Template: 2
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
logo
বিজয় বাংলা নিউজ
bijoybangla.news
২৯ জুন ২০২৬
০৯:৫৬ অপরাহ্ন

রেলওয়ের অভ্যন্তরেই মাদক - চোরাচালান পাচারের ঘটনা ঘটলেও চুপ রেল কর্তারা

আবুল কালাম আজাদ,রাজশাহী:- Drug smuggling incidents

মাদকমুক্ত রেল গড়ার ঘোষণা, ধারাবাহিক সভা, ইন-হাউস সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং যাত্রীদের উদ্দেশ্যে বেশ ঢালাওভাবে প্রচারণাসহ আরও কত কী। উদ্দেশ্য একটাই, বন্ধ হোক মাদক, সুস্থ থাকুক যুবসমাজ।

তবে রেলের ভেতরের বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন গল্প। রেলওয়ের অভ্যন্তরেই একের পর এক মাদক পাচারের ঘটনায় উঠে আসছে লোকোমাস্টার, গার্ড, ট্রেন পরিচালক, আরএনবি সদস্য ও রেলকর্মীদের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ। দীর্ঘদিন ধরেই লোকমুখে প্রচলিত রেলের অভ্যন্তরে চোরাচালান সাম্রাজ্যের গুঞ্জন। এটিই যেন রেলের ভেতরের ওপেন সিক্রেট, জেনেও চুপ রেল কর্তারা।

সর্বশেষ আখাউড়া স্টেশনে র‌্যাবের বিশেষ অভিযানে মালবাহী ট্রেনের লোকোমোটিভ থেকে বিপুল পরিমাণ গাঁজা ও বিভিন্ন মাদকদ্রব্য উদ্ধারের ঘটনায় আবারও প্রশ্নের মুখে পড়েছে রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

গেল ২৫ জুন (বৃহস্পতিবার) দিবাগত রাতে আখাউড়া স্টেশনে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র‌্যাবের যৌথ অভিযানে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী মালবাহী ট্রেনের (আপ-৬০৩ নম্বর) লোকোমোটিভ (ট্রেনের ইঞ্জিন) থেকে উদ্ধার করা হয় বিপুল পরিমাণ মাদক।

রেল সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম গুডস পোর্ট ইয়ার্ড (সিজিপিওয়াই) থেকে লোকোমোটিভ নম্বর-২৯৩১ যুক্ত ট্রেনটি ছেড়ে যায়। ট্রেনটির লোকোমাস্টার ছিলেন মো. শাহাজাহান (স্টাফ নং-৫০) এবং সহকারী লোকোমাস্টার ছিলেন মো. শামীম (স্টাফ নং-১৫৪)। দুজনই সিজিপিওয়াই লোকোশেডের কর্মচারী।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, শশীদল-মন্দবাগ স্টেশনের মধ্যবর্তী এলাকায় ট্রেনটি চলাচলের সময় মাদক পাচারকারীদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে মাদক পরিবহনে লোকোমাস্টাররা সম্পৃক্ত হন। পরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আখাউড়া ইয়ার্ডে অভিযান চালিয়ে লোকোমোটিভ থেকে গাঁজা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়।

তদন্তে ট্রেনের চালক ও সহকারী চালকের সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে বলেও দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

এ অভিযানে সহকারী লোকোমাস্টার মো. শামীম পালিয়ে গেলেও শেষ রক্ষা হয়নি লোকোমাস্টার মো. শাহাজাহানের। ধরা পড়েন র‌্যাবের জালে।

এমন মাদক পাচারের ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখছেন না রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা।নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, সিজিপিওয়াই লোকোশেডের কয়েকজন চালক ও সহকারী চালকের বিরুদ্ধে অতীতেও তেল চুরি ও মাদক পাচারের অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় একই ধরনের অপরাধ বারবার ঘটছে।তার দাবি, এর পেছনে রানিং স্টাফ ও শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সিজিপিওয়াই শাখার নেতাদের প্রভাবও রয়েছে।

আখাউড়ার এই অভিযানের কয়েক মাস আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে একটি ভিডিও, যেখানে চলন্ত ট্রেনের গতি অস্বাভাবিকভাবে কমিয়ে লোকোমোটিভে মাদকের দুটি বড় বস্তা তুলে দিতে দেখা যায়।

