বাংলাদেশ বর্তমানে ব্যবসার জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চীনকে বাংলাদেশের অন্যতম ‘বিশ্বস্ত বন্ধু’ উল্লেখ করে তিনি দেশটির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে চীনা বিনিয়োগকারীদের সুবিধার্থে শিগগিরই চীনে বাংলাদেশের প্রথম ‘বিনিয়োগ কার্যালয়’ (ইনভেস্টমেন্ট অফিস) খোলার আনুষ্ঠানিক ঘোষণাও দেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন ২০২৬) স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে) বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই হোটেলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত ‘ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন চায়না কাউন্সিল ফর দ্য প্রমোশন অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডের চেয়ারম্যান রেন হংবিন।
সম্মেলনে চীনের ১২৫ জন ব্যবসায়ী অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা ও সুযোগ-সুবিধা তুলে ধরে প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বহু দশকের সুদৃঢ় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, এটি পারস্পরিক আস্থা, শ্রদ্ধা এবং বাস্তব সহযোগিতার একটি অনন্য সম্পর্ক। বিগত বছরগুলোতে এই সম্পর্ক কূটনীতি থেকে উন্নয়নে, উন্নয়ন থেকে বাণিজ্যে এবং এখন বাণিজ্য থেকে আরও গভীর শিল্প অংশীদারত্বে রূপান্তরিত হয়েছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে এক বিশাল অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা আমাদের যাত্রাপথের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি।
চীনা কোম্পানিগুলোর বৈশ্বিক অবদানের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চীন বর্তমানে বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে অনেক উপরে উঠে এসেছে। উন্নত উৎপাদন, উচ্চ-মূল্যের অবকাঠামো এবং পরিবেশবান্ধব ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে চীনা কোম্পানিগুলো বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। চীন যখন সফলতার সিঁড়িতে আরও উপরে উঠবে, তখন তাদের উৎপাদন ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশ নতুন, প্রতিযোগিতামূলক এবং বিশ্বস্ত স্থানের সন্ধান করবে; বাংলাদেশ ঠিক সেই উপযুক্ত স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম হতে পারে।
সম্মেলনে অংশ নেওয়া চীনা কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে তাদের ভ্যালু চেইন সম্প্রসারণের জন্য উদাত্ত আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এর মাধ্যমে চীনা কোম্পানিগুলো যেমন একদিকে বৈশ্বিক বাজারে তাদের পরিষেবা সুনিশ্চিত করতে পারবে, ঠিক তেমনি বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার থেকেও লাভবান হতে পারবে। এটি উভয় পক্ষের জন্যই একটি দীর্ঘমেয়াদি ‘উইন-উইন’ বা লাভজনক সম্পর্ক হবে।
বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, “কথার সঙ্গে কাঠামোগত পদক্ষেপের মিল থাকতে হবে। আমাদের অঙ্গীকার প্রদর্শনের জন্য বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক পুঁজি সংক্রান্ত কার্যপ্রণালীকে ঢেলে সাজানোর লক্ষ্যে একটি কঠোর ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে আমরা সরাসরি আমলাতান্ত্রিক জড়তা ও জটিলতাকে মোকাবেলা করছি। নীতিমালার স্বচ্ছতা, পূর্বাভাসযোগ্যতা এবং গতি বাড়ানোর জন্য আমরা দীর্ঘমেয়াদী নীতির ধারাবাহিকতা উন্নত করছি, একাধিক অনাবশ্যক নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া হ্রাস করছি এবং সরকারি পরিষেবাগুলোকে পুরোপুরি ডিজিটাইজ করছি।”
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বৈষম্যহীন বাণিজ্য সুবিধার আশ্বাস দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও প্রবিধান অনুযায়ী শতভাগ মূলধন ও অর্জিত লভ্যাংশ নিজ দেশে ফেরত নেওয়ার নিশ্চয়তার পাশাপাশি বিনিয়োগের শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা দেওয়া হবে।
চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশে বিশেষায়িত শিল্প অবতরণ কেন্দ্র তৈরির কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এরই মধ্যে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ‘চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল’ এবং মোংলায় একটি ‘দ্বিতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল’ গড়ে তোলা হচ্ছে। এই বিশেষায়িত স্থানগুলো চমৎকার লজিস্টিকস, বন্দর সংযোগ, নিরবচ্ছিন্ন সেবা, দক্ষ কর্মী, কাঁচামাল সরবরাহকারী এবং একটি দীর্ঘমেয়াদী ইকোসিস্টেম প্রদান করবে।
এ ছাড়া চীনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তিকে আরও আধুনিক ও উন্নত করার কাজ চলছে, যার ফলে বিনিয়োগকারীরা আরও শক্তিশালী আস্থা ও সুস্পষ্ট আইনি সুরক্ষা পাবেন।
প্রধানমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে আরও জানান, শীর্ষ বিনিয়োগ প্রচার সংস্থা ‘বিডা’ (BIDA)-তে এখন চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বিশেষায়িত ‘সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ডেস্ক’ (রিলেশনশিপ ম্যানেজমেন্ট ডেস্ক) রয়েছে। পাশাপাশি একটি ডেডিকেটেড ওয়েবসাইটও চালু করা হয়েছে, যাতে বিভিন্ন খাতের বিনিয়োগের সুযোগ, প্রণোদনা এবং সরকারি প্রক্রিয়াগুলো আরও সহজে জানা যায়।
চীনে নতুন বিনিয়োগ কার্যালয় খোলার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য খুবই স্পষ্ট ও সহজ। চীনা বিনিয়োগকারীদের সহায়তা বা তথ্য পাওয়ার জন্য বাংলাদেশে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। আমরা সরাসরি আপনাদের আরও কাছাকাছি থাকতে চাই, আপনাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতে চাই এবং আপনাদের আগ্রহ থেকে চূড়ান্ত বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াটিকে দ্রুততর করতে সাহায্য করতে চাই।
তিনি আরও জানান, দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিকাঠামো সহজ করতে সরকার একটি নতুন ‘লাইসেন্স অনুমোদন প্রক্রিয়া’ শুরু করতে যাচ্ছে, যার ফলে নতুন কোনো বিদেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মাত্র ১৫ দিনেরও কম সময়ে বাংলাদেশে তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করতে পারবে। এবারের বাজেটেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ফার্মাসিউটিক্যালস ও স্বাস্থ্যসেবা, ইলেকট্রনিক্স, ডিজিটাল পরিকাঠামো, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং উন্নত বস্ত্রশিল্পের মতো অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোর জন্য বিশেষ নীতিগত সুবিধা ও শুল্ক প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে।
সবশেষে, চীনকে বাংলাদেশের পরবর্তী ‘এশীয় অর্থনৈতিক বিস্ময়’ রচনার অন্যতম প্রধান অংশীদার হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক চীনা বিনিয়োগকারী ইতোমধ্যেই সফলতার সঙ্গে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তাঁরা আমাদের দেশের মানুষ, আমাদের সহনশীলতা ও বিপুল সম্ভাবনা সম্পর্কে ভালোভাবেই জানেন। তাঁরাই আপনাদের বলতে পারবেন যে, বাংলাদেশ বিনিয়োগের জন্য কতটা উর্বর এবং এখানে সফল হওয়া কতটা নিশ্চিত।
এই অঞ্চলের সুযোগগুলোকে বাংলাদেশ ও চীন উভয়ের জন্য দীর্ঘমেয়াদী টেকসই প্রবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং পারস্পরিক সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করার দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্য শেষ করেন।
সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম. রাশিদুজ্জামান মিল্লাত, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।