Template: 2
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
logo
বিজয় বাংলা নিউজ
bijoybangla.news
২৮ জুন ২০২৬
১০:০৯ অপরাহ্ন

সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই

নিজস্ব প্রতিনিধি:- Above all, man is true, there is no one above him

চন্ডীদাস উচ্চারণ করেছিলেন, " সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।" চর্যাপদ থেকে গীতাঞ্জলি আমরাই তার উত্তরাধিকার।আজ থেকে ৪.৫ বিলিয়ন বছর আগে গ্যাস , মেঘ ও ধুলিকণার যে পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছিল তাঁর কোন আকাশ ছিলোনা। পৃথিবীর প্রথম সৃষ্টি হচ্ছে সাগর ও মহাসাগর।আজ থেকে ৩.২২ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীর প্রথম জীব হচ্ছে অ্যামিবা, স্পঞ্জ ও কম্ব জেলির মত সায়ানো ব্যাকটেরিয়া।সায়ানো ব্যাকটেরিয়া থেকেই পৃথিবীতে অক্সিজেন সৃষ্টি হয়েছিল।এই অক্সিজেন থেকেই ধীরে ধীরে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল সৃষ্টি হয়েছে।

ইসলাম ধর্মমতে, ' পৃথিবীর প্রথম সৃষ্টি হচ্ছে কলম, যা দিয়ে ধর্মগ্রন্থ লেখা হয়েছে।' তবে পৃথিবীর প্রায় সকল বড় ধর্ম পৃথিবীর প্রথম মানুষ হিসেবে আদম (আ.) এর কথা বলে। পৃথিবীর জটিল এই সৃষ্টি রহস্যর উন্মোচন সম্ভব হয়েছে বিজ্ঞানের কারণে।৫৩৮.৮ মিলিয়ন বছর আগে ক্যামব্রিয়ান বিকিরণ ও বিস্ফোরণের ফলে পৃথিবীতে ট্রাইলোবাইট জীবাশ্ম তৈরি হয়েছিল। পাঁচ চোখ যুক্ত ওপাবিনিয়া এবং কাঁটাযুক্ত স্লাগ সাদৃশ্য ওয়াইওয়াক্সিয়ার নিয়ে গবেষণা করতে করতে বিজ্ঞানীরা প্রাণী জগতের ওয়ান্ডারফুল লাইফ বিষয়টি মানুষের নজরে নিয়ে আসেন। চার্লস ডারউইন, স্টিফেন জে গোল্ড, ক্যারোলাস লিনিয়াস , হ্যারি বে হুইটিংটন এই বিবর্তনীয় বিষয়গুলো মানুষের কাছে আরও সহজবোধ্য করে তুলেন।

পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী বলা হয় মানুষকে। মানুষের মধ্যে মানবতা যেমন আছে ঠিক তেমনি আছে হিংসা ও লোভ।মানবতা মানুষকে মানুষ হতে শেখায় আর হিংসা ও লোভ মানুষকে অমানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। সৃষ্টির পর থেকেই মানুষ দুইভাগ বিভক্ত। মানুষ ও অমানুষ। আপনি কোন দলে থাকবেন এই সিদ্ধান্ত শুধুই আপনার।

মাকড়সা ও বার্নাকল উভয়েই অর্থ্রোপোড়া ফাইলামের অন্তর্ভূক্ত হলেও কেঁচো ও ফিতাকৃমি দেখতে একই রকম হলেও এদের ইলেকট্রন ও প্রোটনের মধ্যে পার্থক্য থাকায় এরা ভিন্ন ফাইলার অন্তর্ভুক্ত। মানুষের মত চেহারার হলেই সবাই মানুষ নয়।মানুষ হতে হলে মনুষ্যত্ব থাকতে হয়। ইসলাম ধর্মমতে , মানুষ হচ্ছে দুইভাগে বিভক্ত তথা মুমিন ও কাফির।নিজ ধর্মের মানুষ ছাড়া অন্যদের পরিচয় তাদের কাছে কাফির তথা ইসলামের শত্রু। এক্ষেত্রে অনেক সময় মনের মিল না হলেও একে অপরকে যখন তখন কাফের বলে দিচ্ছে।এসব আমাদের হিংসার শিক্ষা দেয়।অথচ, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে, মানুষ ( হোমো স্যাপিয়েন্স) হল অ্যানিমিলিয়া রাজ্যর , কর্ডাটা পর্বের , স্তন্যপায়ী শ্রেণীর , প্রাইমেট বর্গের অন্তর্ভুক্ত।প্রাইমেট হচ্ছে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের একটি শাখা। মানুষ, বানর , হনুমান , গরিলা , লেমুর সবাই এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। এদের উন্নত হাত, পা ও বড় মস্তিস্ক থাকে।

