Template: 2
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
logo
বিজয় বাংলা নিউজ
bijoybangla.news
২৯ জুন ২০২৬
০৪:৫০ অপরাহ্ন

ভেনেজুয়েলায় ধ্বংসস্তূপে মা ও নবজাতকের অলৌকিক বাঁচার গল্প

অনলাইন ডেস্ক Miraculous survival story of mother and newborn

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে ধসে পড়া বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপ থেকে ১৮ দিন বয়সী নবজাতক সন্তানসহ অলৌকিকভাবে উদ্ধার হয়েছেন এক মা। কীভাবে তার কোল আলো করে থাকা ছোট্ট শিশুটিই তাকে বেঁচে থাকার সাহস জুগিয়েছেন সেই গল্প ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে জানিয়েছেন তিনি।

দায়ানা পাতিনো নামের ওই নারী বলেন, তার ছেলে হুয়ান ডেভিড তাকে অন্ধকার গর্তে জেগে থাকার এবং সচেতন থাকার অন্তহীন শক্তি জুগিয়েছিল। তিনি বলেন, যতক্ষণ ও বেঁচে ছিল, আমিও বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলাম। ও যে তখনও শ্বাস নিচ্ছে, তা নিশ্চিত হতে আমি বারবার ওর ছোট্ট নাকে হাত দিয়ে দেখতাম।

মা ও শিশুর অলৌকিক এই উদ্ধারের ভিডিও এখন বিশ্বজুড়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। গত বুধবার আঘাত হানা জোড়া ভূমিকম্পে অন্তত দেড় হাজার মানুষের মৃত্যুতে বিপর্যস্ত ভেনেজুয়েলায় এখন এক নতুন আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে শিশু হুয়ান ডেভিড।

দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট এই দুর্যোগকে ভেনেজুয়েলার ইতিহাসের ‘‘সবচেয়ে নির্মম প্রাকৃতিক বিপর্যয়’’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। দেশটিতে এখনও আরও ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। তবে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে আর কোনও জীবিত মানুষের সন্ধান পাওয়ার আশা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে।

রোববার ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের একটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন দায়ানা বিবিসির কাছে মাটির নিচে কাটানো সেই আতঙ্কজনক মুহূর্তের বর্ণনা দিয়েছেন। ওই সময় সন্তানকে বুকে চেপে ধরে উদ্ধারের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করছিলেন তিনি।

দেশটির উত্তর উপকূলীয় অঞ্চলের লা গুয়াইরায় নিজেদের আট তলার অ্যাপার্টমেন্টের রান্নাঘরে থালাবাসন ধোয়ার সময় ভূমিকম্প আঘাত হানে। এটিকে ‘‘সামান্য মৃদু কম্পন’’ ভেবে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরতে ছুটে যান।

ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, হঠাৎ আমার মনে হলো আমি বাতাসে উড়ছি। এরপরই মনে হলো আমি পানি আর কাদামাটির নিচে তলিয়ে যাচ্ছি এবং গভীর এক অন্ধকূপের মধ্যে আছড়ে পড়লাম। বাতাসে ওড়ার পরও আমি কীভাবে আমার সন্তানকে হাতছাড়া করিনি, তা আজও আমার কাছে এক বিস্ময়। ধসে পড়া আসবাবপত্রের নিচে আমি পুরোপুরি চাপা পড়ে গিয়েছিলাম।

দায়ানা বলেন, গর্তে পড়ার পরপরই তিনি চিৎকার করতে শুরু করেন। কিন্তু বুঝতে পারেন, তার আকুতি শোনার মতো সেখানে কেউ নেই।

তিনি বলেন, আমি তখন নিজেকে বোঝালাম, অযথা চিৎকার করে আমি আমার শক্তি নষ্ট করব না—যখন প্রয়োজন হবে, অর্থাৎ যখন আমি কাছাকাছি মানুষের কণ্ঠস্বর বা পায়ের আওয়াজ শুনতে পাব, ঠিক তখনই চিৎকার করব।

‘‘আমি জানি না কীভাবে নিজেকে অতটা শান্ত রেখেছিলাম। কারণ আমার বাম পা তখন কংক্রিটের নিচে চাপা পড়ে ছিল। আমি একটুও নড়াচড়া করতে পারছিলাম না। আর আমার কপালটি একটি শক্ত পাথরের সঙ্গে চেপে ছিল।’’