রেল সূত্রে জানা যায়, ওই ঘটনাটি ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর চট্টগ্রাম থেকে ঢাকামুখী সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেনের।ভিডিওতে দেখা যায়, শশীদল-মন্দবাগ সেকশনের ১৭১/৫ নম্বর পিলারের কাছে ট্রেনের গতি কমিয়ে বাইরে অবস্থানরত দুই ব্যক্তি লোকোমোটিভে থাকা একজনের হাতে মাদকের বস্তা তুলে দিচ্ছেন।সেদিন ট্রেনটির লোকোমাস্টার ছিলেন মুস্তাফিজ এবং সহকারী লোকোমাস্টার ছিলেন মোশাররফ।

ভিডিওটি প্রকাশের পর রেলের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলা চোরাচালান সিন্ডিকেটের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় আসে।

অনুসন্ধানে রেল সংশ্লিষ্টরা জানান, লোকোমোটিভ ব্যবহার করে অবৈধ পণ্য পরিবহন করলে চেকপোস্ট, স্ক্যানিং কিংবা বগি তল্লাশি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। ফলে এটি চোরাচালানকারীদের নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলের এক কর্মচারী বলেন, কিছু নির্দিষ্ট রুটে লোকোমাস্টাররাই সিন্ডিকেটের 'সেফ হ্যান্ডলার' হিসেবে কাজ করেন। কোথায় ট্রেনের গতি কমবে, কোথায় লোক দাঁড়িয়ে থাকবে এবং কখন পণ্য তোলা হবে, সবকিছু নির্ধারণ করা থাকে আগে থেকেই।

২০২৫ সালের ২১ নভেম্বরের ওই ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর পূবাইল স্টেশনে সোনার বাংলা এক্সপ্রেসে যৌথবাহিনী অভিযান চালিয়ে মাদকদ্রব্য উদ্ধার করে। পরে প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলীকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে রেল কর্তৃপক্ষ। কমিটিতে ডিএসই (সদর), সিআরএনবি (সদর), ডেপুটি সিওপিএস এবং চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার ওসিকেও রাখা হয়।

তবে অতীতের অভিজ্ঞতায় তদন্ত কমিটির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন রেল সংশ্লিষ্টরা । তাদের ভাষ্য, রেলে এর আগেও বহু ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন হলেও অধিকাংশ প্রতিবেদনই ফাইলবন্দি হয়ে গেছে। ফলে অপরাধীদের মধ্যে শাস্তির ভয় তৈরি হয়নি।

রেলওয়ে সংশ্লিষ্টদের ভাষায়, মাদকমুক্ত রেল গড়তে যখন কর্তৃপক্ষ একের পর এক উদ্যোগ নিচ্ছে, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল কর্মীরাই যদি মাদক পরিবহনে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে পুরো ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

রেল বিশ্লেষক মোহাম্মদ হোসেন বলেন, "এটি অভাব, নাকি স্বভাব? এখন এটাই প্রশ্ন, কার শেল্টার নিয়ে লোকোমাস্টাররা এই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।"

তার মতে, ইঞ্জিনের মতো সর্বোচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত স্থানে মাদক পরিবহন কেবল একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়, এটি রেলওয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভয়াবহ দুর্বলতার প্রতিফলন। যেখানে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব লোকোমাস্টারদের, সেখানে তাদের একটি অংশ যদি মাদক পাচারে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে রেলের প্রতি জনআস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

রেল সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু সভা-সেমিনার বা সচেতনতামূলক কর্মসূচি দিয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ, স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুতি, প্রচলিত আইনে কঠোর শাস্তি এবং লোকোমোটিভ এলাকায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানোর বিকল্প নেই।

তাদের মতে, আখাউড়ার সাম্প্রতিক অভিযান এবং এর আগে ভাইরাল হওয়া ভিডিও একই বাস্তবতার দুটি উদাহরণ। অর্থাৎ, রেলের ভেতরে সক্রিয় একটি সংঘবদ্ধ চক্র এখনও কার্যকর রয়েছে। সেই চক্র ভাঙতে না পারলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মাদকবিরোধী অভিযান কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে, আর 'মাদকমুক্ত রেল' কেবল স্লোগান হয়েই থেকে যাবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে রানিং স্টাফ ও শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. মজিবুর রহমান সিটিজি পোস্টকে বলেন, আমরা মাদকের ব্যাপারে "জিরো টলারেন্স"। আমাদের প্রতিটি সভা-মিটিংয়ে লোকোমাস্টার ও কর্মচারীদের কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়।

তবে এ বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক ও রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীনের মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা ও হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদেবার্তা পাঠিয়েও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।




© বিজয় বাংলা নিউজ
bijoybangla.news