মস্তিষ্ক হচ্ছে মানুষের চিন্তার ভান্ডার। মানুষের চেয়ে হাতির মাথা বড় হলেও হাতি মানুষের চেয়ে বুদ্ধিমান নয়।মানুষ হাতির মতো শক্তি দিয়ে যেমন চিন্তা করে তেমন বুদ্ধি দিয়ে খেলে। যাদের বুদ্ধিটা মানুষের কাজে লাগে তাঁরা হচ্ছে মানুষ আর যাদের বুদ্ধি মানুষের ধ্বংস ডেকে আনে তাঁরা হচ্ছে ধূর্ত শিয়াল। পৃথিবীতে লাল শিয়াল , ধসূর শিয়াল ও ফিনিক শিয়াল পাওয়া যায়। মানুষের মত শিয়াল স্মৃতি সংরক্ষণ করে রাখতে পারে, জটিল পরিবেশে খাপ খাইয়ে চলতে পারে, শিকার ধরতে কৌশল ব্যবহার করে।আর শিয়াল অতিরিক্ত চালাক ও ধূর্ত হলে তাকে পন্ডিত শিয়াল বলা হয়। মানুষের মধ্যে অতিরিক্ত চালাক ও ধূর্ত এই অংশটি পৃথিবীর মানুষকে বিভিন্ন, জাত - পাত ও ধর্মে বিভক্ত করে ফেলেছে।এরাই মানুষের মধ্যে হিংসা -হানাহানি ও অনিষ্টের  মূল কারণ।

পৃথিবীতে মানুষই শুধু বুদ্ধিমান প্রাণী নয়। মানুষের মত শুয়োর, শিয়াল, হাতি , কাক , শিম্পাঞ্জি ও গরিলা এরাও বুদ্ধিমান।পৃথিবীতে মানুষই জন্ম থেকেই অন্যর উপর নির্ভরশীল, মধ্যবয়সে এসে কিছুটা স্বাধীন আবার বুড়ো বয়সে এসে পরনির্ভরশীল। মানুষের এই পরনির্ভরশীলতাকে কাজে লাগিয়ে পৃথিবীর দেশে দেশে মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করা হয়েছে।তাই বলে পৃথিবীর সব দেশ কিন্তু একরকম নয়। সুন্দর চিন্তা ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে একটি সুন্দর ও নিরাপদ দেশ গড়া সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে বলতে গেলে জাপান, হংকং , সুইজারল্যান্ড , ফিনল্যান্ড , ডেনমার্ক এসব দেশ থেকে শিক্ষা নিতে পারেন। অপরদিকে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে চলছে মানুষরূপী শেয়াল ও শুকরছানাদের যুদ্ধ। এখানে যুদ্ধ চলছে হিন্দু ও মুসলমানের। পৃথিবীর অনেক দেশেই এভাবেই ধর্মের সাথে ধর্মের যুদ্ধের বলি হচ্ছে সাধারণ নিরীহ মানুষ।এখানেই মানুষকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলতে রুচি ও বিবেকে বাঁধে।এসব দেখলে মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে লোভী, হিংস্র ও নিকৃষ্ট প্রাণী হচ্ছে মানুষ।