দায়ানা বলেন, পিঠের নিচে যখন তিনি একটি বাইবেল অনুভব করলেন, তখন তিনি যেন নতুন করে বেঁচে থাকার আলো দেখতে পেলেন। তিনি বলেন, সেখান থেকেই মূলত আমার বেঁচে থাকার লড়াইয়ের নতুন যাত্রা শুরু হয়েছিল।

ধ্বংসস্তূপের নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের মধ্যেও তিনি ওপরের দিকে চাঁদের মতো ছোট একটি আলোর বিন্দু দেখতে পাচ্ছিলেন। দায়ানা বলেন, দীর্ঘ অপেক্ষার পর তিনি তার ভাইয়ের কণ্ঠে নিজের নাম ধরে ডাকতে শোনার পরই বুঝতে পারেন, সহায়তার হাত চলে এসেছে।

‘‘আমি নিজেকে বললাম, এটাই আমার শেষ সুযোগ। আমি আমার ফুসফুসের সবটুকু জোর দিয়ে চিৎকার করে উঠলাম... আমি আমার পুরো শক্তি দিয়ে চিৎকার করে বললাম ‘আমি এখানে’। আর ও ওপর থেকে বলল, আমি তোমাকে খুঁজে পেয়েছি, আর কথা দিচ্ছি তোমাকে বের না করা পর্যন্ত আমি এখান থেকে এক পা-ও নড়ব না।’’

তার ভাই সেই কথা রেখেছিলেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে অত্যন্ত সতর্ক ও জটিল উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে মা ও শিশুকে ধ্বংসস্তূপ থেকে অক্ষত অবস্থায় বের করে আনা হয়।

ভূমিকম্পের আঘাতে দায়ানার দুই পায়ে বেশ চোট লেগেছিল। তবে সৌভাগ্যবশত শিশু হুয়ান তেমন কোনও আঘাতই পায়নি। দায়ানার স্বামী গারসন ভূমিকম্প আঘাত হানার সময় বাড়ি ফিরে গাড়ি পার্ক করেছিলেন। তিনি সীমানা প্রাচীর টপকে কোনোমতে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে সক্ষম হন।

তবে চোখের সামনে নিজেদের অ্যাপার্টমেন্ট ভবনটি ধূলিসাৎ হতে দেখে তিনি সবচেয়ে খারাপ কিছুর আশঙ্কাই করেছিলেন। স্ত্রী ও সন্তানের জীবিত ফিরে আসার সেই মুহূর্তটিকে ‘‘অলৌকিক ঘটনা’’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন গারসন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া উদ্ধারের ভিডিওতে দেখা যায়, পরম আবেগে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে আকাশের দিকে মুখ করে আছেন গারসন; যেন সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন তিনি।

সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে তিনি বিবিসিকে বলেন, এটি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমি ধরে নিয়েছিলাম ওরা আর বেঁচে নেই। কিন্তু যখন আমি আমার ছেলেকে অক্ষত দেখলাম, আমার মনে হলো আমি নিজেই নতুন জন্ম পেয়েছি। আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না... মনে হচ্ছিল আমার মৃত শরীরে প্রাণ ফিরে এসেছে।

ভূমিকম্পে গারসন ও দায়ানার সাজানো সংসার এবং সব জিনিসপত্র ধুলোয় মিশে গেছে। তাদের প্রিয় পোষা কুকুরটি এখনও নিখোঁজ থাকায় তারা গভীরভাবে শোকাহত। তবে এই দম্পতি জানিয়েছেন, তারা এখন একদম শূন্য থেকে জীবন শুরু করবেন।

‘‘আমরা আমাদের সবকিছু হারিয়েছি, কিন্তু আমরা যে বেঁচে আছি এটাই বড় কথা... আমরা আমাদের হারানো সবকিছু আবার নতুন করে গড়ে তুলব,’’ প্রত্যয়ী কণ্ঠে বলেন গারসন।

সূত্র: বিবিসি

© বিজয় বাংলা নিউজ
bijoybangla.news