কোনো ক্ষোভ তৈরি করেননি, বরং মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু এবং সে মানুষের মনে কুপ্ররোচনা দেয়।

কাজের মাধ্যমে ভালোবাসা ও স্নেহ প্রকাশ করা

আদর্শ বাবা হিসেবে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন এক অনন্য দৃষ্টান্ত। জগতের সবার প্রতি তার ভালোবাসা ও সহানুভূতি ছিল অতুলনীয়। পবিত্র কোরআনেই তাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

মহানবী (সা.) সবার সামনেও তার মেয়ে হজরত ফাতিমা (রা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন করতে কখনো কুণ্ঠাবোধ করতেন না। বাবার এই গভীর ভালোবাসা ও সম্মান ফাতিমার ব্যক্তিত্বেও ফুটে উঠেছিল। 

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, কথাবার্তা ও চালচলনে ফাতিমার চেয়ে রাসূলুল্লাহর সঙ্গে এত বেশি মিল আমি আর কারও দেখিনি। ফাতিমা যখন নবীজির কাছে আসতেন, তিনি দাঁড়িয়ে তাকে স্বাগত জানাতেন, তার হাত চুম্বন করতেন এবং নিজের বসার জায়গায় তাকে বসাতেন। আবার নবীজি যখন ফাতিমার ঘরে যেতেন, ফাতিমাও দাঁড়িয়ে তাকে স্বাগত জানাতেন, তার হাত চুম্বন করতেন এবং নিজের বসার জায়গায় বাবাকে বসাতেন।

বাবা ও মেয়ের এই অকৃত্রিম ও চিরন্তন বন্ধন প্রতিটি পরিবারের জন্য এক চমৎকার অনুকরণীয় আদর্শ।

সন্তানকে প্রজ্ঞা ও নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়া

হজরত লোকমানকে মহান আল্লাহ বিশেষ প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করেছিলেন, যা দিয়ে তিনি তার সন্তানকে জীবনের কঠিন পথ পাড়ি দেওয়ার নৈতিক শিক্ষা দিয়েছিলেন। লোকমান তার সন্তানকে সততা এবং জবাবদিহিতার গুরুত্ব শিখিয়েছিলেন।

সূরা লোকমানের ১৬ নম্বর আয়াতে তিনি বলেন, হে আমার প্রিয় ছেলে, কোনো ভালো বা মন্দ কাজ যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় এবং তা যদি কোনো পাথরের ভেতরে কিংবা আসমান ও জমিনের যেকোনো স্থানে লুকিয়ে থাকে, আল্লাহ তাও প্রকাশ করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ অত্যন্ত সূক্ষ্মদর্শী ও সর্বজ্ঞ।

সন্তানকে পরম স্নেহে ডাকার পাশাপাশি লোকমান তাকে আজীবন বিনয়ী থাকার এবং মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার নসিহত করেছিলেন। সূরা লোকমানের ১৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আর তুমি অহংকারবশত মানুষের কাছ থেকে তোমার মুখ ফিরিয়ে নিও না এবং পৃথিবীতে দম্ভভরে চলাফেরা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না।

সন্তানের সঙ্গে একটি সুন্দর ও গভীর বোঝাপড়া তৈরি করা কতটা জরুরি, তা হজরত লোকমানের এই গল্প থেকে বোঝা যায়। তিনি চেয়েছিলেন তার সন্তান যেন জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সফল ও সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে।

কোরআনে বর্ণিত এই বাবাদের গল্পগুলো প্রমাণ করে যে একটি পরিবারে বাবার ভূমিকা শুধু অর্থ উপার্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সন্তানদের নৈতিক ও আদর্শিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাবার ইতিবাচক অংশগ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।

© বিজয় বাংলা নিউজ
bijoybangla.news