আদিকাল থেকেই মানুষ হওয়ার পথে মানুষের সবচেয়ে বড় বাঁধা হচ্ছে মানুষের লোভ।ক্ষমতাধর হওয়ার লোভ থেকেই মানুষ পৃথিবীতে বিভিন্ন জাতি ও ধর্ম সৃষ্টি করেছে।লোভ থেকেই মানুষ মানুষকে অকারণে হিংসা করতে শিখে, যুদ্ধ করে, মিথ্যা বলে ও মানুষকে ঠকায়।লোভ থেকেই মানুষের মধ্যে ঈর্ষা ও হিংসার সৃষ্টি হয়। লোভ থেকেই মানুষ অন্য ধর্মের মানুষ ও দেশকে ঘৃণা করতে শিখে। মানুষের শরীরে একটা নিষ্ঠুর জিন আছে যার নাম হচ্ছে (AVPR1a )।এভলিন ডি মরগানের ' দ্য ওর্শিপ অফ ম্যামন " চিত্রকর্মে সম্পদ ও নারীর প্রতি মানুষের লোভকে নির্দেশ করা হয়েছে। মানুষ জন্মগতভাবেই নারী ও সম্পদ লোভী। মানুষের এই লোভ মানুষের অন্যতম ধ্বংসের কারণ । 

একটি প্রাণী যে এই পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছে সেও মুক্ত হাওয়ায় ঘুরে বেড়ানোর জন্য এই পৃথিবীতে এসেছে।অথচ মানুষ তাঁর লোভ ও সন্তুষ্টির জন্য সেই প্রাণীকেই খাঁচায় ঢুকিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভুগে।পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভব হয়েছে প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন বছর আগে।এই  পৃথিবীতে প্রায় ১.৭ মিলিয়ন প্রজাতির প্রাণী বসবাস করে। মানুষ পৃথিবীতে এসেছে মাত্র ২ থেকে ৩ লক্ষ বছর আগে। মানুষ তাঁর কুকর্মকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য পুরো পৃথিবীকে কলোনাইজ করছে এবং তাকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণের জন্য পৃথিবীতে জাতিতে জাতিতে এবং ধর্মের সাথে ধর্মের বিরোধ জিইয়ে রেখেছে। হাজার হাজার বছর ধরে এই পৃথিবীতে মানুষ ধর্মের জন্য একে অপরের গলা কাটছে, ধর্ষণ করছে এবং নিরীহ শিশুদের হত্যা করছে।এসব করে পৃথিবীর কোন ধর্ম সর্বশ্রেষ্ঠ হতে পারে আমাকে বলুন? 

পৃথিবীর মানুষ একটা সময় নিজ নিজ ভূখন্ডের মধ্যে শান্তিতে বসবাস করছিলো। ধর্মের কারণে পৃথিবীতে মানুষে মানুষে হিংসা, হানাহানি ও জাতিগত বিভেদ তৈরি হয়েছে।একটা আপেল গাছে হাজারো আপেল মিলেমিশে থাকতে পারলেও আমাদের দেশে প্রতিবেশীর সাথে পর্যন্ত আমাদের সম্পর্ক ভালো নেই।ও হিন্দু , ও খ্রিষ্টান , ও বৌদ্ধ , সে কাফের এমন আরও কত ভেদাভেদ।অথচ মানুষের শুধু দুটো পক্ষ হওয়ার কথা ছিল ভালো ও খারাপ। হিন্দু, বৌদ্ধ , খ্রিস্টান ও কাফের সবার রক্তই লাল।সবাই আপনার মতোই স্বল্প দিনের জার্নিতে পৃথিবীতে এসেছে।মরার পর পৃথিবীতে কোন ধর্মের মানুষ অমর হয়েছে , আমাকে একটা উদাহরণ দিন? তবে পৃথিবীতে ধর্মের নামে মানুষে মানুষে এতো হিংসা ও বিভক্তি কেন ? কেন এই পৃথিবীতে এখনও ধর্মের নামে মানুষ হত্যার মহোৎসব চলবে? কেন মানুষ হয়ে জন্ম নেওয়ার পরও নারীদের মানুষ ভাবা হবেনা?

নারী ও পুরুষ কে পৃথিবীতে আগে সৃষ্টি হয়েছে এই নিয়ে পৃথিবীর শুরু থেকেই আজ পর্যন্ত বিতর্ক চলছে। নারীদের পৃথিবীর আদি থেকেই পুরুষ তাঁর গোলাম করে রেখেছে। শারীরিকভাবে পুরুষ একটু শক্তিশালী হওয়ার কারণে নারীকে সবসময় খাটো করে দেখা হয়েছে।নারীরা এখনও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তাদের সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত , কর্মসংস্থান ও শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত। নিজেদের রাজ্য হারানোর ভয়ে পুরুষ এইভাবে নারীদের দাসে পরিণত করে রাখতে চায়। অথচ ধর্ম ও সংস্কৃতি যদি সাম্যর হতো তবে নারী ও পুরুষ উভয়েই সমান অধিকার পেতো।আমরা এতো এতো ধর্মের কথা বলি , মানবতার কথা বলি , তাহলে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশী নারীর সমান ও সাম্যের অধিকার কই?

শুধুমাত্র টেস্টোস্টেরন হরমোন ও ইস্ট্রোজেন হরমোনের কারণেই নারী ও পুরুষের শারীরিক পার্থক্য।এর পেছনে কাজ করছে জিন, হরমোন ও ক্রোমোজোম।অথচ সকল ভ্রুণ মায়ের শরীরে নারী হয়েই জন্মায়।নারী ঘোড়া পুরুষ ঘোড়ার মত দ্রুতগামী, বানরীও বানরের মত বুদ্ধিমান , নারী কুকুরের ঘ্রাণশক্তি কোন অংশেই পুরুষ কুকুর থেকে কম নয় । তবুও পৃথিবীতে পুরুষের নারীর প্রতি এত সহিংসতা কেন? কারণ জন্মের পর থেকেই পুরুষ নারীকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে এসেছে।নারীর ডিম্বাশয়ে কোন ওয়াই ক্রোমোজোম থাকেনা। সন্তান নারী কিংবা পুরুষ এর জন্য পুরুষই দায়ী। তবুও যুগে যুগে নারীকে অবহেলিত করে রাখা হয়েছে। পুরুষ কখনোই সেভাবে চায়নি নারী তাঁর সমকক্ষ হয়ে উঠুক। মানুষের হয়ে পৃথিবীতে জন্ম নিয়ে এটা মানুষের প্রতি মানুষের হিংসা ও ঈর্ষা ছাড়া আর কি হতে পারে? 

মাতৃগর্ভে ৮ ম থেকে ৯ম সপ্তাহ পর্যন্ত পুরুষ কিন্তু পুরুষ হয়েই জন্ম নিতে পারেনা। শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর জিনোটাইপ মিশ্রনের ফলে লিঙ্গ তৈরি হতে আট থেকে নয় সাপ্তাহ সময় লাগে।এই সময়ের মধ্যে সন্তান নারী না পুরুষ এটা পৃথিবীর কে বলতে পারবে? তবুও পৃথিবীতে মানুষে মানুষে এত ভেদাভেদ ও হানাহানির কারণ হচ্ছে , মানুষ একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবে।নারীকে মানুষ ভাবতে শিখুন। মানুষ হয়ে জন্ম নিয়ে পৃথিবীর সব ধর্মের মানুষকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করতে শিখুন।মানুষকে তাঁর কর্ম দিয়ে বিবেচনা করুন, ধর্ম দিয়ে নয়।ধর্ম মানব শরীরের বাইরের একটি আবরণ ছাড়া আর কিছুই নয়।পৃথিবীতে মানুষ হয়ে জন্ম নিয়ে মৃত্যু অবধি মনুষ্যত্বকে জাগ্রত রাখুন। মানুষ হয়ে জন্ম নিয়ে মানুষের সংগ্রাম হোক মানুষের জন্য। নৈতিক ও মানবিক শিক্ষায় শিক্ষিত করুন আপনার সন্তানকে। একমাত্র মানুষ হতে পারলেই পৃথিবীতে মানুষের মুক্তি সম্ভব।।






© বিজয় বাংলা নিউজ
bijoybangla.news